আজকাল ওয়েবডেস্ক: নবান্ন থেকে রাজ্য সরকারি চাকরিপ্রার্থীদের জন্য এক বিরাট সুখবরের বার্তা এল। রাজ্যের লক্ষ লক্ষ বেকার যুবক-যুবতীর দীর্ঘদিনের দাবি মেনে এক ধাক্কায় সরকারি চাকরির প্রায় সব স্তরেই আবেদনের বয়সের ঊর্ধ্বসীমা বাড়িয়ে দিল নতুন সরকার। শনিবার রাজ্য অর্থ দফতরের অডিট ব্রাঞ্চ থেকে এই সংক্রান্ত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। নবান্ন সূত্রের খবর, সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে সাধারণ শ্রেণির যে সমস্ত পরীক্ষার্থীরা এতদিন বয়সের বেড়াজালে আটকে পড়েছিলেন এবং সরকারি চাকরির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছিলেন, তাঁদের সামনে ফের একবার নতুন করে আশার আলো জেগে উঠল।

নির্বাচনের আগে বিজেপির সংকল্প পত্রে চাকরিপ্রার্থীদের জন্য এই বয়সের ঊর্ধ্বসীমা বাড়ানোর একটি বড় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। আর ক্ষমতায় আসার পর বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে, মুখ্যমন্ত্রী পদে দায়িত্ব নিয়েই শুভেন্দু অধিকারী এই বিষয়ে বড় পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকেই এই সিদ্ধান্তটি সিলমোহর পায় এবং তার ঠিক পরেই রবিবার রাজ্য সরকারের তরফ থেকে এই সংক্রান্ত অফিসিয়াল নির্দেশিকা জারি করে দেওয়া হল। মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়েছিলেন যে, বিগত তৃণমূল সরকারের জমানায় দীর্ঘদিন নিয়মিত নিয়োগ না হওয়ার কারণে রাজ্যের বহু যোগ্য যুবক-যুবতী পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগই পাননি, তাঁদের ভবিষ্যৎ রক্ষা করতেই এই পাঁচ বছরের ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্ত।

নবান্ন থেকে প্রকাশিত ১৭০৭-এফ(পি২) নম্বর বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ১৯৮১ সালের ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল সার্ভিসেস (রেজিং অফ এজ লিমিট) রুলস’-এ বড়সড় সংশোধন এনেছে রাজ্য সরকার। নতুন সংশোধিত নিয়ম অনুযায়ী, এখন থেকে গ্রুপ ‘এ’ ক্যাটাগরির উচ্চপদস্থ চাকরিগুলিতে আবেদনের সর্বোচ্চ বয়সসীমা বাড়িয়ে করা হল ৪১ বছর। তবে বিজ্ঞপ্তিতে এও স্পষ্ট করা হয়েছে যে, যদি কোনও বিশেষ পদের ক্ষেত্রে আগে থেকেই ৪১ বছরের বেশি বয়সসীমা নির্ধারিত থেকে থাকে, তবে তা অপরিবর্তিতই থাকবে। একইভাবে, গ্রুপ ‘বি’ স্তরের চাকরির ক্ষেত্রে আবেদনের ঊর্ধ্বসীমা বাড়িয়ে ৪৪ বছর করা হয়েছে। অন্যদিকে, সাধারণ কর্মী ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মী নিয়োগ অর্থাৎ গ্রুপ ‘সি’ এবং গ্রুপ ‘ডি’ পদের ক্ষেত্রে এই বয়সের সীমা বাড়িয়ে এক লাফে ৪৫ বছর করে দেওয়া হয়েছে।

এই বিজ্ঞপ্তিতে আরও একটি বিষয় অত্যন্ত পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে, যা পরীক্ষার্থীদের জন্য বড় স্বস্তির। পশ্চিমবঙ্গ পাবলিক সার্ভিস কমিশন বা ডব্লিউবিপিএসসি-র আওতাভুক্ত নয় এমন সমস্ত নিয়োগ, অর্থাৎ রাজ্যের বিভিন্ন বিধিবদ্ধ সংস্থা, সরকারি কোম্পানি বা স্থানীয় পুরসভা ও পঞ্চায়েত কর্তৃপক্ষের অধীনে যে সমস্ত নিয়োগ হবে, সে ক্ষেত্রেও আবেদনের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৪৫ বছর হিসেবেই গণ্য করা হবে। সরকার জানিয়েছে, এই নয়া নিয়মটি গত ১১ মে, ২০২৬ তারিখ থেকেই কার্যকর বলে ধরে নেওয়া হবে। অর্থাৎ, মে মাসের ১১ তারিখের পর থেকে রাজ্যে যে সমস্ত নতুন নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ পাবে বা যে প্রক্রিয়াগুলি চালু হবে, তার সবকটিতেই পরীক্ষার্থীরা এই বর্ধিত বয়সের পুরো সুবিধা পাবেন।

রাজ্যের বিশেষজ্ঞ মহল ও চাকরিপ্রার্থীদের একটা বড় অংশ সরকারের এই সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং মানবিক বলে স্বাগত জানিয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া সত্ত্বেও শুধু বয়স পেরিয়ে যাওয়ার কারণে যারা মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে তাঁদের মুখে নতুন করে হাসি ফুটেছে। তবে এই আনন্দের আবহের মধ্যেও চাকরিপ্রার্থীদের একাংশের মনে কিছু বাস্তব প্রশ্ন ও সংশয় দানা বাঁধছে। অনেকের মতেই, বিগত দিনে নিয়োগের সঠিক পরিবেশ না থাকায় অনেকেই বাধ্য হয়ে ব্যবসার পথে হেঁটেছেন বা বেসরকারি সংস্থায় কম বেতনে ঢুকে পড়েছেন। আবার অনেক মহিলা চাকরিপ্রার্থীর এই দীর্ঘ সময়ে বিয়ে হয়ে এখন ভরা সংসার সামলাতে হচ্ছে। ফলে এত বছর পর নতুন করে বই-খাতা নিয়ে বসে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার কঠিন সিলেবাস শেষ করে আদৌ সরকারি চাকরি পাওয়া সম্ভব কি না, তা নিয়ে একটা মৃদু দ্বিধাদ্বন্দ্বও তৈরি হয়েছে। তবে এই ব্যক্তিগত টানাপোড়েন বাদ দিলে, সামগ্রিকভাবে নবান্নের এই বিজ্ঞপ্তি রাজ্যের চাকরি বাজারে এক নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে এবং হাজার হাজার হতাশ যুবকের বুকে নতুন করে লড়াইয়ের সাহস জুগিয়েছে।