আজকাল ওয়েবডেস্ক: বারুইপুরের নাবালিকা ‘ধর্ষণ ও খুনের ঘটনাকে ঘিরে উত্তপ্ত রাজ্যের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহল। ঘটনার পর থেকেই তদন্তের অগ্রগতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং দোষীদের দ্রুত শাস্তির দাবিতে সরব বিভিন্ন মহল। এই পরিস্থিতিতে মঙ্গলবার বারুইপুর পুলিশ সুপারের (এসপি) দপ্তরে পৌঁছলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর এই সফরকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করছে প্রশাসনিক মহল।

 

বারুইপুরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, "ডিজিপিকে ৭২ ঘণ্টা সময় দিয়েছি। তারপরেই কড়া ব্যবস্থা নেব। কাউকেই ছাড়া হবে না।‌ দুই পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছি। আউটপোস্ট চালু করব। এক সপ্তাহের মধ্যে আবার আসব। সরকার যা করছে, তা দেখতে পাবেন। যাঁরা পুলিশের গাড়ি ভেঙেছে, রেললাইন উপড়েছে, তাঁদের ছাড় নয়। এই ধরনের ঘটনা যাতে আর না ঘটে, তার ব্যবস্থা করব। যাঁরা ভোটে হেরেছে, তাঁদের চিহ্নিত করা হয়েছে। আমি ক্ষমতায় এসেই আরজি কর কাণ্ডের তিন আইপিএসকে সাসপেন্ড করেছি। বারুইপুরের নির্যাতিতার পরিবারের ১০, ১২ জনের সঙ্গে কথা হয়েছে। তাঁরা সরকারের পদক্ষেপে সন্তুষ্ট। এই ঘটনার পর যে উস্কানি দেওয়া হয়েছে, তাঁদের ২০০ জনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তিনজন পুলিশ কর্মী আহত, হাসপাতালে ভর্তি। তাঁদের আমি দেখতে যাচ্ছি।" 

 

এদিন এসপি অফিসে পৌঁছে মুখ্যমন্ত্রী জেলার শীর্ষ পুলিশ আধিকারিকদের সঙ্গে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বসেন। বৈঠকে বারুইপুরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে এখনও পর্যন্ত তদন্তে কী কী অগ্রগতি হয়েছে, কতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, ফরেনসিক রিপোর্টের বর্তমান অবস্থা, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহের কাজ কতদূর এগিয়েছে এবং তদন্তের পরবর্তী রূপরেখা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। তদন্তে কোনও ধরনের গাফিলতি বা বিলম্ব হয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে।

 

মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে পুলিশ প্রশাসনকে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত সম্পূর্ণ করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে বলে সূত্রের খবর। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সে লক্ষ্যে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।

 

অন্যদিকে, মুখ্যমন্ত্রীর এসপি অফিসে পৌঁছনোর কিছুক্ষণের মধ্যেই সেখানে এসে পৌঁছন নিহত নাবালিকার পরিবারের সদস্যরা। তাঁদের সঙ্গে পৃথকভাবে কথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী। পরিবারের কাছ থেকে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ শোনেন তিনি এবং তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে তাঁদের অবহিত করেন বলে জানা গিয়েছে। পাশাপাশি পরিবারের দাবি-দাওয়া এবং উদ্বেগের বিষয়গুলিও গুরুত্ব সহকারে শোনা হয়।

 

প্রশাসনিক সূত্রের দাবি, পরিবারের সদস্যদের আশ্বস্ত করে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেক অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং তদন্তে কোনও রকম আপস করা হবে না। দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতেই সরকার প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ গ্রহণ করবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন।

 

বারুইপুরের এই মর্মান্তিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে গত কয়েকদিন ধরেই রাজনৈতিক উত্তাপ ক্রমশ বেড়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে এবং নির্যাতিতার পরিবারের সঙ্গে দেখা করেছে। শাসক ও বিরোধী—উভয় পক্ষই ঘটনার দ্রুত নিষ্পত্তি এবং দোষীদের কঠোর শাস্তির দাবি তুলেছে। প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও শুরু হয়েছে রাজনৈতিক তরজা।

 

এই আবহে মুখ্যমন্ত্রীর বারুইপুর সফর এবং এসপি অফিসে উচ্চপর্যায়ের বৈঠককে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। প্রশাসনিক পর্যায়ে তদন্তের প্রতিটি ধাপ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলেও সূত্রের দাবি। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, এই সংবেদনশীল ঘটনায় কোনও ধরনের শিথিলতা বরদাস্ত করা হবে না।

 

বারুইপুরের সূর্যপুরে নাবালিকা ধর্ষণ-খুনের পর সেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করলেন রাজ্য পুলিশের ডিজি সিদ্ধিনাথ গুপ্ত। আজ মঙ্গলবার তিনি ঘটনাস্থলে যান। যে পুকুর থেকে নাবালিকার বস্তাবন্দি দেহ উদ্ধার হয়েছিল, সরেজমিনে তা খতিয়ে দেখেন তিনি। এরপর সূর্যপুরের যে জায়গা থেকে নাবালিকাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ, সেই পাঠভবন স্কুলের কাছেও যান রাজ্য পুলিশের শীর্ষ আধিকারিকরা। 

 

স্কুলের ভিতরে গিয়ে সিসিটিভি ফুটেজও খতিয়ে দেখেন ডিজি সহ অন্যান্য আধিকারিকরা। তদন্তের গতিপ্রকৃতি নিয়েও পুলিশকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি।

 

উল্লেখ্য, বারুইপুরের ১১ বছরের ওই ছাত্রী নিখোঁজ হয় গত শনিবার সন্ধ্যায়। পরদিন, রবিবার স্থানীয় একটি পুকুরপাড় থেকে তার দেহ উদ্ধার হয়। ঘটনায় এখনও পর্যন্ত কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ঘটনার পর থেকেই রাজনৈতিক দলগুলির পাশাপাশি এলাকার মানুষও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে সরব হয়েছেন।