বড়পর্দায় একের পর এক ঐতিহাসিক দৃশ্য, রাজকীয় ক্যানভাস আর উত্তাল সমুদ্রের বুকে মহাকাব্যিক অভিযান। ক্রিস্টোফার নোলানের নতুন ছবি 'দ্য ওডিসি' ঘিরে এখন গোটা বিশ্ব মাতোয়ারা। মুক্তির প্রথম সপ্তাহেই ৩০০ মিলিয়ন ডলারের গণ্ডি পার করে শতকোটি আয়ের রেকর্ড ভাঙার মুখে এই হলিউডি মেগা প্রজেক্ট। কিন্তু এই মহা ধুমধামের আলোর নিচেই যেন জমে উঠেছে ঘোর অন্ধকার।
হলিউডের এই বিলিয়ন ডলারের আড়ম্বরের পেছনেই উঠে এসেছে এক চরম উদাসীনতার কাহিনি —এক ঐতিহাসিক যুদ্ধজাহাজ ব্যবহার করে তা ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়া এবং প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও নামমাত্র মেরামতি খরচ মেটাতে অস্বীকার করার গুরুতর অভিযোগ!

ঘটনাটা ঠিক কী? হোমারের মহাকাব্যকে পর্দায় রূপ দিতে কোনো খামতি রাখেননি নোলান। ছবির দৃশ্যপট জীবন্ত করতে সুইডেনের অলাভজনক ঐতিহাসিক সংস্থা 'ভাইকিং আলেডেন' (Vikingaleden) থেকে ভাড়া নেওয়া হয়েছিল তাদের ঐতিহ্যবাহী ভাইকিং যুদ্ধজাহাজের নিখুঁত প্রতিলিপি—'গ্ল্যাড অ্যাভ গিলবার্গ'। প্রায় তিন দশক ধরে উত্তর সাগর আর বাল্টিক সাগরে সগর্বে ভেসে চলা এই ১৮ মিটারের জলযানটির স্থান হয়েছিল হলিউডের এই বিগ-বাজেট প্রজেক্টে।
কিন্তু শুটিং শেষে যখন জাহাজটি ফেরত আসে, তখন তার মাস্তুল ও খোলসে স্পষ্ট ক্ষতির দাগ। ক্ষয়ক্ষতি দেখে মাথা হাত পড়ে সংস্থার কর্মকর্তাদের।
সংস্থার সভাপতি পিটার ওলাউসন আক্ষেপের সঙ্গে জানান, চুক্তি ছিল শুটিং চলাকালীন জাহাজের কোনও ক্ষতি হলে তার মেরামতির অর্থ জোগাবে প্রযোজনা সংস্থাই। সেই মতো স্বেচ্ছাসেবকরা নিজেরা শ্রম দিয়ে নিখরচায় জাহাজটি সারিয়ে তোলেন এবং কেবল ব্যবহৃত উপাদানের জন্য মাত্র ৬,০০০ ডলারের (প্রায় ৫ লাখ টাকা) একটি ইনভয়েস পাঠান ইউনিভার্সাল পিকচার্সের কাছে। "আমরা তো কোনও শ্রমের মজুরি চাইনি, কেবল জিনিসপত্রের দামটাই চেয়েছিলাম। যে ছবি শত শত কোটি টাকা আয় করছে, তার জন্য ৬,০০০ ডলার তো সামান্য কফির খরচের সমান! এক বছর পেরিয়ে গেলেও টাকা এল না। নিজেদের ভীষণ অপমানিত আর উপেক্ষিত মনে হচ্ছে।" — আক্ষেপ ঝরে পড়ে পিটার ওলাউসনের কণ্ঠে।
ছবির বিশাল সাফল্যের মাঝে এই অভিযোগ সামনে আসতেই শুরু হয় জোর তোলপাড়। তবে সমস্ত দায় ঝেড়ে ফেলেছে প্রযোজনা সংস্থা ইউনিভার্সাল পিকচার্স। এক বিবৃতিতে তাদের মুখপাত্র দাবি করেন, "আমাদের নথিপত্র অনুযায়ী 'গ্ল্যাড অ্যাভ গিলবার্গ' সংক্রান্ত যাবতীয় বিল এবং মেরামতের অর্থ বহু আগেই পুরোটাই মিটিয়ে দেওয়া হয়েছে। কোনও ভুল বোঝাবুঝি থাকলে তা মেটাতে ওই সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে।"
ম্যাট ডেমন, টম হল্যান্ড, অ্যান হ্যাথাওয়ে আর জেনডায়ার মতো তারকায় ঠাসা ২৫০ মিলিয়ন ডলার বাজেটের ছবি যখন বিশ্বজুড়ে সিনেমা হলগুলোতে আয়ের নতুন ইতিহাস লিখছে, ঠিক তখনই এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কয়েক হাজার ডলার বকেয়া রাখা নিয়ে এই টালবাহানা সহজভাবে নিতে পারছেন না সিনেপ্রেমীরা। নোলানের মহাকাব্যিক সৃষ্টি কি পারবে এই আইনি ও নৈতিক বিতর্কের দাগ ধুয়ে মুছে শেষ পর্যন্ত কেবল সাফল্যের আলোতেই ভাসতে? উত্তর দেবে সময়।
















