গোপাল সাহা: ডায়মন্ড হারবারের গর্বের ‘সেবাশ্রয়’ প্রকল্পকে ঘিরে এবার এক নজিরবিহীন ও বিস্ফোরক দুর্নীতির অভিযোগ সামনে এল। দক্ষিণ ২৪ পরগনার পারুলিয়া উপকূলবর্তী থানার হিঞ্চেবেরিয়া গ্রামে মাটির তলা থেকে বিপুল পরিমাণ জীবনদায়ী ওষুধ উদ্ধারের ঘটনায় তোলপাড় পড়ে গেছে রাজ্য রাজনীতিতে। এই ঘটনায় শুধু স্থানীয় তৃণমূল নেতাই নন, সরাসরি কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ তথা তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জিকে। তাঁর পাশাপাশি তাঁর আপ্ত সহায়ক সুমিত রায়, অয়ন ঘোষ দস্তিদার, দুই জেলাশাসক এবং জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিকসহ মোট ১৬ জনের বিরুদ্ধে থানায় একটি গুরুতর লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। অভিযোগটি দায়ের করেছেন দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিজেপি নেতা অভিজিৎ দাস (ববি)।

ডায়মন্ড হারবারকে মডেল লোকসভা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে ধুমধাম করে চালু করা হয়েছিল এই নিখরচায় চিকিৎসা ও ওষুধ দেওয়ার ‘সেবাশ্রয়’ ক্যাম্প। পরবর্তীকালে নন্দীগ্রামসহ আরও বেশ কিছু এলাকায় এই ক্যাম্প চালু হয়। কিন্তু লোকসভা ভোটের ফল প্রকাশের পর থেকেই এই সেবামূলক কর্মসূচি নিয়ে একের পর এক ধোঁয়াশা তৈরি হতে শুরু করে। এবার সরাসরি অভিযোগ উঠেছে যে, জনকল্যাণের নামে সংগ্রহ বা ক্রয় করা কোটি কোটি টাকার ওষুধ সাধারণ মানুষের মধ্যে বিলি না করে, অত্যন্ত গোপনে খোলা বাজারে পাচারের উদ্দেশ্যে কিংবা প্রমাণ লোপাট করতে মাটির নিচে পুঁতে ফেলা হয়েছিল। অভিযোগপত্রে স্পষ্ট দাবি করা হয়েছে, অভিষেক ব্যানার্জি নিজেই নিজেকে এই কর্মসূচির প্রতিষ্ঠাতা, মূল পরিকল্পনাকারী ও নিয়ন্ত্রক হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। তাই এই বিপুল পরিমাণ অর্থের উৎস, ওষুধের অনুমোদন এবং পুরো বাস্তবায়নের পেছনে তাঁর ভূমিকা কতটা, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা দরকার।

এই মামলায় অন্যতম মূল অভিযুক্ত করা হয়েছে অভিষেকের আপ্ত সহায়ক সুমিত রায়কে, যিনি ভোটের ফল প্রকাশের পর থেকেই পুলিশের চোখে ‘পলাতক’। এছাড়া ক্যাম্প ও কর্মী ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা অয়ন ঘোষ দস্তিদার, স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা জাহাঙ্গীর খান, শামিম আহমেদ মোল্লা, গৌতম অধিকারী, মেহবুব গায়েন, দিলীপ মণ্ডলদের নামও রয়েছে তালিকায়। শুধু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বই নন, রেহাই পাননি প্রশাসনের শীর্ষ কর্তারাও। তৎকালীন দুই জেলাশাসক সুমিত গুপ্তা ও অরবিন্দ কুমার মিনা এবং ডায়মন্ড হারবার এলাকার সমস্ত সিএমওএইচ ও বিএমওএইচ-এর বিরুদ্ধেও তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে। অভিযোগকারীর সন্দেহ, সরকারি স্টক রেজিস্টারে ভুয়ো রেকর্ড তৈরি করে দেখানো হয়েছে যে ওষুধগুলো রোগীদের দেওয়া হয়েছে, অথচ বাস্তবে তা করা হয়নি। এছাড়া ওষুধের প্যাকেটের গায়ে লেখা সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য বা লেবেলে কোনও  কারচুপি ছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

এই ভয়াবহ আবহে হিঞ্চেবেরিয়া গ্রামে মাটির নিচ থেকে মাটি কাটার যন্ত্র বা জেসিবি দিয়ে ওষুধ তোলার ঘটনায় এলাকার মানুষের মধ্যেও তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে লিখিত আবেদনে দাবি জানানো হয়েছে, ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা (বিএনএসএস) অনুযায়ী যেন অবিলম্বে একটি নিয়মিত এফআইআর দায়ের করে তদন্ত শুরু করা হয়। কোনোভাবেই যাতে ওষুধ ক্রয়ের বিল, জিএসটি ইনভয়েস, স্টক রেজিস্টার বা সিসিটিভি ফুটেজ নষ্ট না হতে পারে, তার জন্য দ্রুত তল্লাশি চালিয়ে সব নথি বাজেয়াপ্ত করার আর্জি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে উদ্ধার হওয়া ওই বিপুল পরিমাণ ওষুধের রাসায়নিক কার্যকারিতা ও লেবেলের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সরকারি ফরেনসিক ল্যাবরেটরিতে নমুনা পাঠানো এবং এই অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রে জড়িত দোষী ব্যক্তিদের অবিলম্বে গ্রেপ্তারের দাবি উঠেছে। রাজনৈতিক মহলের মতে, লোকসভা ভোটের পর যখন এমনিতেই শাসকদল নানা দ্বন্দ্বে জর্জরিত, তখন খোদ ডায়মন্ড হারবারের ‘সেবাশ্রয়’ নিয়ে এমন চাঞ্চল্যকর অভিযোগ নিশ্চিতভাবেই চাপ বাড়াবে ঘাসফুল শিবিরের ওপর।