সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়: পদের সঙ্গে সঙ্গে পাইস হোটেলের পদাবলীরও শেষ নেই। ছাতুবাবুর বাজারের শান্তি হোটেলের ভোজের "মুখ্ রা" টুকুর-ই মহা ভক্ত নাকি ছিলেন জ্ঞান গোঁসাই (পন্ডিত জ্ঞানেদ্র প্রসাদ গোস্বামী)। ঘি দিয়ে মুষ্টিযোগে আলু-পেঁয়াজ-ধনেপাতা মাখা আর সোনামুগের ঘন ডাল, এর ওপরে আর কিছুতেই ওঠেননি রাগ-পুরুষ।
কিংবা বসুমতী সাহিত্য মন্দিরের কাছের সেই "অতি জাগ্রত" হোটেলটি। যার বিখ্যাত কাঁটাচচ্চড়ির রেসিপির মিথ 'ভঙ্গ' করতে সাংবাদিকদের বহু কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল। তারপর, সর্বকনিষ্ঠ ভৃত্যটিকে ক্যাডবেরি আর ভিমটো যোগে বশীভূত করে জানা গেল, মালিক প্রতিদিন-শেষে কয়েকটি উচ্ছিষ্ট কিন্তু তাগড়া কাঁটা-মাথা নিয়ে যান। তাদেরই "লেগডাস্ট" পরের দিন কড়াই আলোড়িত করে.... আলোকিতও বটে।
বহুদিন রমরম করে চলেছে সেই আহারতীর্থ। তখন না ছিল "স্ট্রিং অপারেশন" না ছিল রেকর্ডার, সাংবাদিককূলের ছিল কাঁটাচচ্চড়ির ওপর আনুগত্য।
হোটেল উঠে যাওয়ার বহু পরে কয়েকজন মুখে মুখেই শুনেছিলেন, প্রকাশিত হয়নি।
বউবাজারে বঙ্গলক্ষ্মী-- সেথায় ছিল সবিতা-সলিল চৌধুরীর নিত্য আসাযাওয়া। স্বাদের চৌতালে বুঁদ হয়ে কত গানে যে জায়ফল - জাফরান ফ্লেভার ছড়িয়েছেন, কে তার হিসেব রাখে?
পরের ঘটনাটি অনেক সাম্প্রতিক কালের। আমার নিজের দেখা, লেকমার্কেটের তরুণ নিকেতন ভোজনাগারে। ভারি নিরীহ এক যুবক, হয়তো PSC Bhavan-এ এসেছিল চাকরির দরখাস্ত নিয়ে। সামান্য নিরামিষ থালা অর্ডার দিয়েছিল। দাম দেবার সময়, পরিবেশক হাঁক মারল: খায়নি দায়নি -- কুড়ি টাকা।
মালিক, ইনি আবার অনেকটা অভিনেতা শৈলেন মুখোপাধ্যায়ের মতো সৌম্য -- হুংকার দিলেন: এই হারামজাদা, আমি দেখিনি ভেবেছিস, তোর হাতের ধাক্কায়ই তো ভাতে জল পড়ে গেল!
আপনি বসুন ভাই। ওনাকে মাছ ভাত দে। ভরদুপুরে অতিথিকে উঠিয়ে দেওয়ার প্রায়শ্চিত্ত করতে দিন।
না আছে সেই ভদ্রজন... না সেই ভদ্রাসন।
পরবর্তী কালে দাম বেড়েছে সময়সরণি ধরে। তবুও তা ছিল আম-আদমির নাগাল সাধ্য। কালের মিউটেশনে সেই পাইস হোটেল আজ প্রায় বিলীন।
যে কয়েকটি এখনও টিমটিম করে জ্বলছে.... শিয়ালদহের "সাধুর হোটেল", চিৎপুর বাজারের দোতলায় "কমলা হোটেল" ( এদের রুই-কালিয়া এখনও ফাইভ-স্টারদের দাঁড়িয়ে ৫ - ০ গোলে হারাবে, লিখে দিচ্ছি!), খিদিরপুরের "ইয়ং বেঙ্গল"( মোচা -চিংড়ি ... আহা !), সোনারপুর বাজারে ডিমভরা পার্শের ঝাল নিয়ে উঠে গেছে "আদর্শ হিন্দু হোটেল"!
"পাইস" না রইলেও "প্রাইস" হোটেল হয়ে ওঠেনি এরা।
কলকাতা ও শহরাঞ্চলের সব বাজারেই কয়েকটি করে সস্তার ভোজনালয় থাকে। গড়িয়াহাট বাজারের কালী মাইতির বা ভোলা হালদারের হোটেল, মানিকতলা বাজারের নিমাই সূত্রধর বা কলেজ স্ট্রিট মার্কেটের বাবলু মাঝির ভাতের হোটেল তো অতীব স্বাদের আলয়। কালী মাইতি "তেলাপিয়ার ঝাল", নিমাই এর "তেতো-শুক্ত ", বাবলুদার "মেটে চচ্চড়ি" জীবনে একবার অন্তত গরম ভাতের সঙ্গে মেখে কাঁচালংকা কামড়ে খেয়ে দেখবেন।
ফেরার পথে সারা রাস্তা যদি না "সার্থক জনম আমার, জন্মেছি এই দেশে" গুনগুন করতে করতে না ফেরেন... এই কলম ছুঁড়ে ফেলে দেব মশাই!
স-ব ই তো হল, কিন্তু ভুলেও কমলা হোটেল, বঙ্গলক্ষ্মী, ইয়ং বেঙ্গল ওইসব ক্ল্যাসিক পাইস হোটেলিয়রদের কাছে বাজারি আহারস্থলগুলির প্রশংসা করতে যাবেন না! একটা 'স্ট্যাটাস কনসাশনেস'-এর ব্যাপার আছে। ওগুলি হল তথাকথিত B Class।
বঙ্গলক্ষ্মীর তপনবাবু এইভাবে বলবে: "স্বদেশী আমলে আমাদের এই সব পাইস হোটেলে বিপ্লবীরা আসতেন। খাবার ফাঁকে বই- ইস্তেহার - এমনকি অস্ত্র দেওয়া নেওয়া হত। আজ এখানে তো, কাল কমলায়। আমার বাবা- কাকারা কতবার এজন্য জেলে গেছেন, খবর রাখেন?
আলুওয়ালা মাছওয়ালার হোটেল আর আমরা এক হলাম মশাই?" এর উত্তর খোঁজার দরকার নেই।
যদি "বেঙ্গলি কুইসিন" না খুঁজে বাঙালি খাবার পছন্দ করেন, বেশ "স্লিম" চামরমণি চালের ভাত, মুগডাল, উচ্চেভাজা, বড়ি-শুক্তো, এঁচোড়, আলু-পটলের
"কেতাহীন" ডালনা, মাছের ঝাল আর আমের টক, আপনার হৃদয়ে নস্টালজিয়ার রাগ দুর্গা কোমল ধৈবতে বাজিয়ে দেয় একটি দুপুরে, চলে আসুন, একটু খুঁজে, রসবতীর নান্দীকার আপনার জন্য যেখানে 'এক পয়সার পালা' সাজিয়ে অপেক্ষা করছে, আজও।
শুধুমাত্র তথাকথিত বাঙালি পাইস হোটেলের কথা বলে মুখশুদ্ধি খেয়ে বেরিয়ে পড়লে অগ্নিমান্দ্য হতে পারে। তাই একটু সংযোজনার প্রয়োজন। অবাঙালি পাইস হোটেলও কিন্তু ছিল প্রচুর এবং সেখানে বাঙালি খাদ্যরসিক প্রবরদের যাতায়াত ছিল অনিরুদ্ধ।
বড়বাজার -হাওড়া ষ্টেশনের আশেপাশে অনেক বিহারি ও মারোয়াড়ি সস্তার আহারস্থল ছিল। পুরোপুরি নিরামিষ.. পেঁয়াজ -রসুন বর্জিত। না গেলেও তাদের সুনাম কানে যেত অবশ্যই।
ছিল চিনে পাইস হোটেল। ট্যাংরায় তো বটেই, আদত চীনেবাজারে ছিল একগাদা। লালবাজারের উল্টোদিকে ছাতাওয়ালা গলি। একটু ঢুকলেই ওয়াং আন্টির দোকান।
বয়েসের গাছপাথর যেমন ছিল না, তেমনই ছিল না ন্যুডলস -স্যুপ-চিকেন গ্রেভির পরিমাণেরও। সারাদিন খোলা। কলেজ জীবনে পাঁচ টাকায় পেট চুক্তি সেই খাওয়া আজও যেন মুখে লেগে আছে। কোথায় লাগে তাজের "চিনোসেরি."...কোথায় বা গ্র্যান্ডের "বান থাই"!
বেনিয়াপুকুর ট্রাম ডিপোর পাশের গলিতে ছিল পরপর কয়েকটি ছোট মুসলিম হোটেল। মুস্তাক ভাইয়েরটি ছিল সবচেয়ে চালু। আর ওদিকে পার্ক সার্কাস মোড়ে সারি সারি গাড়ি সারনোর দোকানের মাঝে ছিল হালিম ভাইয়ের ফুট-হোটেল। সবগুলোতেই বড় করে লেখা থাকত "নো বিফ"। অনেকেই বলত... যে জানে করহ সন্ধান!
তখন কিন্তু এখানে- সেখানে -অমৃত বস্ত্রালয়ের সামনে লাল কাপড় জড়ানো ডেকচিতে বিরিয়ানি মিলত না। Mind It! অমন সরেস বিরিয়ানি আমি আর খেলাম না মশাই! দমপুক্ত-গুচ্ছি-আরসালান এর মহড়া নেবে যে কোনও সময়! যেমন খুশবু... তেমন গোস্তানা! মাংস খন্ডটি মুখে দিলেই যেন আহ্লাদে গলে যেত। সঙ্গে থাকত ভুরানি -- রায়তার ভাগ্নে বউ! আলু -খুশক পোলাও -ভুরানি রিপিট হতো। পাঁচ টাকা। এস্টক থাকা পর্যন্ত।
পার্ক শো হাউসের উল্টো দিকের গলিতে রয়েছে স্কটিশ সাহেবদের কবরখানা। সেই রাস্তায় সন্ধ্যেবেলায় বসত ইস্রাফিল কাবাবচি। আমরা বলতুম, "কাবাবের পাইস হোটেল"। মেনু একদম সাধাসিধে। কাকোরি কাবাব আর
তিন-জ' প্রস্থের পরোটা। কাবাবের সাইজ -- ডুমো ডুমো করে কাটা মাংসের আলুর মতো। পাঁচ পিস দু টাকা 'পারাঠা' সহ। দস্তুর ছিল রোল করে খাওয়া যাবে না। তাতে কাকোরির সম্মানহানি হয়।
কাকোরি, বলতে পারেন, গালৌটি কাবাবের ন'কাকার ছেলে। মুখে দিয়ে কাবাব কথাটি উচ্চারণ করার আগেই --- "তু কাঁহা... ইয়ে বাতা, ইস নাশেলি রাত মে...?" এবং অতঃপর "মানে না মেরা দিল দিওয়ানা!" ততক্ষণে আর এক 'পেলেট' এসে পড়েছে। সে বস্তুর কাছে কোথায় লাগে দিল্লী - লখনউয়ের করিম'স আর টুন্ডেওয়ালার কাবাব!
মিঁয়া কিন্তু কাবাবের ফর্মুলা একমাত্র মেয়েটি ছাড়া কাউকে বলেনি। উর্দুতেও বোধহয় কাহাওয়াত আছে আমাদের মতো, "যম জামাই ভাগ্না, কখনও হয় না আপনা।" জামাই বসে টাকা গুনতো আর মৌরি দানা খাওয়ার মতো কাকোরি দানা মুখে পুরতো।
কানু, সুনীতি চাটুয্যের একলৌতা নাতি, তাকে দেখলেই বলত, "কি কপাল দাদা! এ শালার রোজ জামাইষষ্ঠী!" জানে কাঁহা গ্যয়ে উয়হ দিন...
ঘ্রানেনঃ অর্ধ ভোজনম্
আর দর্শনে সিকি
খাদ্যরসিক বাঙ্গালির
হেঁসেলে বাঁধা টিকি
আমরা হলেম গে, যাকে বলে, স্বাদে মাতাল - ঝালে ঠিক। দেখুন না, তত্ত্ব-তালাশ করে এরকম আরও কয়েকটির খপর যদি পাওয়া যায়! স্বাদ-কোরকগুলি যারপরনাই আহ্লাদিত হবে। গড প্রমিস!
















