টানা বহু দিন ধরে অনশনে বসে রয়েছেন সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক। শারীরিক অবস্থা তাঁর ক্রমশ উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। চিকিৎসকদের আশঙ্কা, দ্রুত শরীরে খাবার না গেলে পরিস্থিতি চরম রূপ নিতে পারে, এমনকী মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। অথচ, তাঁর শারীরিক অবস্থার নিয়মিত খোঁজখবর পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে না!
2
12
এই উদাসীনতা নিয়েই এবার চরম উষ্মা প্রকাশ করল দিল্লি হাই কোর্ট। আদালত সাফ জানিয়েছে, দেশের প্রত্যেকটি নাগরিকের জীবন অত্যন্ত মূল্যবান। তাই অবিলম্বে সোনম ওয়াংচুকের নিয়মিত ডাক্তারি পরীক্ষা করাতে হবে, দিতে হবে প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র। তাঁর জীবন বাঁচাতে সরকারকে সব ধরনের পদক্ষেপ করার নির্দেশ দিয়েছে আদালত।
3
12
লাদাখের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে এসে আজ যিনি দেশজুড়ে পরিচিত, সেই তথ্য প্রযুক্তিবিদ, শিক্ষাবিদ ও সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুকের জীবনটা কিন্তু সহজ ছিল না। পদে পদে ভৌগোলিক ও ভাষার বাধা পেরিয়েই আজকের এই পরিচিতি।
4
12
হিমালয়ের কোলের এক ছোট্ট গ্রাম থেকে শ্রীনগর এনআইটি, আর তারপর ফ্রান্সে পরিবেশবান্ধব স্থাপত্যের পাঠ- সোনমের এই যাত্রাপথই প্রমাণ করে, শিক্ষা তখনই সার্থক হয় যখন তা বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধানে কাজে লাগে।
5
12
১৯৬৬ সালে লাদাখের আলচির কাছে এক প্রত্যন্ত গ্রামে জন্ম সোনমের। গ্রামে কোনও স্কুল না থাকায় নয় বছর বয়স পর্যন্ত স্কুলেই যেতে পারেননি তিনি। বাড়িতেই মায়ের কাছে মাতৃভাষায় শুরু হয় অক্ষরের সঙ্গে পরিচয়। পরে বাবা জম্মু ও কাশ্মীরের রাজনীতি ও সমাজজীবনের সঙ্গে যুক্ত হলে, সোনমের ঠাঁই হয় দিল্লির ‘বিশেষ কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়’-এ।
6
12
সেখান থেকেই তাঁর পড়াশোনার পরিধি এক ধাক্কায় অনেকটা বেড়ে যায়। ১৯৮৭ সালে শ্রীনগরের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি (তৎকালীন আরইসি) থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বি.টেক ডিগ্রি নেন তিনি। পরে পরিবেশবান্ধব স্থাপত্য নিয়ে আরও পড়াশোনার জন্য পাড়ি দেন ফ্রান্সে।
ওখানকার ‘ক্রাতের স্কুল অব আর্কিটেকচার’ থেকে মাটির তৈরি টেকসই স্থাপত্যের ওপর বিশেষ পাঠ নেন তিনি। এই শিক্ষাই তাঁকে হিমালয়ের রুক্ষ আবহাওয়ার উপযোগী পরিকাঠামো তৈরির অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল।
7
12
প্রসঙ্গত, বলিউডের ব্লকবাস্টার ছবি ‘থ্রি ইডিয়টস’-এর বিখ্যাত চরিত্র ‘পুংসুখ ওয়াংড়ু’র অনুপ্রেরণা কিন্তু এই সোনম ওয়াংচুকই।
8
12
কেবল নিজের কেরিয়ার নয়, লাদাখের পিছিয়ে পড়া যুবসমাজকে আলো দেখাতে ১৯৮৮ সালে তিনি গড়ে তোলেন ‘স্টুডেন্টস এডুকেশনাল অ্যান্ড কালচারাল মুভমেন্ট অব লাদাখ’ বা ‘সেকমল’। ‘অপারেশন নিউ হোপ’-এর মতো অভিনব প্রকল্পের মাধ্যমে সরকারি স্কুলের পড়াশোনার খোলনলচে বদলে দিতে প্রশাসন ও স্থানীয় মানুষকে এক ছাতার তলায় আনেন সোনম।
9
12
তবে সোনম ওয়াংচুককে দুনিয়া এক ডাকে চেনে তাঁর যুগান্তকারী উদ্ভাবন ‘আইস স্টুপা’র জন্য। শীতকালের উদ্বৃত্ত জলকে কৃত্রিম পাহাড়ি হিমবাহের রূপ দিয়ে জমিয়ে রাখার এক আশ্চর্য কৌশল এটি।
10
12
বসন্তের শুরুতে যখন লাদাখে চাষবাসের জন্য জলের তীব্র হাহাকার তৈরি হয়, তখন এই বরফের স্তূপ গলতে শুরু করে জলের অভাব মেটায়।
11
12
এখানেই শেষ নয়, পুঁথিগত বিদ্যার বাইরে বেরিয়ে হাতে-কলমে শিক্ষার প্রসারে তিনি তৈরি করেছেন ‘হিমালয়ান ইনস্টিটিউট অফ অল্টারনেটিভস, লাদাখ’।
12
12
পাশাপাশি, স্থানীয় মানুষের রুটিরুজির ব্যবস্থা করতে এবং পরিবেশবান্ধব পর্যটনকে বাড়াতে চালু করেছেন ‘ফার্মস্টেজ লাদাখ’ নামের এক উদ্যোগ। জীবনভর বাধা বিপত্তি পেরিয়ে লাদাখের মানুষের জন্য তাঁর এই লড়াই আজও দেশের শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারের ইতিহাসে এক অনন্য নজির হয়ে রয়েছে।