আজকাল ওয়েবডেস্ক: গোটা বিশ্বের চোখে বিশ্বকাপ ফাইনাল ছিল দুই প্রজন্মের লড়াই। একদিকে ৩৯ বছরের বৃদ্ধ সিংহ লিওনেল মেসি। অন্যদিকে ১৯ বছরের তরুণ তুর্কি লামিন ইয়ামাল।
কিন্তু এই লড়াই শুধু দুই প্রজন্মের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই ছিল না। এই মঞ্চে অদৃশ্য এক তৃতীয় জনের উপস্থিতিও ছিল। তিনি মাঠে ছিলন না। তবু সর্বত্র বিরাজমান। তিনি দিয়েগো আর্মান্দো মারাদোনা।
মেসির লড়াই শুধু ইয়ামালের সঙ্গে ছিল না। ছিল না স্পেনের সঙ্গেও। লড়াই ছিল সেই দীর্ঘ ছায়ার সঙ্গেও। যে ছায়া তাঁর শৈশব থেকে তাঁকে অনুসরণ করে এসেছে। প্রতিটি গোলের পর, প্রতিটি ব্যর্থতার রাতে, প্রতিটি ট্রফি জয়ের মুহূর্তেও সেই ছায়া তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে থেকেছে।
পৃথিবীর আর কোনও ফুটবলারের জীবনে এমন অভিজ্ঞতা কি ঘটেছে? তাঁকে প্রতিটি ম্যাচে শুধু প্রতিপক্ষের একাদশের বিরুদ্ধে লড়তে হয়নি, লড়তে হয়েছে ইতিহাসের বিরুদ্ধেও। লড়তে হয়েছে এমন এক কিংবদন্তির সঙ্গে, যাঁর নাম ফুটবলের অভিধানে এক আলাদা অধ্যায় হয়ে রয়েছে।
মাঠে কোচরা তাঁর জন্য অসংখ্য কৌশল তৈরি করেছেন। দুই, তিন, কখনও চারজন ফুটবলার দিয়ে তাঁকে ঘিরে রাখার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু হিরের আলো কি কখনও পুরোপুরি ঢেকে রাখা যায়?
বয়স যখন চল্লিশের কাছাকাছি, তখনও তাঁর বাঁ পায়ের জাদুতে যেন সূর্যের আলো ঝরে পড়ে। সেই আলোয় ক্লান্ত পৃথিবী কয়েক মুহূর্তের জন্য শান্তি খুঁজে নেয়।
এমন এক সময়ে আমরা বেঁচে আছি, যখন পৃথিবীর নানা প্রান্তে যুদ্ধের আগুন, বারুদের গন্ধ, রক্তের দাগ আর মানুষের কান্না প্রতিদিনের সংবাদ হয়ে উঠেছে। অথচ সেই অন্ধকারের মধ্যেও মেসির পায়ে বল থাকা কয়েকটি মুহূর্ত আমাদের সমস্ত বিষণ্ণতা ভুলিয়ে দেয়। মনে করিয়ে দেয় সৌন্দর্য এখনও বেঁচে আছে, শিল্প এখনও পরাজিত হয়নি।
যে সরু গলিতে দু’জন মানুষ পাশাপাশি হাঁটাও কঠিন, সেখানেও নিখুঁত পাস পৌঁছে দেওয়ার কল্পনা করতে পারেন তিনি। প্রতিভার সবচেয়ে বড় অভিশাপ হলো তাকে বারবার নিজেকে প্রমাণ করে যেতে হয়। যদিও মেসির আর কিছু প্রমাণ করার বাকি নেই।
মারাদোনার কান্না অনেকেই দেখেছেন। ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে জার্মানির কাছে পরাজয়ের পর তাঁর চোখের জল আজও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম মানবিক মুহূর্ত।
পরপর দু’বার বিশ্বকাপ জিততে পারেননি মারাদোনা। ইতিহাস কাউকেই সম্পূর্ণ হতে দেয় না। মেসিও পারলেন না। সেই সুযোগ তিনি হাতছাড়া করলেন।
মেসি সব পেয়েছেন। ব্যক্তিগত সাফল্য, অসংখ্য ট্রফি, মানুষের ভালবাসা। এমনকি অধরা বিশ্বকাপও একদিন তাঁর হাতে ধরা দিয়েছে। কিন্তু টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বজয়ের স্বপ্নটি আর পূরণ হলো না। এই অপূর্ণতাটুকুই থেকে গেল তাঁর।
মেসির জীবনে অনেক পূর্ণতার মাঝে রয়েছে এই অপূর্ণতা, এই অপ্রাপ্তি। আর সেই কারণেই তাঁকে দেখে মনে হয় তিনি রক্তমাংসের এক মানুষ। তাঁর কথা উঠলে, জনপ্রিয় গানের লাইন মনে পড়ে যেতে বাধ্য,
'সব পেলে নষ্ট জীবন।'















