স্পেন - ২ (ওয়ারজাবাল, পেড্রি ) 

ফ্রান্স - ০ 

আজকাল ওয়েবডেস্ক: আমেরিকায় ফরাসি বিপ্লবের অপেক্ষা ছিল। বাস্তিয়ান ডের মতো ঐতিহাসিক দিনে ইতিহাস রচনা করতে ব্যর্থ কিলিয়ান এমবাপেরা। বরং, স্প্যানিশ আর্মাডায় ধ্বংস ফ্রান্স। মঙ্গলবার ভারতীয় সময় মধ্যরাতে ডালাসে ফ্রান্সকে ২-০ গোলে হারিয়ে ১৬ বছর পর বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেন। এই নিয়ে দ্বিতীয়বার। ২০১০ সালে প্রথম এবং শেষবার ফাইনালে উঠেছিল লা রোজারা। আন্দ্রে ইনিয়েস্তার গোলে চ্যাম্পিয়ন হয়। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটবে কিনা সময় বলবে। তবে এদিন মার্কিন মুলুকে সবচেয়ে জঘন্য ফুটবল ফ্রান্সের। বিবর্ণ এমবাপে। তাতেই শেষ ফরাসিদের দাপট। দাড়ি পড়ল দিদিয়ের দেশঁর জামানায়। বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে হার দিয়েই ফ্রান্সে ১৪ বছরের যাত্রা শেষ ফরাসি কোচের। 

২০১০ সালের পর বিশ্বকাপে দুই গোলের ব্যবধানে কখনও হারেনি ফ্রান্স। কিন্তু এদিন টুর্নামেন্টের অন্যতম ফেভারিটদের নিয়ে ছিনিমিনি খেলল স্পেন। হাড্ডাহাড্ডি সেমিফাইনালের অপেক্ষা করছিল বিশ্বের ফুটবলপ্রেমীরা। কিন্তু কার্যত একপেশে ম্যাচ। চলতি বিশ্বকাপে কখনও শুরুতে গোল হজম করেনি ফ্রান্স। পিছিয়ে পড়ে কামব্যাক করার কোনও প্ল্যান বি ছিল না দেশঁর। আর্জেন্টিনা হতে পারল না ফ্রান্স। যার ফলে পুরোপুরি আত্মসমর্পণ। হাতেগোনা কয়েকবার বল পান এমবাপে। তারমধ্যে বেশ কয়েকবার অফসাইডের ফাঁদে পড়েন। দিনটি তাঁর ছিল না। ২০২২ সালে কাতারে হ্যাটট্রিক করেও বিশ্বকাপ খুইয়েছিলেন। কিন্তু এদিন ম্যাচ থেকে পুরো হারিয়ে যান। স্পেনের কোচের জালে আটকে পড়েন ফরাসি তারকা। 

টানা তৃতীয়বার বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার হাতছানি ছিল ফ্রান্সের সামনে। বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় মেসির থেকে দু'গোল পিছিয়ে ছিলেন এমবাপে। একবিংশ শতাব্দীতে প্রথম প্লেয়ার হিসেবে বিশ্বকাপের এক সংস্করণে ১০ গোল করার হাতছানি ছিল। সবই অধরা। অন্যদিকে বিশ্বকাপের নকআউটে কনিষ্ঠতম গোলদাতা হওয়ার সুযোগ ছিল লামিন ইয়ামালের সামনে। সেটা না হলেও, দলকে গুরুত্বপূর্ণ পেনাল্টি পাইয়ে দেন। ২০১০ সালের পর প্রথমবার বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার সুযোগ ছিল স্পেনের সামনে। করে দেখাল স্প্যানিশরা। ক্লাব এবং আন্তর্জাতিক ফুটবল মিলিয়ে এমবাপে-ইয়ামালের মধ্যে একাদশ সাক্ষাৎ। আগের দশ ম্যাচের মধ্যে আটটি জেতেন স্প্যানিশ তারকা। শেষ দুই সাক্ষাতের পাশাপাশি গত ২০ বছর সবচেয়ে বেশিবার ফ্রান্সকে হারায় স্পেন। দশের মধ্যে সাত। সেই ধারাই অব্যাহত রইল। স্পেনের বিরুদ্ধে গোল করলেই গোল্ডেন বুটের দৌড়ে মেসিকে ছাপিয়ে যাওয়ার হাতছানি ছিল এমবাপের সামনে। দু'জনেই গোল সংখ্যা আট। কিন্তু সেই রেকর্ডও অধরা। 

স্পেনের প্রথম একাদশে চমক। আবার প্রথম দলে রাখা হয়নি পেড্রিকে। পরপর দুই ম্যাচে শুরু করেন ফ্যাবিয়ান রুইস। ফ্রান্স দলে দুটো পরিবর্তন করেন দেশঁ। দলে ফেরেন চুয়ামেনি এবং বারকোলা। চলতি বিশ্বকাপে মাত্র একটি গোল হজম করেছে স্পেন। অর্থাৎ, লড়াইটা মূলত ছিল ফ্রান্সের আক্রমণ বনাম স্পেনের রক্ষণের। এবারের বিশ্বকাপে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোল ফ্রান্সের। ৬ ম্যাচে ১৬ গোল ছিল এমবাপেদের। কিন্তু লুইস ডি লা ফুয়েন্তের চালে বোতলবন্দি এমবাপে। আটকে যায় ফ্রান্স। ফরাসিদের খেলা তৈরি করার জায়গা দেয়নি স্পেন। প্রথম অশনি সঙ্কেত পাওয়া গিয়েছিল প্যারাগুয়ে ম্যাচে। একই স্ট্রাটেজি অবলম্বন করে আটকে দিয়েছিল দেশঁর দলকে। শেষমেশ পেনাল্টি থেকে গোল করেন এমবাপে। এদিনও একই চালে আটকে যায় ফ্রান্স। 

ম্যাচের শুরু থেকেই পজেশনাল ফুটবল খেলার চেষ্টা করে স্পেন। টিপিক্যাল স্প্যানিশ ফুটবল। বলের দখল রেখে ছোট ছোট পাসে ভরা ফুটবল। তবে শুরুতে পজিটিভ আক্রমণে উঠতে পারেনি। অন্যদিকে বল পেলেই দ্রুত আক্রমণে ওঠার চেষ্টা করে ফ্রান্স। ম্যাচের প্রথম পজিটিভ সুযোগ পায় ফ্রান্স। তিনজন ডিফেন্ডারকে ঘাড়ে নিয়ে বক্সের মধ্যে ঢুকে পড়েন ডেম্বেলে। কিন্তু গোলমুখে খুলতে পারেননি। ম্যাচের ২২ মিনিটে এগিয়ে যায় স্পেন। পেনাল্টি থেকে গোল করেন ওয়ারজাবাল। কুকুরেয়ার পাস ক্লিয়ার করার চেষ্টা করেন ডিগনে। ফরাসি ডিফেন্ডার দেখেনইনি পেছন থেকে ছুটে আসছেন ইয়ামাল। বলের বদলে ডিগনের পা সরাসরি লাগে স্প্যানিশ তারকার গায়ে। বক্সের মধ্যে পরে যান ইয়ামাল। পেনাল্টি দিতে দ্বিধা করেননি রেফারি। ফ্রান্সের ফুটবলারদের প্রতিবাদে ভার নেওয়া হয়। কিন্তু সিদ্ধান্ত বদলায়নি। 

এদিন মাঝমাঠ স্পেনের দখলে ছিল। পুরোপুরি ব্যাকফুটে ফ্রান্স। শেষ ২০ মিনিট বাদ দিলে, ম্যাচের বাকি সময়টা স্পেনের। মাঝমাঠ, রক্ষণ, সবদিক থেকে টেক্কা দেয় লা রোজারা। ফ্রান্সের হয়ে মূলত খেলা তৈরি করেন ওলিসে। কিন্তু এদিন পুরোপুরি ফিকে। তেমনই ডেম্বেলে। অদ্ভুতভাবে গোটা ফ্রান্স দলই ছন্দহীন। স্পেন বিশ্বকাপের শুরু থেকেই এই ফুটবল খেলছে। রক্ষণ সংগঠন অনবদ্য। চেনা প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে আরও ভাল হোমওয়ার্ক করে নামা উচিত ছিল ফরাসিদের। নিজের হাতের সমস্ত তাস খেলেও, দলকে ম্যাচে ফেরাতে ব্যর্থ বিদায়ী ফরাসি কোচ।

ম্যাচের ৩৭ মিনিটে ব্যবধান বাড়াতে পারত স্পেন। ডানদিক থেকে ইয়ামাল, অলমোর দুর্দান্ত কম্বিনেশন। তাঁদের পা হয়ে বক্সের মধ্যে বল পেয়েও বাইরে মারেন ফ্যবিয়ান রুইস। সুন্দর ফুটবলের দৃষ্টান্ত। ম্যাচের ৪১ মিনিটে সেরা সুযোগ ফ্রান্সের। কিন্তু রাবিওর পাস থেকে এমবাপে বল পাওয়া আগেই বক্স থেকে বেরিয়ে বল বিপদমুক্ত করেন স্পেনের গোলকিপার সাইমন। মনে করান ম্যানুয়েল নয়ারকে। দ্বিতীয়ার্ধে রাবিওর জায়গায় নামান মানু কোনেকে। নামেন ডুয়েও। কিন্তু ভাগ্য বদলায়নি। ম্যাচের ৫৮ মিনিটে ২-০। ফাইনাল নিশ্চিত করেন পেড্রি পোরো। ওলমোর থেকে বক্সের মুখে বল পেয়ে ফ্রান্সের গোলকিপার মাইগানকে কাটিয়ে বল গোলে রাখেন। বিশ্বকাপের আগে কোনও আন্তর্জাতিক গোল ছিল না। এখন তাঁর নামের পাশে দু'গোল। স্পেন অনায়াসে জিতলেও, সেই অর্থে এমবাপে বনাম ইয়ামাল দ্বৈরথ চোখে পড়ল না। ওয়ার্কলোড নিয়ে খেললেও, এদিনও গোল পাননি। ম্যাচের ৬১ মিনিটে অফসাইডের জন্য ইয়ামালের গোল বাতিল হয়ে যায়। ম্যাচের শেষ ২০ মিনিট প্রেস করে ফ্রান্স। স্প্যানিশ রক্ষণকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেয়। কিন্তু স্কোরশিট বদলায়নি।