আজকাল ওয়েবডেস্ক: চিকিৎসকের ‘মৃত’ ঘোষণার পর ধর্মীয় রীতি মেনে কবর খোঁড়া পর্যন্ত হয়ে গিয়েছিল। মাইকে মৃত্যুসংবাদও প্রচারিত হয়। কিন্তু শেষ মুহূর্তে সরকারি হাসপাতালের এক আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্স টেকনিশিয়ানের দৃঢ়তা ও পেশাগত সতর্কতায় মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এল ১৪ বছরের এক কিশোরী। ঘটনায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে পূর্ব মেদিনীপুরের কাঁথি মহকুমা জুড়ে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কাঁথি থানার দুলালপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের এড়াফতেপুর গ্রামের বাসিন্দা খাদিম সাহার নাবালিকা বোন পারিবারিক অশান্তির জেরে বিষ পান করে। আশঙ্কাজনক অবস্থায় প্রথমে তাকে মাজনা গ্রামীণ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হলে তাকে কাঁথি মহকুমা হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। সেখানে দু’দিন চিকিৎসার পর আইসিইউ বেড না থাকায় তমলুক মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়।
তমলুকে পৌঁছানোর পর চিকিৎসকেরা অবস্থার আরও অবনতি লক্ষ্য করে কলকাতায় রেফার করার পরামর্শ দেন। তবে পরিবারের আর্থিক ও শারীরিক দুশ্চিন্তার মধ্যে তাঁরা তমলুকের একটি বেসরকারি নার্সিংহোমে নিয়ে যান কিশোরীকে। অভিযোগ, সেখানেই অ্যাম্বুলেন্সে থাকা অবস্থায় এক চিকিৎসক চোখ পরীক্ষা করে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
সেই সময় অ্যাম্বুলেন্সে উপস্থিত ছিলেন কাঁথি মহকুমা হাসপাতালের আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্স টেকনিশিয়ান রবীন্দ্রনাথ মণ্ডল। তাঁর দাবি, পালস অক্সিমিটারসহ মনিটরিং যন্ত্রে তখনও ক্ষীণ প্রাণচিহ্ন ধরা পড়ছিল। তিনি চিকিৎসককে বিষয়টি জানান। কিন্তু অভিযোগ, চিকিৎসক সেই দাবি অগ্রাহ্য করে যন্ত্র বিকল বলে জানান এবং রোগীকে ‘নিশ্চিত মৃত’ বলে ঘোষণা করেন।
হতাশ পরিবার এরপর কাঁথিতে ফিরে এসে এক বেসরকারি চেম্বারের চিকিৎসকের কাছে গেলে সেখানেও ‘টু হান্ড্রেড পার্সেন্ট ডেথ’ বলে জানানো হয়। পরিবারের পক্ষ থেকে গ্রামে মৃত্যুসংবাদ জানানো হয়, ধর্মীয় রীতি মেনে কবর খোঁড়ার কাজও সম্পূর্ণ হয়।
ঠিক সেই সময়ই আবারও আপত্তি তোলেন টেকনিশিয়ান রবীন্দ্রনাথ মণ্ডল। তাঁর বক্তব্য, আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্সের মনিটরিং যন্ত্র ভুল দেখানোর সম্ভাবনা অত্যন্ত কম। তিনি গ্রামবাসী ও পরিবারের সদস্যদের বোঝাতে থাকেন—শেষবারের মতো হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে পরীক্ষা করানো হোক। প্রথমে পরিবার অনীহা প্রকাশ করলেও শেষ পর্যন্ত তাঁর আশ্বাসে রাজি হন। তিনি হাসপাতাল সুপারের সঙ্গে কথা বলে আইনি জটিলতা এড়ানোর ব্যবস্থার কথাও জানান।
কবরস্থানের প্রস্তুতি স্থগিত রেখে কিশোরীকে ফের কাঁথি মহকুমা হাসপাতালে আনা হয়। সেখানে জরুরি ভিত্তিতে আইসিইউতে ভর্তি করে চিকিৎসা শুরু হয়। চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে ধীরে ধীরে সাড়া দিতে শুরু করে কিশোরী। কয়েক দিনের নিবিড় চিকিৎসার পর অবস্থার উন্নতি হয় এবং সাত দিন পর তাকে সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
হাসপাতাল চত্বরে এদিন আবেগঘন দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। প্রাণে বেঁচে ফেরা কিশোরী নিজে ফুলের মালা পরিয়ে দেন টেকনিশিয়ান রবীন্দ্রনাথ মণ্ডল, হাসপাতাল সুপার অরূপ রতন করণ এবং চিকিৎসক-নার্সদের। পরিবার ও গ্রামবাসীরাও পুষ্পস্তবক দিয়ে কৃতজ্ঞতা জানান।
ঘটনার পর অভিযুক্ত চিকিৎসকদের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ ছড়ায় এলাকায়। কিছু সময়ের জন্য উত্তেজনাও তৈরি হয়। তবে হাসপাতাল সুপার অরূপ রতন করণ জানান, “আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া যাবে না। লিখিত অভিযোগ পেলে স্বাস্থ্য দপ্তরের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হবে এবং প্রয়োজনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং পুলিশ গোটা বিষয়টি নজরে রাখছে।
এদিকে, অভিযুক্ত চিকিৎসকের চেম্বারে গেলে সেটি বন্ধ অবস্থায় দেখা যায়। স্বাস্থ্য মহলে এই ঘটনা নিয়ে শুরু হয়েছে জোর চর্চা। চিকিৎসা বিজ্ঞানে ‘ক্লিনিক্যাল ডেথ’ ও ‘বায়োলজিক্যাল ডেথ’-এর পার্থক্য, জরুরি পরিস্থিতিতে যন্ত্রনির্ভর পর্যবেক্ষণের গুরুত্ব এবং মৃত ঘোষণা করার প্রোটোকল নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
একজন অ্যাম্বুলেন্স টেকনিশিয়ানের পেশাগত সতর্কতা ও মানবিক জেদের জোরে যে একটি প্রাণ বাঁচতে পারে—কাঁথির এই ঘটনায় সেই বার্তাই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
