আজকাল ওয়েবডেস্ক: শুরু হয়ে গিয়েছে পবিত্র রমজান মাস। একসময় বাংলা-বিহার-ওড়িশার রাজধানী ছিল মুর্শিদাবাদ। নবাবী আমলে তার জাঁকজমকপূর্ণ জীবনযাত্রা, স্থাপত্য ও খাদ্য সংস্কৃতির জন্য বিখ্যাত ছিল। রমজান মাসে ইফতার ছিল নবাব পরিবারের সদস্যদের কাছে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠান।
১৭০৬ সালে বাংলা-বিহার-ওড়িশার সুবেদার মুর্শিদকুলি খাঁ মুর্শিদাবাদ নগরীর পত্তন করেন। মুর্শিদকুলি খাঁ নিজে এবং তাঁর উত্তরসূরিরা বরাবরই রমজান মাসে মুসলিম ধর্মে পালনীয় পবিত্র কর্তব্যগুলো নিষ্ঠাভরে পালন করতেন। নবাবী আমলে সারাদিনের রোজা শেষে রাজপ্রাসাদে ইফতারের আয়োজন ছিল রাজকীয় আভিজাত্য দেখানোর প্রতীক।
ঐতিহাসিকরা বলেন, নবাবী আমলে ইফতার শুধু নবাবের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত না, এটি ছিল সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের সঙ্গে মিলনের মাধ্যম। প্রাসাদের বিরাট হল ঘরে বা ইমামবাড়ায় শত শত রোজাদারকে আমন্ত্রণ জানানো হত।
ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, মীরজাফর এবং মুর্শিদাবাদের ১৮ জন নবাব এবং নাজিম প্রত্যেকেই রমজান মাসের সূর্যাস্ত পর্যন্ত উপোস করে থাকতেন। সূর্যাস্তের পর নবাব নিজের সুবেদারির গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী এবং অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে একত্রে নামাজ পাঠ করতেন। তারপর সকলে বসে বিভিন্ন ধরনের সুস্বাদু খাবার খেয়ে উপোস ভাঙতেন।
ইফতারের পদে মুঘল এবং বাঙালি, দুই ঘরানার সংমিশ্রণ থাকত। নবাব আলীবর্দী খানের এক বংশধর ডঃ রেজা আলি খান নিজের স্মৃতি কথায় লিখে গিয়েছেন ,"নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ রমজান মাস ছাড়াও 'শাবন' এবং 'রজব' মাসেও পূর্ণ উপবাস রাখতেন। যেহেতু রমজান মাস চাঁদের অবস্থানের উপর নির্ভর করে ঠিক হয় তাই নবাবদের ইফতার পার্টিতেও কী ধরনের খাবার থাকবে তা প্রতিবছরই বদলে যেত। "
বিভিন্ন ঐতিহাসিকেরা বলেন, নবাবী আমলে ইফতারের সময় খেজুর, শরবত, হালিম, পেঁয়াজি, সিঙ্গারা বিভিন্ন ধরনের কাবাব, বিরিয়ানি, পোলাও, কোরমা, রুটি, ফিরনি জিলিপি, খুরমা ইত্যাদি পরিবেশন করা হত। নবাব এবং তাঁর ঘনিষ্ঠদের জন্য এই খাবার পরিবেশন করা হত সোনা অথবা রুপোর পাত্রে।
রমজান মাসে নবাবরা প্রচুর দান-খয়রাতিও করতেন। দরিদ্র রোজাদারদের জন্য থাকত খাবারের বিশেষ ব্যবস্থা।
তবে পলাশীর যুদ্ধের পর ধীরে ধীরে নবাবের ক্ষমতা হ্রাস পেতে শুরু করে। রমজান মাসে 'নবাবী ইফতার' তার পুরনো জৌলুশ এখন অনেকটাই হারিয়েছে।
নবাব মীরজাফরের ১৭তম বংশধর সৈয়দ মহম্মদ ফাহিম মির্জা। তাঁর কথায়, "বিভিন্ন কারণে নবাবী ঐতিহ্য মেনে এখন আর ইফতার করা সম্ভব হয় না। তবে রমজান মাসে আমি এবং আমার স্ত্রী রোজই রোজা রেখে ইফতার করছি। সকালবেলায় 'সেহরি'র সময় খেজুর এবং জল খেয়ে নিই। বিকালবেলা ইফতার শুরুর আগে গরম জলে একটু লেবু, গোলমরিচ এবং লবণ মিশিয়ে সেটা পান করে তারপর খেজুর এবং অন্যান্য খাবার যেমন -কাঁচা ছোলা, দই বড়া, বিভিন্ন ধরনের ভাজা, চিকেন কাবাব, স্যান্ডউইচ বা সিদ্ধ ডিম দিয়ে আমরা এখন ইফতার করি।"
তিনি জানান, "নবাবী পরিবারের তরফ থেকে এখন রমজান মাসের ১৮তম দিনে স্থানীয় একটি মসজিদে ৭০-৮০ জনকে ইফতার করানোর ব্যবস্থা করা হয়। সেখানে রুটি তরকারি-সহ বিভিন্ন ধরনের ফল দেওয়া হয় রোজাদারদের।"
ফাহিম আরও জানান, "এর পাশাপাশি রাজ্য সরকারের তরফ থেকে চক শাহী মসজিদ এবং ইমামবাড়ায় গোটা রমজান মাস জুড়ে প্রচুর মানুষকে ইফতার করানোর ব্যবস্থা করা হয়। সেখানে কলা, আপেল, খেজুর, ছোলা, রুটি-তরকারি এবং অন্যান্য খাবার রোজাদারদের দেওয়া হয়।"
নবাব পরিবারের এই সদস্য জানান, "পবিত্র রমজান মাস শেষে খুশির ঈদের দিন সকালে 'নিয়াজ' দেওয়া হয়। মোট দশটি পাত্রে ক্ষীর, কোরমা এবং বিশেষ পদ্ধতিতে নির্মিত সিমুইয়ের পায়েস দিয়ে 'নিয়াজ' দেওয়া হয়। সেদিন আমাদের বাড়িতে বিশেষ নবাবী রেসিপির বিরিয়ানি, বিভিন্ন ধরনের কাবাব-সহ আরও নানা পদ রান্না করা হয়। খুশির ইদের দিন আমাদের বাড়িতে বেশ কিছু অতিথি এবং বন্ধু-বান্ধবকে নিমন্ত্রণ করেও খাওয়ানো হয়।"
