আজকাল ওয়েবডেস্ক: ফুটবলের মঞ্চে কিছু গল্প যেন নিজে থেকেই তৈরি হয়ে যায়। বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনা ও স্পেনের মুখোমুখি লড়াইও তেমনই এক নাটকীয় অধ্যায়। একদিকে ৩৯ বছর বয়সী লিওনেল মেসি। সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপ অভিযানে আর মাত্র একটি জয় দূরে এক অনন্য বিদায় থেকে। অন্যদিকে ২০ বছরের ছোট লামিন ইয়ামাল, যাঁর মধ্যে ভবিষ্যৎ ফুটবলের প্রতিচ্ছবি দেখছে বিশ্ব।
তবে মেসি-ইয়ামালের প্রজন্মের লড়াইয়ের চেয়েও আকর্ষণীয় এক দ্বৈরথ অপেক্ষা করছে মাঠের বাইরে। নিউ জার্সিতে রবিবারের ফাইনালে মুখোমুখি হবেন আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি ও স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে। সম্পর্কের দিক থেকে এই লড়াই শুধুই প্রতিপক্ষ দুই কোচের নয়। এটি এক গুরু ও তাঁর প্রাক্তন ছাত্রেরও পরীক্ষা।
দু'জনের সম্পর্কের শুরু ২০১৭ সালে। খেলোয়াড় হিসেবে অবসর নেওয়ার পর স্কালোনি স্পেনের ফুটবল ফেডারেশনের আয়োজিত উয়েফা প্রো লাইসেন্স কোর্সে ভর্তি হন। সেই সময়ে স্পেনের বয়সভিত্তিক দলের সঙ্গে কাজ করা দে লা ফুয়েন্তে ছিলেন তাঁর অন্যতম শিক্ষক। কোচিংয়ের প্রথম পাঠে যাঁর কাছ থেকে শেখা, সেই শিক্ষকের বিরুদ্ধেই এবার বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় মঞ্চে দাঁড়াতে হবে স্কালোনিকে।
তখন হয়তো কেউ ভাবেননি, দল গঠন ও ফুটবল কৌশল নিয়ে সেই ক্লাসের আলোচনা একদিন বিশ্বকাপ ফাইনালের মতো চাপের মুহূর্তে ফিরে আসবে। স্কালোনি বহুবার স্বীকার করেছেন, কোচ হিসেবে তাঁর শুরুর সময়ে দে লা ফুয়েন্তের কাছ থেকে পাওয়া সাহায্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আর দে লা ফুয়েন্তেও দেখেছেন, কীভাবে তাঁর সেই ছাত্র এক বিপর্যস্ত আর্জেন্টিনাকে বিশ্বচ্যাম্পিয়নে পরিণত করেছেন।
এই ফাইনাল তাই শুধু দুই দলের লড়াই নয়, এটি দুই ভিন্ন কোচিং দর্শনের লড়াইও।
দে লা ফুয়েন্তে স্পেনের ফুটবল কাঠামোর ধারাবাহিকতার প্রতীক। দীর্ঘদিন তিনি দেশটির বয়সভিত্তিক দলগুলোর সঙ্গে কাজ করেছেন। তাঁর অধীনে স্পেন অনূর্ধ্ব-১৯ ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ (২০১৫) এবং অনূর্ধ্ব-২১ ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ (২০১৯) জিতেছে। বর্তমান দলের অনেক খেলোয়াড়কে তিনি ছোটবেলা থেকেই চেনেন।
অন্যদিকে স্কালোনির উত্থান ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে। আর্জেন্টিনার সিনিয়র দলের দায়িত্ব নেওয়ার আগে তাঁর কোনও বড় দলের প্রধান কোচ হওয়ার অভিজ্ঞতা ছিল না। ২০১৮ বিশ্বকাপের ব্যর্থতার পর তিনি দায়িত্ব পান এমন এক সময়ে, যখন জাতীয় দল ছিল বিভক্ত, মেসিকে ঘিরে ছিল অনিশ্চয়তা।
স্কালোনি সেই সঙ্কটের সমাধান করেছিলেন আস্থা তৈরি করে। তাঁর অধীনে আর্জেন্টিনা জিতেছে ২০২১ কোপা আমেরিকা, ২০২২ বিশ্বকাপ এবং ২০২৪ কোপা আমেরিকা। তিনি শুধু মেসিকে ঘিরে দল তৈরি করেননি বরং এমন একটি দল গড়েছেন, যেখানে মেসি নিজের সেরাটা দিতে পারেন, কিন্তু প্রতিটি সমস্যার সমাধান একা তাঁকে করতে হয় না।
দে লা ফুয়েন্তের চ্যালেঞ্জ আবার সম্পূর্ণ আলাদা। তাঁকে মেসির মতো কিংবদন্তির উত্তরসূরি তৈরি করতে হচ্ছে না বরং ইয়ামালকে অতি প্রত্যাশার চাপ থেকে রক্ষা করতে হচ্ছে।
স্পেন কোচের কথায়, “লামিনকে লামিনই থাকতে হবে। মেসির পুনরাবৃত্তি কখনও সম্ভব নয়।”
এই দর্শনই স্পেনের শক্তি। ইয়ামাল দলের সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রতিভা হলেও পুরো দল তাঁর ওপর নির্ভরশীল নয়। দে লা ফুয়েন্তে তাঁর স্বাধীনতাকে যুক্ত করেছেন রদ্রির মস্তিষ্ক, শক্তিশালী মিডফিল্ড এবং সংগঠিত রক্ষণভাগের সঙ্গে। পুরো টুর্নামেন্টে মাত্র এক গোল হজম করে স্পেন ৩৭ ম্যাচ অপরাজিত থেকে ফাইনালে উঠেছে।
অন্যদিকে আর্জেন্টিনার লক্ষ্য চতুর্থ বিশ্বকাপ শিরোপা। মেসি টুর্নামেন্টে আট গোল ও চারটি অ্যাসিস্ট করেছেন, তবে স্কালোনির দল শুধু তাঁর ওপর নির্ভর করেনি। দলগত দৃঢ়তা, কৌশলগত পরিবর্তন এবং শেষ মুহূর্তে ম্যাচ ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতাই তাদের বড় শক্তি।
ফাইনালে মূল প্রশ্ন হবে,স্পেন কতটা আক্রমণাত্মক হয়ে বল দখলে রাখবে, যাতে আর্জেন্টিনার পাল্টা আক্রমণের সুযোগ না তৈরি হয়। আর স্কালোনি সিদ্ধান্ত নেবেন, স্পেনকে শুরুতেই চাপে ফেলবেন, নাকি রক্ষণকে জমাট রেখে ইয়ামালের জায়গা কমিয়ে দেবেন।
মেসিকে আটকানোর পরিকল্পনাতেও দে লা ফুয়েন্তের পুরোনো অভিজ্ঞতা রয়েছে। ২০০৪ সালে বার্সেলোনার বিরুদ্ধে সেভিয়ার যুব দলের কোচ থাকাকালে তিনি কিশোর মেসিকে ম্যান-মার্ক করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু মেসির মার্কার হলুদ কার্ড দেখার পর মাঠ ছাড়লে আর্জেন্টাইন তারকা চার গোল করেছিলেন। এবার অবশ্য দে লা ফুয়েন্তে জানিয়েছেন, সেই কৌশল তিনি আর ব্যবহার করবেন না।
বিশ্বকাপ ফাইনালের সবচেয়ে বড় গল্প হয়তো মেসি বনাম ইয়ামাল। এক যুগের শেষ আর আরেক যুগের শুরুর প্রতীকী লড়াই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফল নির্ধারণ করবেন শুধু এই দুই তারকা নন।
তাঁদের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকবেন দুই কোচ। একজন সেই ছাত্র, যিনি নিজের পথ তৈরি করে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। আরেকজন সেই শিক্ষক, যিনি দেখবেন তাঁর ছাত্র তাঁকে হারিয়ে দিতে পারেন কি না।
















