আজকাল ওয়েবডেস্ক: খেলাধুলার মাঠের উত্তেজনা যখন সীমানা পেরিয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক তর্কে রূপ নেয়, তখন ফুটবল আর কেবল একটি খেলা থাকে না। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বমঞ্চে আর্জেন্টিনার একের পর এক সাফল্য যেমন তাদের ফুটবলীয় শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছে, তেমনি দলটির একশ্রেণীর সমর্থক ও খোদ খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধে ওঠা বর্ণবাদের অভিযোগ লাতিন আমেরিকার প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে এক বড় ধরনের ফাটল তৈরি করেছে। অতীতে ইউরোপীয় পরাশক্তিগুলোর বিরুদ্ধে লাতিন আমেরিকার যেকোনো দেশের পক্ষে জোটবদ্ধ হওয়ার যে চিরন্তন আবেগ ছিল, তা এখন অনেকটাই ম্লান। ব্রাজিলের অন্যতম শীর্ষ সংবাদপত্র ‘ও গ্লোবো’-র রাজনৈতিক কলামিস্ট জুলিয়া দুয়াইলিবি সম্প্রতি বিশ্বকাপের ফাইনালে প্রতিবেশী আর্জেন্টিনাকে সমর্থন না করার ঘোষণা দিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন। আর্জেন্টিনা সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে হারানোর পর তিনি স্পষ্ট জানান যে, মাঠে ও গ্যালারিতে বর্ণবাদী আচরণ এবং তা নিয়ে অধিকাংশ ফুটবলারের নীরবতা লাতিন আমেরিকান হিসেবে আর্জেন্টিনার পাশে দাঁড়ানোর অনুভূতিকে বিষিয়ে তুলেছে।

ফুটবল গবেষক ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এই দূরত্বের পেছনে কেবল বর্ণবাদই একমাত্র কারণ নয়, এর সাথে জড়িয়ে আছে সাম্প্রতিক সময়ে আর্জেন্টিনার আকাশচুম্বী সাফল্য। গত চারটি বিশ্বকাপের তিনটিতেই ফাইনালে ওঠা আর্জেন্টিনা যখন একের পর এক ট্রফি ঘরে তুলছে, তখন পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল ২০০২ সালের পর আর ফাইনালের মুখ দেখেনি। কোপা লিবার্তোদোরেসের মতো মহাদেশীয় টুর্নামেন্টগুলোতে ম্যাচের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় ক্লাব স্তরেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও উত্তেজনা চরম রূপ নিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রসারের ফলে আগে যা গ্যালারির কোণে সীমাবদ্ধ থাকত, তা এখন বিশ্বজুড়ে দৃশ্যমান। ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার ক্লাবগুলোর মধ্যে ম্যাচ হলেই গ্যালারি থেকে কৃষ্ণাঙ্গ ব্রাজিলীয়দের লক্ষ্য করে বানরের মতো অঙ্গভঙ্গি করার ঘটনা প্রায় নিয়মিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনকি ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকা জয়ের উদযাপনের সময় খোদ আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের কণ্ঠে ফরাসি ফুটবলারদের লক্ষ্য করে বর্ণবাদী ও সমকামী-বিদ্বেষী স্লোগান শোনা গিয়েছিল, যা বিশ্বজুড়ে সমালোচনার ঝড় তোলে।

আর্জেন্টিনার এই উগ্র শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী সংস্কৃতির পেছনে রয়েছে এক নির্মম ঐতিহাসিক বাস্তবতা। মে বিপ্লব ও হোসে দে সান মার্তিনের নেতৃত্বে ১৮১৬ সালে স্পেনের ২৩৬ বছরের ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভের পর আর্জেন্টিনা দীর্ঘ অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও যুদ্ধে লিপ্ত হয়। আঠারো শতকের শেষভাগে বুয়েনস আইরেস যখন চামড়া ও গবাদি পশু রপ্তানির প্রধান কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠছিল, তখন থেকেই অঞ্চলটির জনসংখ্যাগত কাঠামো বদলে দেওয়ার এক পরিকল্পিত নীলনকশা তৈরি হয়। ঐতিহাসিকদের একাংশের মতে, উনবিংশ শতাব্দীতে প্যারাগুয়ের বিরুদ্ধে সংঘটিত ত্রিপক্ষীয় যুদ্ধে কৃষ্ণাঙ্গ দাসদের যুদ্ধক্ষেত্রের একদম সম্মুখভাগে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে পদ্ধতিগতভাবে হত্যা করা হয়। এরপর ১৮৭০-এর দশকে জেনারেল হুলিও আরহেন্তিনো রোকার ‘মরুভূমি অভিযান’-এর নামে পাম্পাস ও পাতাগোনিয়া অঞ্চলের আদিবাসীদের ওপর নির্মম গণহত্যা চালানো হয়। এই জোড়া গণহত্যার ফলেই আজকের আর্জেন্টিনা লাতিন আমেরিকার অন্যান্য দেশের তুলনায় একটি ব্যতিক্রমী শ্বেতাঙ্গ ও ইউরোপীয় ঘেঁষা সমাজ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, যা দেশটির বিখ্যাত ‘ট্যাঙ্গো’ নাচের আফ্রিকান শিকড় কিংবা কৃষ্ণাঙ্গ কাউবয় বা গাউচোদের ইতিহাসকে সচেতনভাবেই আড়াল করতে চায়।

১৮৮০ সালে বুয়েনস আইরেস স্থায়ীভাবে রাজধানী হওয়ার পর প্যারিসের আদলে নতুন করে সেজে ওঠে। ইতালি ও স্পেন থেকে আসা কোটি কোটি অভিবাসীর আগমনে শহরটি হয়ে ওঠে ইউরোপের এক প্রতিচ্ছবি। ১৯১০ সালের স্বাধীনতার শতবর্ষ উদযাপনের আগেই থিয়েটার কোলন, সাবওয়ে সিস্টেম ও সুবিশাল সব প্রাসাদ তৈরি করে আর্জেন্টিনা তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনী রাষ্ট্রে পরিণত হয়। তবে সেই সোনালী অতীত পার হয়ে আজ যখন দেশটি তীব্র অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন ফুটবল মাঠের সাফল্যই তাদের জাতীয় গর্বের একমাত্র অবলম্বন। কিন্তু মাঠের সেই সাফল্যই আবার প্রতিবেশীদের সাথে তাদের দূরত্ব বাড়িয়ে দিচ্ছে। মেক্সিকোর মতো দেশের ফুটবলারদের নিয়ে আর্জেন্টিনার সাংবাদিকদের আপত্তিকর মন্তব্য মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শিনবাউমকে পর্যন্ত ক্ষুব্ধ করেছে। ব্রাজিলের কলামিস্ট জুলিয়া দুয়াইলিবি মনে করিয়ে দেন যে, ব্রাজিলে বর্ণবাদ দমনের জন্য কঠোর আইন ও আইনি ব্যবস্থা থাকলেও আর্জেন্টিনায় বর্ণবাদকে স্পষ্টভাবে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার মতো নির্দিষ্ট কোনো আইন আজও নেই।

অবশ্য লাতিন আমেরিকার বর্ণবাদের এই জটিল সমীকরণে আর্জেন্টিনার সমালোচকদের পাশাপাশি তাদের পাশে দাঁড়ানোর মতো মানুষেরও অভাব নেই। ব্রাজিলের অনেক ফুটবলপ্রেমী মনে করেন, বর্ণবাদের অভিযোগ যদি স্পেনের বিরুদ্ধেও তোলা যায়, তবে তাদের ঔপনিবেশিক দাসপ্রথার ইতিহাস কিংবা স্প্যানিশ লা লিগায় ভিনিসিয়াস জুনিয়রের ওপর ক্রমাগত বর্ণবাদী আক্রমণের ঘটনাগুলোকেও এড়িয়ে যাওয়া যায় না। তাই রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক সংকটের অভিন্ন অংশীদার হিসেবে তারা আর্জেন্টিনার জয়কেই লাতিন আমেরিকার জয় হিসেবে দেখতে চান। ৩২ বছর বয়সী রিও ডি জেনিরোর গাড়িচালক জোয়াও ফেলিপে জুনিয়রের মতো হাজারো ব্রাজিলীয় ভক্তের কাছে এই বিরোধের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছেন ৩৯ বছর বয়সী জাদুকর লিওনেল মেসি। ক্যারিয়ারের শেষ লগ্নে এসেও যিনি ফুটবল বিশ্বকে বুঁদ করে রেখেছেন, সেই মেসির হাতে আরও একটি বিশ্বকাপ দেখার আকাঙ্ক্ষাই সমস্ত রাজনৈতিক ও সামাজিক তিক্ততাকে ছাপিয়ে অনেক লাতিন আমেরিকানকে আবার আর্জেন্টিনার পতাকাতলে এক করেছে।