আজকাল ওয়েবডেস্ক: ক্রিকেট অভিধানে একটি প্রবাদ আছে, 'ক্যাচেজ উইন ম্যাচেজ'। বৃহস্পতি রাতে দুটো ক্যাচ পার্থক্য গড়ে দিল। এক, হ্যারি ব্রুকের ক্যাচ মিস। দ্বিতীয়, বাউন্ডারি লাইনে অক্ষর প্যাটেলের দুরন্ত ক্যাচ। এই দুটো মুহূর্ত ছাড়া দুই দলের মধ্যে বিশেষ পার্থক্য নেই। পাটা উইকেটে অত্যধিক রান দেয় দুই দলের বোলাররা। খেলার গতি প্রকৃতি দেখে মনে হয়েছিল, ম্যাচের তৃতীয় ওভারেই ইংরেজদের ভাগ্য লিখন হয়ে গিয়েছে। ২.২ ওভারে জোফ্রা আর্চারের বলে সঞ্জু স্যামসনের সহজতম ক্যাচ ফেলেন হ্যারি ব্রুক। ১৫ রানে ছিলেন ভারতীয় ওপেনার। সেই মুহূর্তেই যেন মুম্বই থেকে লন্ডনে ফেরার টিকিট কেটে ফেলেন জস বাটলাররা। আরব সাগরে ইংল্যান্ডের ভরাডুবির অপেক্ষা ছিল। কিন্তু থ্রি লায়ন্সদের শেষ বল পর্যন্ত লড়াইয়ে রেখে দেন জেকব বেথেল। ইনিংস ব্রেকে মনে হয়েছিল অনায়াসেই জিতবে ভারত। কিন্তু দুর্দান্ত লড়াই ইংল্যান্ডের। থুড়ি বেথেলের। মাত্র ৪৫ বলে শতরান। ইংল্যান্ডের হয়ে তৃতীয় দ্রুততম। শেষ ২ ওভারে প্রয়োজন ছিল ৩৯ রান। কিন্তু ১৯তম ওভারে পার্থক্য গড়ে দেন হার্দিক। শেষ ওভারে রান নিতে গিয়ে ৪৮ বলে ১০৫ রানে রান আউট হন বেথেল। শেষ ইংল্যান্ডের জয়ের স্বপ্ন। ৭ রান জিতল ভারত।
সেমিফাইনালের খলনায়ক হ্যারি ব্রুক। ক্যাচ ফেলার পর জঘন্য অধিনায়কত্ব। ব্যাট হাতে প্রায়শ্চিত্ত করতে পারতেন। কিন্তু মাত্র ৭ রানে ফেরেন ইংল্যান্ডের নেতা। ক্যাচ ফস্কানোর পরে আরও ৭৪ রান যোগ করেন সঞ্জু। ৪২ বলে নিঃস্বার্থ ৮৯ রানের ইনিংস। দুর্বল বোলিং সত্ত্বেও শেষপর্যন্ত ফাইনালের ছাড়পত্র সংগ্রহ করল টিম ইন্ডিয়া। প্রথমে ব্যাট করে ৭ উইকেটের বিনিময়ে ২৫৩ রান তোলে ভারত। টি-২০ বিশ্বকাপের মঞ্চে সর্বোচ্চ রান। জবাবে ২০ ওভারে ৭ উইকেট হারিয়ে ২৪৬ রানে শেষ ইংল্যান্ডের ইনিংস।
খাতায়-কলমে সেরা ব্যাটিং লাইন আপ ভারতের। কিন্তু গোটা টুর্নামেন্টে ম্যাচ প্রতি একজন বা দু'জন ব্যাটার রান পাচ্ছিল। তারমধ্যে সুপার এইটের প্রথম ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে ব্যাটিং ভরাডুবি। কিন্তু ওস্তাদের মার শেষ রাতে। চলতি বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেরা ব্যাটিং ভারতের। অভিষেক শর্মা এবং সূর্যকুমার যাদব ছাড়া বাকি ব্যাটাররা রান পায়। এই ভারতীয় দলের একাধিক ব্যাটার মুম্বই ইন্ডিয়ান্সের সদস্য। বা কখনও খেলেছেন। ওয়াংখেড়ের চেনা উইকেটে বিপক্ষের বোলারদের পিটিয়ে ছাতু করেন সঞ্জু স্যামসন, ঈশান কিষাণ, শিবম দুবে, হার্দিক পাণ্ডিয়ারা। জঘন্য বোলিং এবং ফিল্ডিং ইংল্যান্ডের। হাইভোল্টেজ ম্যাচে সঞ্জুর ক্যাচ ফেলার পর চাপে পড়ে ভুলভাল সিদ্ধান্ত নেন ব্রুক। স্পিনারদের সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারেননি। শেষ ওভারে উইল জ্যাকসকে বল দেওয়া বড় ভুল। তারওপর জোফ্রা আর্চারের জঘন্য বোলিং। পাওয়ার প্লেতে স্যামসনকে একাধিক শর্ট বল দেন। তবে সঞ্জুর পারফরম্যান্সকে কখনই খাটো করা যাবে না। ইডেনে যেখানে শেষ করেছিলেন, ওয়াংখেড়েতে ঠিক সেখান থেকেই শুরু করেন ভারতীয় ওপেনার। সেদিন ছিল নিখুঁত ইনিংস। এদিন একটি ভুল ছাড়া বাকিটা দর্শনীয়।
টসে জিতে ভারতকে ব্যাট করতে পাঠায় ইংল্যান্ড। বড় ম্যাচে এটা কতটা সঠিক সিদ্ধান্ত সেই নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। প্রথম ওভারে ১২ রান। আর্চারের বলে পরপর চার এবং ছয় মারেন সঞ্জু। অভিষেক শর্মার দুর্বলতার ফায়দা তুলতে দ্বিতীয় ওভারেই উইল জ্যাকসকে আনেন ব্রুক। সুপারহিট স্ট্র্যাটেজি। প্রথম বলে চার মেরে জ্যাকসকে আহ্বান জানান। পঞ্চম বলে আবার চার। কিন্তু শেষপর্যন্ত ইংল্যান্ডের বোলারের ফাঁদে পা দেন অভিষেক। আবার অফস্পিনের কাছে আত্মসমর্পণ। আরও একটি ব্যর্থতা। ৭ বলে ৯ রান করে আউট হন। ২.২ ওভারে সঞ্জুর ক্যাচ ফেলেন হ্যারি ব্রুক। আর্চারের বলে মিড অনে ক্যাচ দেন। কিন্তু ফস্কান ইংল্যান্ডের অধিনায়ক। এটাই ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট। পাওয়ার প্লের শেষে ১ উইকেট হারিয়ে ভারতের রান ছিল ৬৭।
২৬ বলে অর্ধশতরানে পৌঁছে যান সঞ্জু। ইনিংসে ছিল ৩টি ছয়, ৭টি চার। নবম ওভারে একশো রানের গণ্ডি পার করে ভারত। মারকুটে ইনিংস ঈশান কিষাণ এবং শিবম দুবের। দ্বিতীয় উইকেটে ৯৭ রান যোগ করেন সঞ্জু এবং ঈশান। ১৮ বলে ৩৯ রানের ঝোড়ো ইনিংস খেলে আউট হন বাঁ হাতি উইকেটকিপার ব্যাটার। ২৫ বলে ৪৩ করে রান আউট হন দুবে। কম বলে গুরুত্বপূর্ণ রান যোগ করেন হার্দিক পাণ্ডিয়া (২৭) এবং তিলক বর্মা (২১)। ১৭তম ওভারে ২০০ রানের গণ্ডি পার করে ভারত। ১৪ রানে হার্দিকের ক্যাচ ফেলেন টম ব্যান্টন। আর্চারের শেষ ওভারে তিলকের ছক্কার হ্যাটট্রিক। মাঠের চারদিকে। শেষপর্যন্ত বিধ্বংসী ব্যাটিংয়ে আড়াইশো রানের গণ্ডি পার করে ভারত।
১০ বছর আগে ২০১৬ বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে ২২৯ রান তাড়া করে জিতেছিল ইংল্যান্ড। কিন্তু এইসব জয় একবারই আসে। আড়াইশো রানের বেশি তাড়া করে জেতা এককথায় অসম্ভব। তবে দুর্দান্ত লড়াই ব্রিটিশদের। বিশেষ করে জেকব বেথেলের। একাই বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। কিন্তু অন্যদিকে পরপর উইকেট হারাতে থাকে ইংল্যান্ড। ২৫৩ রান তাড়া করতে নেমে ঝড়ের গতিতে শুরু করা ছাড়া উপায় ছিল না ব্রেন্ডন ম্যাকালামের দলের কাছে। ওয়াংখেড়ের পিচ মূলত ব্যাটিং সহায়ক। বোলাররা খুব বেশি সাহায্য পায় না। কিন্তু তাসত্ত্বেও ভারতীয় বোলারদের পারফরম্যান্স ফাইনালের আগে কপালে ভাঁজ ফেলবে গৌতম গম্ভীরের। বিশেষ করে স্পিনারদের পারফরম্যান্স। জস বাটলারের গুরুত্বপূর্ণ উইকেট তুলে নিলেও ৪ ওভারে ৬৪ রান দেন বরুণ চক্রবর্তী। রান তাড়া করতে নেমে শুরুতেই ফেরেন ফিল সল্ট (৫)। ব্যর্থ হ্যারি ব্রুকও (৭)। শুরুটা ভাল করেন জস বাটলার। কিন্তু বেশিক্ষণ টিকে থাকতে পারেননি। ১৭ বলে ২৫ রান করে বরুণের বলে বোল্ড হন। চার নম্বরে নেমে একাই ইংল্যান্ডকে লড়াইয়ে রাখেন বেথেল। তাঁকে কিছুটা সঙ্গ দেওয়ার চেষ্টা করেন উইল জ্যাকস। কিন্তু বাউন্ডারি লাইনে দুর্ধর্ষ ক্যাচ নিয়ে ছন্দে থাকা ইংলিশ ক্রিকেটারকে ফেরত পাঠান অক্ষর প্যাটেল। ২০ বলে ৩৫ রান করে আউট হন জ্যাকস। নিয়মিত উইকেট হারালেও রানরেট ঠিক রাখে ইংল্যান্ডের ব্যাটাররা। ৮ ওভারে একশো রান পার করে ইংল্যান্ড। ১০ ওভারের শেষে ৪ উইকেট হারিয়ে ইংল্যান্ডের রান ছিল ১১৯। শেষ দুই ওভারে ৩৯ রান প্রয়োজন ছিল। দুর্দান্ত ১৯তম ওভার হার্দিকের। চাপের মধ্যে মাত্র ৯ রান দিয়ে ১ উইকেট তুলে নেন। এটাই পার্থক্য গড়ে দিল।
