রিয়া পাত্র
দিল্লি কতদূর বাংলা থেকে? অনেকটা? পথের দূরত্ব কতটা পৃথক সময়ের দূরত্বের থেকে? প্রশ্নগুলি টানটান উত্তেজনার রাজনীতির বিষয়ে খানিকটা অপ্রতুল মনে হলেও, গত তিনদিনের ঘটনাক্রম যেন আচমকা এই দুটি প্রশ্নকে সামনে এনেছে। প্রশ্ন সামনে এসেছে যাঁর হাত ধরে, তিনি বাংলার মুখ্যমন্ত্রী, তৃণমূল কংগ্রেস সুপ্রিমো মমতা ব্যানার্জি। যিনি একাধিকবারের সাংসদ, বিধায়ক, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরেও, সত্তর বছর অতিক্রান্ত করে কাপড় নিয়ে কটাক্ষ শোনেন বর্ষীয়ান নেতার ভদ্রবিত্ত পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতায় আঘাত হওয়ার দরুণ। আর সেসব কটাক্ষ ফুৎকারে উড়িয়ে জবাব দেন ইতিহাস তৈরি করে। অন্তত কমবেশি যাঁরা বাংলার রাজনীতির আঁটঘাট জেনেছেন, তাঁদের ভাবতে বাধ্য করেন, আদতে সময় বদলে গেলেও, পরিস্থিতি বদলে গেলেও, এক রয়ে গিয়েছে মমতা ব্যানার্জির বডি ল্যাঙ্গুয়েজ, রাজনীতিতে লড়াই করার ধরণ, ধাঁচ।
মমতা ব্যানার্জি, বাংলার বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী, এক সময়ের বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেত্রী। আমরা যাঁরা সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম, লালগড়ের ঘটনাবলীর সময় খুব ছোট, যাঁরা সেই সময়ের উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতি, উত্তাপের ভিতর দিয়ে হেঁটে যাইনি, এবং বড় হয়ে রাজনীতির বিষয়ে কমবেশি আগ্রহ দেখিয়েছি, তারা সকলেই জানি, এই তিন জায়গায় তৎকালীন নেত্রী মমতা কীভাবে লড়াই করেছিলেন। প্রয়োজনের খাতিরে উল্লেখ করা যেতেই পারে, ১৪৪ ধারা ভেঙে সিঙ্গুরে ঢুকে পড়া মমতার কথা। টানা ২৬ দিন অনশন করা মমতা কথা। বিডিও অফিস থেকে ধাক্কা দিয়ে, বলপ্রয়োগ করে যে মমতাকে বের করে দেওয়া হয়েছিল তাঁর কথা, কিংবা উত্তপ্ত লালগড়ে বাইকে চেপে ঢুকে পড়েছিলেন, মঞ্চে উঠে আওড়েছিলেন কবিতা, সেই মমতার কথা।তারপর বাংলা দিয়ে জল গড়িয়েছে বহু। মমতা বিরোধী পক্ষ থেকে সরকারে এসেছেন। মহাকরণ থেকে ফাইল গিয়েছে গঙ্গা পাড়ের নবান্নে। এক সময়ের ক্ষমতায় থাকা বামেরা বিধানসভায় কমতে কমতে শূন্যে দাঁড়িয়েছে। বহু কিছু নেই হয়ে গিয়েছে, হাল আমলের এআই পর্যন্ত, বহুকিছু ঢুকে গিয়েছে রাজনীতির মারপ্যাঁচে। কিন্তু এই ফেব্রুয়ারির ৪ তারিখ মনে করাচ্ছে, বাংলার রাজনীতিতে এক রয়ে গিয়েছে মমতা ব্যানার্জির রাজনীতির ধারা।
কেন মনে হচ্ছে এমনটা? মনে হওয়ার জন্য গত এক মাসের ঘটনাবলী যথেষ্ট। আরও স্পষ্ট করে বললে, আতস কাচের তলায় আনা যাক, গত তিনদিনের ঘটনাবলী। মমতা ব্যানার্জি, এসআইআর নিয়ে ক্রমাগত সুর চড়িয়ে, দিল্লি গিয়েছিলেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের সঙ্গে দেখা করতে। কিন্তু ঠিক তার আগে, সোমবার, আচমকা এককাপড়ে বাংলার মুখ্যমন্ত্রীকে নামতে হয়, দিল্লির রাস্তায়। এই সফরে মমতার সঙ্গী ছিলেন অভিষেক, সঙ্গী ছিলেন বাংলার এমন ৫০জন মানুষ, যাঁরা নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এই এসআইআর প্রক্রিয়ায়। কেউ হারিয়েছেন প্রিয়জনকে, কেউ আবার জীবিত হয়েও এসআইআর-এর তালিকায় মৃত। এই ৫০জন ছিলেন বঙ্গভবনে। কিন্তু আচমকাই ওই বঙ্গভবনের সামনে জড়ো হতে শুরু করে দিল্লি পুলিশ। যাঁদের বাঙ্গাল থেকে এনেছেন, যাঁরা এসেছেন তাঁর উপরেই ভরসা করে, তাঁদের হয়রানি? মমতা ছুটে যান বঙ্গভবনের সামনে, ঘরোয়া পোশাক, আলুথালু খোঁপা নিয়ে। সঙ্গী অভিষেক। গিয়ে দিল্লি পুলিশের সঙ্গে যে কথোপকথন শুরু করেন মমতা, তার প্রথম শব্দ ছিল 'ভাই...'। সীমা, শালীনতা বজায় রেখেও কীভাবে পথে নেমে আসা যায়, নিজের অভিযোগের মুখে কীভাবে দিল্লির বুকে দাঁড়িয়ে দিল্লি পুলিশকে পিছু হঠতে বাধ্য করা যায়, মমতা দেখালেন। কিন্তু সেই যে সবে উদাহরণ তৈরির শুরু, রাজনীতির অলিন্দে আভাস পাওয়া গিয়েছিল কি?
সোম বিকেলে দ্বিতীয় ধাপ। কালো চাদর গায়ে মুখ্য নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে কথা বলতে যান মমতা। সঙ্গী সেই অভিষেক, বাংলার সাধারণ মানুষ। মমতা বৈঠক করে বেরিয়ে কথা বলেন সাংবাদিকদের সঙ্গে। কী বললেন? বললেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার টেবিল চাপড়ে, অপমান করেছেন। কিন্তু তিনি বা তাঁর সঙ্গীরা যে কমিশনের 'সারভেন্ট' নয়, ঠারেঠোরে বুঝিয়ে, বৈঠক বয়কট করে বেরিয়ে গিয়েছেন তিনি। গিয়েছিলেন তাঁর সঙ্গে কথা বলতেই। কিন্তু যে কোনও পরিস্থিতিতে, কোনও সাংবিধানিকপদের কাছেও যে তিনি মাথা নোয়াবেন না, তা স্পষ্ট করেছেন। এই মমতা কি খুব অচেনা বিরোধী নেত্রী মমতার থেকে?
খুব অচেনা কি আজকের মমতা? যে মমতা দেশের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে সওয়াল করলেন? একের পর এক প্রশ্ন করে কমিশনের আইনজীবীদের রীতিমতো বিপদে ফেললেন। নিজের কথা বলতে চাইলেন, সেই মমতার সঙ্গে বিধানসভায় হাজির হওয়া বিরোধী দলের নেত্রীর হুঙ্কারের মিল নেই? মিল নেই কলকাতার রাজপথে অবাধ স্বচ্ছ নির্বাচন, সচিত্র ভোটার কার্ডের দাবিতে নামা মমতার?
শুধু এই তিন দিনের কথা ছেড়ে, যদি আরও কিছুটা পিছিয়ে যাই। জানুয়ারির ৮ তারিখ। ইডি হানার পর, আইপ্যাকের অফিসে তৃণমূল কংগ্রেস সুপ্রিমো মমতা ব্যানার্জি যেভাবে সারাদিন রীতিমতো স্পটলাইট হাইজ্যাক করে ছিলেন, সেই মমতা কি বিরোধী নেত্রী মমতার থেকে আলাদা?যে মমতা লাগাতার কতাক্ষর মুখে দাঁড়িয়ে বলেন, তিনি মুখ্যমন্ত্রী নয় তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী মমতা হিসেবে আইপ্যাকের অফিসে বসে থেকেছেন দিনভর এবং নীতিগত ভাবে কোনও ভুল করেননি, সেখানেই আসলে স্পষ্ট হয়ে যায়, রাজনীতির কৌশল এক থাকার বিষয়টি। স্পষ্ট হয়ে যায়, রাজনীতিতে ন্যারেটিভ তৈরি করে খেলা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টিও।
কিন্তু যে কথা না উল্লেখ করলেই নয়, কথার ভঙ্গিমা, সুর চড়ানো, যে কোনও ইস্যুকে হাতিয়ার করে কেন্দ্রের বিরোধিতা করা ছাড়াও, মমতার রাজনীতির আরও একটি ধরণ দু'দশকে একেবারে অপরিবর্তিত রয়ে গিয়েছে, তা হল তাঁর 'আমি তোমাদেরই লোক' কিংবা আরও চলতি ভাষায় বললে 'গার্লস টু দ্য নেক্সট ডোর' ইমেজ। কেমন সেই ইমেজটা? ২০০৬-এ তাপসী মালিকের বাবার হাত ধরে দাঁড়ানো মমতা, ২০২৬-এ এসআইআর-এ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের শিশুটির হাতে কেক-বিস্কুট তুলে দেওয়া, মঞ্চ থেকে কুশল খবর নেওয়া, এলাকায় গিয়ে সেখানকার মানুষের কথা বলা, মমতা যেকোনও জায়গায়, যে কোনও পরিস্থিতিতে সামনের মানুষকে মনে করিয়েছেন তাঁরা দু'জনেই সমান। দু'জনেই পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছেন এই রাজ্যে, বিশ্বাস করিয়েছেন এই সত্যিটাই। এই এসআইআর, তাঁর এই ইমেজ, তাঁর এই ভিত আরও শক্ত করল কয়েকগুণ। এমনিতেও, তাঁর আগে দীর্ঘ বাম জমানায়, রাজনীতিতে এই সহবত,সৌজন্য প্রাপ্তি ভুলতেই বসেছিল বাংলায় মানুষ। এলিট রাজনীতিবিদরা তো বাংলার 'ভোট ব্যাঙ্ক'খেটে খাওয়া, চাষীমানুষকে নিজেদের মতো 'শিক্ষিত', 'এলিট' ভাবেনি কোনওদিন, না ভেবেছে সংসদীয় রাজনীতির স্টেকহোল্ডার হিসেবে। কিন্তু মমতা ব্যানার্জি এই এক কাজ, ক্রমাগত করে গিয়েছেন।
বিরোধীদের চোখে যদিও তা লোকদেখানো, মিথ্যে, ভুল। তবু বাংলার বাম-বিজেপি কোনও দল, এই পনেরো বছরে লোকহিতকর 'লোকদেখানো' কাজটুকুই করে উঠতে পারেনি। উলটে রাজনীতিকে দিনে দিনে সোশ্যাল মিডিয়ার গান আর হোয়াটসঅ্যা প ইউনিভার্সিটির সিলেবাস ভাবতে শুরু করেছে। সেখানে মমতা ব্যানার্জি পেয়েছেন রাজনীতিতে বিরোধী-সরকার দু'জমানাতেই ফাঁকা মাঠ। তিনি একের পর এক গোল দেন। তিনি মুচকি হাসেন। দিল্লিতে দাঁড়িয়ে বলে আসেন, 'জয়ের পর দেখা হবে, ভাল মিষ্টি খাওয়াব। দিল্লির লাড্ডু নয়।
