শ্মশানে 'তারারাত্রি', সাধক থেকে ভক্ত, কেন তারাপীঠেই এত ভিড় হয়? 'কৌশিকী' নামে লুকিয়ে কোন ঐশ্বরিক মাহাত্ম্য?
নিজস্ব সংবাদদাতা
৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২০ : ২২
শেয়ার করুন
1
16
বীরভূমের তারাপীঠ। শ্মশান, সাধনা আর মা তারার আরাধনার জন্য বহু শতাব্দী ধরে পরিচিত এই শক্তিক্ষেত্র। তবে বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় কৌশিকী অমাবস্যায় তারাপীঠের মাহাত্ম্য যেন আরও গভীর হয়ে ওঠে।
2
16
এই বিশেষ তিথিতে দেশের নানা প্রান্ত থেকে হাজার হাজার ভক্ত ছুটে আসেন মা তারার দর্শন ও পুজো দিতে। বিশ্বাস, এই রাতে মায়ের আরাধনা করলে জীবনের অন্ধকার কেটে যায়, মনস্কামনা পূর্ণ হয় এবং আধ্যাত্মিক সাধনায় বিশেষ ফল লাভ করা যায়।
3
16
‘কৌশিকী অমাবস্যা’ নামটি শুনলেই প্রথমেই মনে আসে দেবী কৌশিকীর কথা। কিন্তু কেন এই দেবীর নাম কৌশিকী? এর নেপথ্যে রয়েছে এক পৌরাণিক কাহিনি।পুরাণের কাহিনি অনুযায়ী, শুম্ভ ও নিশুম্ভ নামে দুই অসুর তপস্যা করে ব্রহ্মার কাছ থেকে এমন এক বর লাভ করেছিল, যার ফলে তাদের বধ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে।
4
16
কোনও মাতৃগর্ভ থেকে জন্ম নেওয়া নারী তাদের হত্যা করতে পারবেন না। এমনই ছিল সেই বর। ফলে সাধারণ কোনও নারীর পক্ষে এই দুই অসুরকে বধ করা সম্ভব ছিল না। এদিকে সেই সময়ে দেবী পার্বতীর গায়ের বর্ণ ছিল কিছুটা শ্যামবর্ণ।
5
16
স্নেহ ও ভালোবাসা থেকেই মহাদেব তাঁকে ‘কালিকা’ নামে ডাকতেন। কিন্তু একদিন সকলের সামনে সেই নামে ডাকায় দেবীর মনে গভীর অভিমান তৈরি হয়। এরপর তিনি মানস সরোবরের ধারে গিয়ে কঠোর তপস্যায় বসেন।
6
16
দীর্ঘ তপস্যার পর মানস সরোবরের জলে স্নান করার সময় পার্বতীর শরীর থেকে কালো আবরণ বা কোশ ঝরে পড়ে। সেই কালো কোশ আলাদা হয়ে জন্ম নেয় এক নতুন দেবী। শরীরের কোশ থেকে আবির্ভূত হয়েছিলেন বলেই তাঁর নাম হয় ‘কৌশিকী’।
7
16
অন্যদিকে, পার্বতীর শরীরের কালো আবরণ সরে যাওয়ার পর তাঁর রূপ হয়ে ওঠে আরও উজ্জ্বল, পূর্ণিমার চাঁদের মতো শুভ্র ও সুন্দর। এই দেবী কৌশিকীই পরবর্তীতে শুম্ভ ও নিশুম্ভের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন।
8
16
ভাদ্র মাসের এই বিশেষ তিথিতে দুই অসুরকে বধ করে দেবতাদের রক্ষা করেন তিনি। বাংলার অন্যতম শক্তিপীঠ তারাপীঠেও এই তিথিকে ঘিরে রয়েছে বিশেষ ধর্মীয় বিশ্বাস। তন্ত্রসাধনার মতে, কৌশিকী অমাবস্যার রাতকে বলা হয় ‘তারা রাত্রি’।
9
16
প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, এই রাতে ভালো এবং মন্দ—উভয় শক্তির প্রভাবের পথই উন্মুক্ত থাকে। তাই তন্ত্রসাধকদের কাছে এই রাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়।কথিত আছে, কৌশিকী অমাবস্যার দিন তারাপীঠের শ্মশানে সাধনা করে সিদ্ধিলাভ করেছিলেন সাধক বামাক্ষ্যাপা। সাধনার মধ্যেই তিনি মা তারার দর্শন পেয়েছিলেন বলেও প্রচলিত বিশ্বাস রয়েছে।এই কারণেই প্রতি বছর কৌশিকী অমাবস্যায় তারাপীঠে বিশেষ আয়োজন করা হয়।
10
16
কৌশিকী অমাবস্যা সাধারণত তন্ত্রসাধনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়। তারাপীঠ শুধু একটি মন্দির নয়, শক্তিসাধনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত। এখানে অধিষ্ঠাত্রী দেবী মা তারা। তন্ত্রসাধনার ক্ষেত্রে দেবী তারার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। তারাপীঠের মহাশ্মশানকে ঘিরে বহু সাধনা ও সাধকের কাহিনি প্রচলিত। বিশেষ করে সাধক বামাক্ষ্যাপার নাম তারাপীঠের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে।
11
16
প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, বামাক্ষ্যাপা মা তারার একনিষ্ঠ সাধক ছিলেন। তাঁর সাধনা ও মাতৃভক্তির নানা কাহিনি আজও ভক্তদের মধ্যে প্রচলিত। ফলে কৌশিকী অমাবস্যার মতো তন্ত্রসাধনার গুরুত্বপূর্ণ তিথিতে তারাপীঠে ভক্তসমাগমের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে।
12
16
ভক্তদের বিশ্বাস, কৌশিকী অমাবস্যায় মা তারার পুজো করলে বাধা-বিপত্তি দূর হয়, সংসারে শান্তি আসে এবং মায়ের আশীর্বাদে জীবনের কঠিন সময় কাটিয়ে ওঠার শক্তি পাওয়া যায়। অনেকেই মানত পূরণ করতে, আবার কেউ বিশেষ পুজো বা প্রার্থনা করতে এই দিনে তারাপীঠে আসেন।
13
16
অন্যদিকে সাধকদের কাছে এই রাতের গুরুত্ব আরও গভীর। অমাবস্যার অন্ধকারকে এখানে বাইরের অন্ধকারের পাশাপাশি মানুষের অন্তরের অজ্ঞতা ও অশান্তির প্রতীক হিসেবেও দেখা হয়। দেবী তারার আরাধনা সেই অন্ধকারের মধ্যে জ্ঞান, শক্তি ও পথ দেখানোর প্রতীক।
14
16
শ্মশানেই কেন সাধনা করা হয়?তন্ত্রসাধনায় শ্মশানকে অনিত্যতা ও জীবনের চূড়ান্ত সত্য উপলব্ধির স্থান হিসেবে দেখা হয়। জন্ম-মৃত্যুর সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে আত্মজ্ঞান লাভের সাধনায় তাই শ্মশানের বিশেষ প্রতীকী গুরুত্ব রয়েছে।
15
16
কৌশিকী অমাবস্যায় তারাপীঠের এই শ্মশান ও মন্দির চত্বর হয়ে ওঠে ভক্তি, সাধনা ও বিশ্বাসের এক অনন্য মিলনক্ষেত্র। তাই কৌশিকী অমাবস্যায় তারাপীঠে ভিড় শুধু একটি ধর্মীয় উৎসবের ছবি নয়। এটি বিশ্বাস, শক্তিসাধনা, ভক্তি এবং আত্মিক আশ্রয়ের এক গভীর সাংস্কৃতিক প্রকাশ।
16
16
মা তারাকে সাজানো হয় বিশেষ রাজবেশে। ভক্তদের ভিড়ে মুখর হয়ে ওঠে মন্দির চত্বর। রাতভর চলে পুজো, আরাধনা ও নানা ধর্মীয় আচার। তাই কৌশিকী অমাবস্যা শুধু একটি তিথি নয়, তারাপীঠের সাধনা ও আধ্যাত্মিক পরম্পরার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা এক বিশেষ রাত।