স্পেন -১ আর্জেন্টিনা-০
(তোরেস)
আজকাল ওয়েবডেস্ক: ২০২২-এর সেই রূপকথার পুনরাবৃত্তি আর হল না নিউ ইয়র্কে। উলটে মেটলাইফ আর্জেন্টিনার কাছে অভিশপ্ত হয়ে রইল। মেসির কাছেও মেটলাইফ স্টেডিয়াম বিষণ্ণ স্মৃতি হয়েই থেকে গেল।
১২০ মিনিটের লড়াইয়ের শেষে আর্জেন্টিনাকে ০-১ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হল স্পেন। টানা দু'বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর হওয়া হল না লিওনেল মেসির।
এক্সট্রা টাইমে ফেরান তোরেস গোল করে মেসির স্বপ্ন ভেঙে দিলেন। সেই গোল আর শোধ করতে পারল না আর্জেন্টিনা। অথচ মেসি এবং তাঁর আর্জেন্টিনা এই বিশ্বকাপের নক আউটে অবিশ্বাস্য সব প্রত্যাবর্তনের কাহিনি লিখেছে। কিন্তু ফাইনালে আর সেই রূপকথা লেখা হল না।
দে লা ফুয়েন্তের এই স্পেন আর্জেন্টিনার উপরে গোটা ম্যাচ জুড়ে প্রাধান্য বজায় রেখে চ্যাম্পিয়ন হল। মেসি নিষ্প্রভ। কোথায় হারিয়ে গেল তাঁর সেই পাস, ড্রিবলিং। স্প্যানিশ আর্মাডাদের বিরুদ্ধে একমাত্র উজ্জ্বল দেখাল আর্জেন্টিনার গোলকিপার এমিলিয়ানো মার্টিনেজকে। একাধিকবার তিনি বিপদের হাত থেকে দলকে বাঁচালেন। কিন্তু শেষরক্ষা আর হল না।
মেটলাইফ দশ জনের আর্জেন্টিনার কাছে ধরা দিল ওয়াটারলু হয়ে। দশ বছর আগেও তো এই স্টেডিয়াম থেকে কাঁদতে কাঁদতে মাঠ ছেড়েছিলেন মেসি। পেনাল্টি মিস করেছিলেন। সবুজ ঘাসের উপর বসে থাকা এক বিধ্বস্ত মানুষ লিওনেল মেসি। যে মানুষটিকে পৃথিবী দেবতা বানিয়েছিল, সেই মানুষটিকেই সেদিন দাঁড় করানো হয়েছিল কাঠগড়ায়। ফুটবল বড় নিষ্ঠুর খেলা। এক মুহূর্তেই কেউ নায়ক আবার কেউ খলনায়ক। সেই রাতেই তিনি বলে দিয়েছিলেন, ফুটবল তোমায় দিলাম আজকে ছুটি।
১০ বছর পরে সেই মেটলাইফ স্টেডিয়ামে মেসি হাসতে পারতেন। কিন্তু তা আর হল কোথায়! ২০১০ সালের পরে স্পেন আবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। ১২০ মিনিটের লড়াইয়ের শেষে বিষণ্ণ মেসি সবুজ ঘাসে একাকী বসে। আর্জেন্টিনার বাকি প্লেয়ারদের চোখে শূন্যতা। লিওনেল স্কালোনিও হতাশা গোপন করতে পারছেন না। তাঁর রণতরী ডুবে গেল স্প্যানিশ আর্মাডাদের দাপটে।
১৯৯০ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে জার্মানির কাছে পরাজয়ের পর মারাদোনার চোখের জল আজও ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে মানবিক ছবিগুলোর একটি। টানা দু'বার বিশ্বজয় করতে পারেননি মারাদোনা। মেসিও পারলেন না।
আর্জেন্টাইন কোচ লিওনেল স্কালোনির গুরু লুইস দে লা ফুয়েন্তে। এদিন গুরুর কাছে হার মানলেন শিষ্য। শুরু থেকেই স্পেন খেলল পরিচিত ছন্দে। পাস, গতি আর নিয়ন্ত্রিত ফুটবল। লামিন ইয়ামাল, ওয়ারজাবালদের আক্রমণে বারবার কেঁপে উঠল আর্জেন্টিনার রক্ষণ। অন্যদিকে মেসিকে ঘিরে থাকা নীল-সাদা স্বপ্ন যেন খুঁজে পেল না তার স্বাভাবিক সুর। দেখা গেল না স্বাভাবিক রং। স্প্যানিশ কৌশলের জালে বন্দি হয়ে রইলেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।
স্কালোনি কৌশল বদলালেন। খেলোয়াড় পরিবর্তন করলেন। কিন্তু স্পেনের সামনে আর্জেন্টিনাকে সেই গুটিয়ে থাকতেই দেখা গিয়েছে। বলের নিয়ন্ত্রণ, আক্রমণের ধার, সব দিক থেকেই এগিয়ে ছিল ইউরো চ্যাম্পিয়নরা। তার উপরে নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে এনজো ফার্নান্দেজ লাল কার্ড দেখে বসলেন। দশ জনে নেমে যায় নীল-সাদা জার্সিধারীরা। এক্সট্রা টাইমে এগারোর বিরুদ্ধে দশের অসম লড়াই হল। হেরে গেল আর্জেন্টিনা। যে দলটি এতদিন অসম্ভবকে সম্ভব করার গল্প লিখেছিল, সেই দলই মেটলাইফে থমকে গেল। ফুটবল কখনও কখনও এমনই।
২০২২-এর কাতার থেকে ২০২৬-এর নিউ ইয়র্ক, এই যাত্রাপথে মেসি পেয়েছেন গৌরব, পেয়েছেন ভালবাসা, কিন্তু পেলেন না সেই বিরল কীর্তি।
স্পেন এই শিরোপার একেবারে যোগ্য দাবিদার। ফাইনালের ১২০ মিনিটের লড়াই দিয়ে তাদের বিচার করলে ভুল হবে। পুরো টুর্নামেন্ট জুড়েই তারা দেখিয়েছে ধারাবাহিকতা, আত্মবিশ্বাস এবং আধিপত্যের এক অনন্য মিশেল। বল দখল, আক্রমণের বৈচিত্র্য, কৌশলের নিখুঁত প্রয়োগ, প্রতিটি ক্ষেত্রেই স্পেন বাকিদের থেকে অনেক এগিয়েছিল।
ফাইনালেও সেই পরিচিত ছন্দেরই প্রতিফলন দেখা গিয়েছে। চাপের মুহূর্তে মাথা ঠান্ডা রাখা, সুযোগ তৈরি করা এবং শেষ পর্যন্ত জয় ছিনিয়ে নেওয়ার মানসিকতা দেখিয়ে চ্যাম্পিয়ন স্পেন। নতুন প্রজন্মের এই স্পেন শুধু বিশ্বজয় করল না, নিজেদের ফুটবল দর্শন ও দক্ষতার এক উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখে গেল বিশ্বমঞ্চে।















