আজকাল ওয়েবডেস্ক: খেলাধুলার দুনিয়ায় মাঝে মাঝে এমন কিছু কাকতালীয় ঘটনা ঘটে, যা যেকোনো সিনেমার চিত্রনাট্যকেও হার মানায়। আগামী রবিবার অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বহুল প্রতীক্ষিত বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে ঠিক তেমনই এক জাদুকরি সমীকরণ ফুটবলপ্রেমীদের মনে রোমাঞ্চের দোলা দিচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এখন একটি ছবি সব মহলে ঘুরে বেড়াচ্ছে, যা এই ফাইনালকে কেবল দুটি দেশের ট্রফি জয়ের লড়াই নয়, বরং এক অদ্ভুত নিয়তির খেলা হিসেবে হাজির করেছে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে—সবে কুড়ি পেরোনো লম্বা চুলের এক তরুণ লিওনেল মেসি প্লাস্টিকের একটি বাথটাবের পাশে বসে পরম মমতায় হাত দিয়ে জল ছিটিয়ে পাঁচ মাসের এক শিশুকে স্নান করাচ্ছেন। সেদিনের সেই ছোট্ট শিশুই আজকের ফুটবল বিশ্বের নতুন বিস্ময় বালক, লামিন ইয়ামাল।
দিনটি ছিল ২০০৭ সালের কোনো এক সময়। বার্সেলোনা ফাউন্ডেশন ও স্থানীয় সংবাদপত্র ‘স্পোর্ট’-এর উদ্যোগে ইউনিসেফের চ্যারিটি ক্যালেন্ডারের জন্য একটি ফটোশুট হচ্ছিল। বার্সেলোনার কাছেই মাতারো শহরের এক অতি সাধারণ পরিবার লটারির মাধ্যমে এই সুযোগটি পেয়েছিল। ভাগ্যচক্রে সেই পরিবারের ছোট্ট শিশুটিই ছবি তোলার জন্য জুটে যায় লিওনেল মেসির ভাগে। আজ যিনি বিশ্বসেরা এবং তিন সন্তানের বাবা, সেই তরুণ মেসি সেদিন কিন্তু একবারে অনভিজ্ঞ আর লাজুক ছিলেন। হঠাৎ ড্রেসিংরুমে একটি ছোট্ট শিশুকে দেখে বেশ ঘাবড়েই গিয়েছিলেন তিনি। তবে ইয়ামালের মা শেইলার সহযোগিতা এবং ইয়ামালের মিষ্টি হাসির মুখে মেসি দ্রুতই পেশাদারিত্বের সাথে পরিস্থিতি সামলে নেন। সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি ফ্রেমবন্দি করেছিলেন আলোকচিত্রী জোয়ান মনফোর্ত। ২০২৪ সালে যখন ইয়ামালের বাবা মুনির নাসারউ ছবিটি প্রথম সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করেন, তখন খোদ মনফোর্ত নিজেও তাজ্জব বনে যান। তাঁর ভাষায়, এই গল্প যদি কোনও সিনেমায় লেখা হতো, তবে লোকে তাকে অবাস্তব বলে উড়িয়ে দিত।
লামিন ইয়ামাল নামের পেছনেও রয়েছে তাঁর বাবার এক গভীর কৃতজ্ঞতাবোধের গল্প। আদতে এই বিস্ময় বালকের আসল নাম নাসারউ ইবানা। তাঁর জন্মের আগে মরক্কোন বাবা মুনির যখন চরম আর্থিক অনটনে দিন কাটাচ্ছিলেন, তখন লামিন ও ইয়ামাল নামের দুই সহৃদয় ব্যক্তি তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। সেই উপকারের প্রতি সম্মান জানিয়েই তাঁরা ছেলের নাম রাখেন ‘লামিন ইয়ামাল’। শৈশবে মা-বাবার বিচ্ছেদের পর দিদার কঠোর পরিশ্রমে বড় হওয়া লামিন মাত্র ৬ বছর বয়সে বার্সেলোনার বিখ্যাত লা মাসিয়া অ্যাকাডেমিতে যোগ দেন। ঠিক যেভাবে একদিন মেসি নিজের জাত চিনিয়েছিলেন, ইয়ামালও তেমনি তরতরিয়ে সিনিয়র দলে উঠে আসেন। তৎকালীন কোচ জাভি হার্নান্ডেজের জহুরি চোখ ভুল করেনি, মাত্র ১৫ বছর বয়সে বার্সেলোনা ক্লাবের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলার হিসেবে তাঁর অভিষেক হয়। এরপর দেশের জার্সিতে ইউরো জয় এবং কেরিয়ারের প্রথম বিশ্বকাপেই রোকাফোন্ডার এই শ্রমজীবী ঘরের ছেলেটি বিশ্ব জয় করতে নেমেছেন। গোলের পর হাতের আঙুল দিয়ে ‘৩০৪’ সংখ্যা ফুটিয়ে তুলে তিনি সবসময় মনে করিয়ে দেন নিজের শেকড় ও নিজ এলাকার পোস্টাল কোডের কথা।
ফুটবল বিধাতা যেন এক বৃত্ত সম্পূর্ণ করলেন। ২০২১ সালে বার্সেলোনা যখন তীব্র আর্থিক সংকটে পড়ে, তখন চোখের জলে ক্লাব ছেড়েছিলেন মেসি। আর তার ঠিক দু বছরের মাথায় সেই শূন্যস্থান পূরণ করতেই যেন বার্সার জার্সিতে উত্থান ঘটে ইয়ামালের। এবার সেই bathtub বা স্নানের টব থেকে সরাসরি ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মঞ্চ—বিশ্বকাপের ফাইনালে ১৯ বছরের ইয়ামাল মুখোমুখি হচ্ছেন তাঁর চেয়ে ২০ বছরের বড় কিংবদন্তি মেসির। খোদ মেসিও এই সংযোগকে ‘পাগলামি’ বলে মন্তব্য করে ইয়ামালকে ভবিষ্যতের জন্য শুভকামনা জানিয়েছেন। এমনকি স্প্যানিশ ফুটবলার মিকেল মেরিনো প্রথমবার ছবিটি দেখে এটিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর কারসাজি বলে ভেবেছিলেন। ফাইনাল যতই ঘনিয়ে আসছে, বিশ্বজুড়ে মনফোর্তের সেই ছবির আবেদন ততই আকাশ ছুঁয়েছে। যিনি এই ছবি তুলেছিলেন, সেই আলোকচিত্রী মনফোর্তের মন আজ দুই ভাগে বিভক্ত। বার্সেলোনার আজীবন সমর্থক হিসেবে তিনি একদিকে চান ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড় মেসি যেন দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জিতে রাজকীয় বিদায় নেন, আবার অন্যদিকে মরক্কো ও বিষুবীয় গিনি বংশোদ্ভূত মা-বাবার সন্তান ইয়ামাল যেভাবে আধুনিক বৈচিত্র্যময় স্পেনের প্রতীক হয়ে উঠেছেন, তার এই ঐতিহাসিক জয়ও দেখতে চান। রবিবার রাতে শেষ হাসি যার মুখেই ফুটুক না কেন, মনফোর্তের ক্যামেরায় বন্দি হওয়া সেই সুপ্রাচীন মুহূর্তটি চিরকালের জন্য ফুটবল রোমান্টিকদের হৃদয়ে অমর হয়ে থাকবে।
















