চন্দ্রিমা রায়: এক একটি মানুষের মৃত্যু শুধু একটি জীবনের সমাপ্তি নয়, কখনও কখনও একটি জীবন্ত ইতিহাসেরও অবসান। তিজনবাঈয়ের প্রয়াণ তেমনই এক মুহূর্ত। ভারতীয় লোকসংস্কৃতির এক অনন্য অধ্যায় যেন আচমকাই পূর্ণবিরাম পেল। কিন্তু সত্যিই কি পেল? শিল্পীর মৃত্যু হয়, শিল্পের নয়। বরং শিল্পী যখন চলে যান, তখনই তাঁর শিল্পকে নতুন করে চিনে নেওয়ার, সংরক্ষণ করার এবং আগামী প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়ার দায় আরও বেড়ে যায়।
ছত্তিশগড়ের এক সাধারণ পরিবারে জন্ম নেওয়া সেই মেয়েটি হয়তো কোনও দিন ভাবেননি, তাঁর কণ্ঠস্বর একদিন মহাদেশ পেরিয়ে পৃথিবীর নানা প্রান্তে ভারতীয় লোকঐতিহ্যের প্রতিনিধি হয়ে উঠবে। পারধি সম্প্রদায়ের সন্তান তিজনবাঈ ছোটবেলায় মাতামহের মুখে শুনেছিলেন মহাভারত। সেই শোনা একদিন হয়ে উঠল তাঁর জীবন। বইয়ের পাতার মহাভারত নয়, মানুষের কণ্ঠে বেঁচে থাকা মহাভারত— সেই ঐতিহ্যেরই নাম পাণ্ডবাণী।
পাণ্ডবাণী শুধু গান নয়, শুধু অভিনয়ও নয়। এটি স্মৃতি, সুর, শরীরী ভাষা, কাহিনি, নাট্য এবং তাৎক্ষণিক সৃজনশীলতার এক বিরল সম্মিলন। হাতে একটি তানপুরা, অথচ মুহূর্তে সেটিই কখনও ভীমের গদা, কখনও অর্জুনের ধনুক, কখনও দ্রৌপদীর অসহায় আর্তি। একজন শিল্পী, অথচ মঞ্চে উপস্থিত হয়ে ওঠে এক বিস্তৃত মহাকাব্য। এই অসাধারণ রূপান্তরের ক্ষমতাই তিজনবাঈকে অনন্য করে তুলেছিল।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আমরা যখন লোকসংস্কৃতির কথা বলি, তখন প্রায়শই তাকে 'ঐতিহ্য' বলে জাদুঘরে তুলে রাখতে চাই। অথচ তিজনবাঈ দেখিয়েছেন, লোকশিল্প কোনও মৃত ঐতিহ্য নয়; এটি জীবন্ত, পরিবর্তনশীল এবং সমকালীন। তাঁর কণ্ঠে মহাভারত কখনও কেবল অতীতের গল্প হয়ে ওঠেনি, বরং মানুষের সাহস, ন্যায়, সংগ্রাম এবং আত্মমর্যাদার চিরন্তন কাহিনি হয়ে ফিরে এসেছে।
তাঁর জীবনের সংগ্রামও কম তাৎপর্যপূর্ণ নয়। নারী হয়ে পাণ্ডবাণী পরিবেশন করার অপরাধে তাঁকে সামাজিক বয়কট, অপমান এবং দারিদ্র্যের মুখোমুখি হতে হয়েছে। কিন্তু শিল্পের প্রতি তাঁর বিশ্বাস এত গভীর ছিল যে কোনও প্রতিকূলতাই তাঁকে থামাতে পারেনি। আজ যখন নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে নানা আলোচনা হয়, তখন তিজনবাঈয়ের জীবন তার এক বাস্তব, শক্তিশালী উদাহরণ।
কিন্তু তাঁর প্রয়াণ আমাদের সামনে আরও বড় একটি প্রশ্ন রেখে গেল— আমরা কি আমাদের লোকঐতিহ্য সংরক্ষণ করতে প্রস্তুত?
লোকশিল্পের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল, তা কাগজে সম্পূর্ণ ধরা পড়ে না। তার প্রাণ থাকে শিল্পীর কণ্ঠে, শ্বাসে, দৃষ্টিতে, বিরতিতে, শরীরের ভঙ্গিমায়। তিজনবাঈয়ের প্রতিটি পরিবেশনা তাই ছিল এক একটি নতুন সৃষ্টি। একই কাহিনি, অথচ প্রতিবার অন্য আবেগ, অন্য ছন্দ, অন্য নাটকীয়তা। ফলে তাঁর শিল্পকে শুধু লিখে রাখা যথেষ্ট নয়; তাকে দেখতে হবে, শুনতে হবে, অনুভব করতে হবে।
এই কারণেই আজ সবচেয়ে জরুরি তাঁর সমস্ত পরিবেশনার একটি আন্তর্জাতিক মানের ডিজিটাল সংরক্ষণ। অডিও-ভিডিও রেকর্ডিং, সাক্ষাৎকার, আলোকচিত্র, গবেষণাপত্র, মঞ্চ-নথি— সবকিছুকে একত্র করে তৈরি হতে পারে 'তিজনবাঈ ডিজিটাল আর্কাইভ'। সেখানে শুধু তথ্য নয়, থাকবে তাঁর কণ্ঠের ওঠানামা, বাচনভঙ্গি, উপভাষার ব্যবহার, শরীরী ভাষা, দর্শকের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের বিশ্লেষণও। আধুনিক প্রযুক্তি, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উচ্চমানের ডিজিটাল পুনরুদ্ধার এবং পারফরম্যান্স ডকুমেন্টেশন এই কাজে নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।
কারণ, তিজনবাঈ কেবল একজন শিল্পী নন; তিনি একটি সাংস্কৃতিক পদ্ধতির শেষ মহান প্রতিনিধিদের অন্যতম। তাঁর সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে শতাব্দীপ্রাচীন এক মৌখিক ঐতিহ্যের সূক্ষ্মতম শিল্পরহস্য, যদি আমরা এখনই তাকে নথিবদ্ধ না করি।
হয়তো তাঁর নামে প্রতিষ্ঠিত হবে গবেষণা কেন্দ্র, ফেলোশিপ, স্মারক বক্তৃতা কিংবা পাণ্ডবাণী শিক্ষাকেন্দ্র। হওয়াই উচিত। কিন্তু তারও আগে প্রয়োজন তাঁর শিল্পকে সময়ের ক্ষয় থেকে রক্ষা করা। কারণ একটি জাতি তার ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে শুধু নতুন সৃষ্টি দিয়ে নয়, নিজের শ্রেষ্ঠ ঐতিহ্যকে যত্নে সংরক্ষণ করেও।
তিজনবাঈ আজ নেই। কিন্তু তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত মহাভারত, তাঁর চোখের ভাষা, তাঁর অভিনয়ের অভিঘাত এবং তাঁর অবিনশ্বর শিল্পসাধনা ভারতীয় সংস্কৃতির স্মৃতিতে বহুদিন ধরে প্রতিধ্বনিত হবে। শিল্পীর মৃত্যুই যদি আমাদের সাংস্কৃতিক স্মৃতিকে আরও সচেতন করে তোলে, তবে সেই নীরবতাও একদিন ইতিহাসের ভাষা হয়ে ওঠে।
















