বিভাস ভট্টাচার্য
দৃশ্য এক- কেন্দ্রীয় এজেন্সির তল্লাশি চলাকালীন সটান ঢুকে গিয়ে 'দলের' ফাইল এবং ল্যাপটপ বের করে আনা। বেরিয়ে হাতে মাইক নিয়ে গোটা বিষয়টি সংবাদ মাধ্যমের সামনে তুলে ধরা। দৃশ্য দুই- সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির এজলাস। যেখানে তাবড় তাবড় আইনজীবীদের পাশে দাঁড়িয়ে এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে সওয়াল। দুটো ঘটনাই ব্যাতিক্রমী। কারণ, এর আগে সরাসরি কোনো মুখ্যমন্ত্রী কেন্দ্রীয় এজেন্সির অভিযান চলাকালীন সেখান থেকে ফাইল বের করে আনার সাহস যেমন দেখাতে পারেননি তেমনি মুখ্যমন্ত্রী পদে থাকাকালীন এর আগে কেউ কখনও সুপ্রিম কোর্টে দাঁড়িয়ে কোনো বিষয় নিয়ে সওয়ালও করেননি। আর বিশেষ করে ইস্যু যেখানে একেবারেই 'হট'। যদিও আদালতে দাঁড়িয়ে সওয়ালের ব্যাপারটা মমতার কাছে প্রথম নয়। এর আগে বিরোধী নেত্রী থাকাকালীন ১৯৯৭ সালে হুগলির চুঁচুড়া আদালতে দাঁড়িয়ে তাঁকে সওয়াল করতে দেখা গিয়েছিল। সেদিন ছিল হুগলির দুই বাসিন্দার পরিবারের হয়ে সওয়াল। আর ৪ঠা ফেব্রুয়ারি সওয়ালের বিষয়বস্তুটা এমনই একটা বিষয় যা নিয়ে রাজ্যে প্রতি ১০টি পরিবারের মধ্যে অন্তত একটি পরিবার চিন্তিত।
অনেকটা যেন অমিতাভ বচ্চনের 'দিওয়ার' সিনেমার মতো। যেখানে পর্দায় বিজয়রূপী অমিতাভ বচ্চন যেমন খলনায়ক 'পিটার'-এর ডেরায় ঢুকে সবকিছু তছনছ করে নিজের হাতে বন্ধ করা দরজার চাবি আবার কেড়ে নিয়ে নিজের হাতেই খুলেছিলেন তেমনি দিল্লির বুকে দাঁড়িয়ে মমতা চিরাচরিত ধ্যান ধারণা খানখান করে কেড়ে নিলেন গোটা সংবাদ মাধ্যমের নজর। প্রমাণ করে দিলেন পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে তিনি কোনও অবস্থাতেও পিছপা হতে রাজি নয়। তিনি যেমন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী তেমনি সমানভাবে দেশের বিরোধী নেত্রী। আর এই কাজে তাঁর সঙ্গী তাঁর দুর্দমনীয় সাহস। তা সে রাজ্যে বাম আমলে সিপিএমের বিরুদ্ধেই হোক বা কেন্দ্রে বিজেপির আমলে দিল্লির রাজপথই হোক। বারবার তাঁর কাজে 'মেজাজটাই তো আসল রাজা'র মতো প্রমাণ হয়েছে 'সাহসটাই তো আসল শক্তি'। যার জন্যই গোটা দেশের সংবাদ মাধ্যমের কাছে আজ তিনিই মূল আকর্ষণ। ক্যামেরা তাঁকে অনুসরণ করে যাচ্ছে প্রতি মুহূর্তেই।
যদি অতীতের দিকে ফিরে তাকানো যায় তাহলে দেখা যাবে কংগ্রেসের ওই 'সুদিন'-এর সময়েও মতের মিল না হওয়ার জন্য বেরিয়ে এসে তৈরি করেছিলেন নিজের দল তৃণমূল কংগ্রেস। সেদিন অনেক কংগ্রেস নেতার মুখেই কিন্তু শোনা গিয়েছিল মমতা 'ভুল' সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কিন্তু সিদ্ধান্ত যে একেবারেই সঠিক ছিল তার প্রমাণ পরবর্তী সময়ের ইতিহাস। সিঙ্গুর থেকে নন্দীগ্রাম, একটার পর একটা আন্দোলনের রাশ নিজের হাতে তুলে নিয়ে শেষপর্যন্ত দোর্দণ্ডপ্রতাপ বামেদের রাজ্যের মসনদ থেকে নামিয়ে দিয়েছেন তিনি। বিশেষত্বটা হল সেদিন যেমন তিনি সাহস করে সঙ্গী সাথীদের নিয়ে বামেদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন তেমনি আজকের দিনে দিল্লিতে গিয়েও তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন তাঁর সেই আন্দোলনের ঝাঁঝ এখনও কিন্তু অটুট।
সাহসের বিচারে কি মমতা দেশের বাকি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের থেকে এগিয়ে? কী বলছেন বিরোধীরা? রাজ্য বিজেপির প্রধান মুখপাত্র আইনজীবী দেবজিৎ সরকার বলেন, "শুধু ইডি রেইড-এর বিষয়টি কেন ধরছেন? তার আগে বিধানসভার ভাঙচুরের বিষয়টিও বলুন। বা তারও আগে জয়প্রকাশ নারায়ণের গাড়ি। আমরা কিন্তু সেইসময় থেকেই ধরব। আদি গঙ্গার ধারে যে পারিবারিক ব্যবসা এবার বন্ধ হতে যাচ্ছে বলেই তাঁর প্রচন্ড সাহসের বহিঃপ্রকাশ আমরা দেখতে পাচ্ছি। আসলে তিনি এখন মানুষের কাছে সহানুভূতি কিনতে চাইছেন। কিন্তু মানুষ অত বোকা নয়। মানুষ এখন বুঝতে পারছেন তাঁরা বিড়াল তাড়াতে গিয়ে রান্নাঘরে বাঘ ঢুকিয়ে ফেলেছেন। তিনি এখন বিকল্প রোজগার বা বিকল্প পথের সন্ধানে দিল্লি গিয়েছেন। মানুষ এতে আগ্রহী নয়।"
গিমিক বলে উল্লেখ করে রাজ্য কংগ্রেস নেতা সৌম্য আইচ রায় বলেন, "সাহসের বিষয়টি সত্যি প্রমাণিত হত যদি দেখতাম মাননীয়া আরজি কর-এর নির্যাতিতার হয়ে মামলা লড়তেন বা চিট ফান্ড কাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্তদের হয়ে মামলা লড়তেন। তিনি একটা গ্যালারি শো করেছেন।"
'অগ্নিকন্যা' নামে পরিচিতা মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। মমতাকে দেশের বাকি মুখ্যমন্ত্রীদের সঙ্গে তুলনার প্রসঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রাক্তন সাংসদ এবং দলের নেতা কুণাল ঘোষ বলেন, "মমতা ব্যানার্জির সঙ্গে কারুরই কোনো তুলনা চলে না। কেন তিনি অগ্নিকন্যা সেটা তিনি আবার প্রমাণ করে দিলেন।"
দেশ তাকিয়ে ৯ ফেব্রুয়ারি আগামী সোমবারের দিকে। সেদিন ফের সুপ্রিম কোর্টে উঠবে এই মামলা।
