ইস্টবেঙ্গল-৩ চেন্নাইয়িন-১
(এডমুন্ড, বিপিন, নন্দকুমার) (ইরফান)
আজকাল ওয়েবডেস্ক: এই ইস্টবেঙ্গল আর শুধু একটা দল নয়। এই ইস্টবেঙ্গল ফিরে আসার সাহস।
এই ইস্টবেঙ্গল অ্যাওয়ে ম্যাচের অচেনা মাটিতেও জয় ছিনিয়ে নিতে পারে। প্রতিপক্ষ দর্শকের বিরুদ্ধ স্রোত উপেক্ষা করেও এই লাল-হলুদ লিখতে পারে নতুন কবিতা।
এই ইস্টবেঙ্গল সেই 'গেল গেল' রবকেও ভারত মহাসাগরের ঢেউয়ের সঙ্গে ভাসিয়ে দিতে জানে। হঠাৎ ঘিরে ধরা কোনও বিকেল, যেখানে আশঙ্কা বেশি, আলো কম—সেরকম কোনও বিকেলকেও অস্কার ব্রুজোঁর দল বদলে দিতে পারে উজ্জ্বল গল্পে।
ইস্টবেঙ্গল আবার চলতে শুরু করেছে চেনা ছন্দে। জেগে উঠেছে নতুন কোনও ভিসুভিয়াস।
ফিফা বিরতির আগে মহমেডান স্পোর্টিংয়ের বিরুদ্ধে সাত গোলের ঝড় ছিল যেন এক ঘোষণা—ইস্টবেঙ্গল ফিরছে। সেই অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্সের পরে দীর্ঘ বিরতি পেরিয়ে চেন্নাইয়ের মাঠে নেমে তারা আবারও লাল-হলুদ দেখাল, তারা কেবল মাঠে নেমে খেলে না, তারা সবুজ মাঠে গল্প লেখে।
চেন্নাইয়িনকে তাদের ঘরের মাঠেই ৩-১ গোলে মাটি ধরিয়ে লাল-হলুদ ব্রিগেড বুঝিয়ে দিল—এই দল থামে না, এই দল অপেক্ষা করে না, এই দল কেবল এগিয়ে চলে। কারণ এই ইস্টবেঙ্গল জানে—ফুটবল শুধু ম্যাচ জেতার খেলা নয়, হারিয়ে যাওয়া বিশ্বাসকে বারবার ফিরে পাওয়ার নামও বটে।
সাত মিনিটে শুরু হয়েছিল এক স্বপ্ন। এডমুন্ডর গোলে এগিয়ে যায় ইস্টবেঙ্গল। চেন্নাইয়ের আর্দ্র বাতাস তখনই হয়তো বুঝে গিয়েছিল, লাল-হলুদ এসেছে গল্প লিখতে। কিন্তু ফুটবল আসলে তো অপেক্ষারও খেলা। দিতে হয় পরীক্ষাও। এগিয়ে যাওয়া ইস্টবেঙ্গল হঠাৎই পথভ্রষ্ট হয়ে পড়ে। সেই সুযোগে চেন্নাইয়িন জাঁকিয়ে বসে ম্যাচের উপরে। ইস্টবেঙ্গলের রক্ষণে কাঁপুণি ধরানোর চেষ্টা করে।
২৮ মিনিটে ইরফান ফিরিয়ে আনেন সমতা। চমৎকার গোলটি করেন তিনি। ১-০ এগিয়ে থাকা ইস্টবেঙ্গল দেখে ম্যাচ হয়ে গিয়েছে ১-১। কেন এরকম হয়ে গেল, তা নিয়ে ইস্টবেঙ্গল কোচ অস্কার ব্রুজোঁ হয়তো ম্যাচ কাটাছেঁড়া করবেন।
চেন্নাইয়িনের ওই ধাক্কার পরেও ইস্টবেঙ্গল প্রতিপক্ষের গোলমুখ খুলে ফেলতে থাকে। বিষ্ণু নিজে এদিন বিষ্ণু অবতারে ধরা দিতে পারতেন। একের পর এক সুযোগ তিনি তৈরি করেন। আবার সেগুলো নষ্টও করেন। সব ঠিকঠাক হলে বিরতির আগেই লেখা হয়ে যেত অন্য এক ফলাফল, অন্য এক আনন্দগাথা।
দ্বিতীয়ার্ধে চেন্নাইয়িন ঝড় তোলার চেষ্টা করে। চলতে থাকে ইস্টবেঙ্গল রক্ষণে একের পর এক হানাদারি। মনে হচ্ছিল, ম্যাচটা বুঝি ধীরে ধীরে অন্য দিকে হেলে পড়ছে। কিন্তু ফুটবল দেবতা সবসময় চোখে দেখা স্ক্রিপ্ট লেখেন না—তিনি লুকিয়ে রাখেন শেষ লাইন।
৮৩ মিনিটে সেই লাইনটাই লেখা হলো। বিষ্ণুর ভাসানো বল থেকে বিপিনের হেডে ২-১ করে ফেলে ইস্টবেঙ্গল। দীর্ঘ অপেক্ষার সব ভার এক সেকেন্ডে মুছে গেল। ডাগআউটে উদ্বেগে-উৎকণ্ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা অস্কার ব্রুজোঁ আদর করতে থাকেন তাঁর সতীর্থদের। কিছুক্ষণ আগে মিগুয়েলের বাড়ানো বল গোল করতে না পারায় এই অস্কারকেই হাত ছুঁড়তে দেখা গিয়েছিল।
ইস্টবেঙ্গলের চেন্নাইয়িন বধের গল্পের শেষে ছিল আরেক ফিরে আসা। নন্দকুমার। একসময় কুয়াদ্রাত জমানায় যিনি মোহনবাগানের বিরুদ্ধে ডার্বির নায়ক হয়েছিলেন, তারপর যেন হারিয়ে গিয়েছিলেন কোথাও। কিন্তু অস্কার তাঁকে ফিরিয়ে এনেছেন, যেমন করে পুরনো গান আবার নতুন সুরে বেঁচে ওঠে।
মহামেডান স্পোর্টিংয়ের বিরুদ্ধে ডার্বির সেই স্মৃতি আবার ফিরেছিল কিছুদিন আগে। প্রায় একই ভাবে নন্দকুমার গোল করেছিলেন সাদা-কালোর বিরুদ্ধে। এদিন চেন্নাইয়িনের জাল ফের কাঁপালেন নন্দকুমার। ইস্টবেঙ্গল ৩ চেন্নাইয়িন ১। শেষ সিলমোহর নন্দকুমারের পায়ে।
চেন্নাইয়ের এই সন্ধ্যা শুধু তিন পয়েন্টের গল্প নয়। এ এক ফিরে আসার কাব্যও। যেখানে এডমুন্ড, বিপিন, আর নন্দ মিলে লিখে দিলেন লাল-হলুদের নতুন অধ্যায়।















