আজকাল ওয়েবডেস্ক: আগামী ১২ই জুন থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ উদ্যোগে শুরু হতে চলেছে ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ। 'গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ' শুরু হতে আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাকি, অথচ ভারতের কোটি কোটি ফুটবল ভক্ত এখনো জানেন না যে তাঁরা কোন চ্যানেলে বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে এই খেলা দেখতে পাবেন। এই নজিরবিহীন সম্প্রচার জটিলতার মাঝেই এবার নিজেদের সম্পূর্ণ সরিয়ে নিল ভারতের সরকারি ব্রডকাস্টার 'প্রসার ভারতী'। দিল্লি হাইকোর্টে তারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, ভারতে ফিফা বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্ব কেনার কোনও দায় বা দায়িত্ব তাদের ওপর বর্তায় না।
দিল্লি হাইকোর্টের বিচারপতি পুরুষৈন্দ্র কুমার কৌরবের এজলাসে এই সংক্রান্ত একটি মামলার শুনানি চলাকালীন প্রসার ভারতী তাদের এই অবস্থান স্পষ্ট করে। আসলে, অ্যাডভোকেট অবধেশ বৈরওয়া আদালতে একটি জনস্বার্থ মামলা দায়ের করেছিলেন। সেখানে দাবি করা হয়েছিল, ফিফা বিশ্বকাপ যেহেতু একটি বিশ্বমানের এবং অত্যন্ত জনপ্রিয় টুর্নামেন্ট, তাই প্রসার ভারতীর উচিত সরকারি চ্যানেল দূরদর্শন এবং ডিডি স্পোর্টসের মাধ্যমে অন্তত উদ্বোধনী ম্যাচ, কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল এবং ফাইনালের মতো গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলো দেশের মানুষের জন্য বিনামূল্যে দেখানোর ব্যবস্থা করা। তবে মামলার জল বেশিদূর গড়ানোর আগেই আবেদনকারী আইনজীবী মামলাটি প্রত্যাহার করার অনুমতি চান, যাতে তিনি অন্য কোনও উপযুক্ত আইনি ফোরামে এই বিষয়টি নিয়ে যেতে পারেন। এর আগে আদালত এই বিষয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রক এবং প্রসার ভারতীকে নোটিশ পাঠিয়েছিল।
ভারতীয় ফুটবল দর্শকদের বিপুল সংখ্যার কথা মাথায় রাখলে এই অচলাবস্থা সত্যিই অবিশ্বাস্য। কাতার বিশ্বকাপের সময় ভারতীয় দল মূল পর্বে যোগ্যতা না পেলেও, ভারত থেকে ফিফার ডিজিটাল ও টেলিভিশন প্ল্যাটফর্মগুলোতে প্রায় ৭৪.৫ কোটি ইন্টারঅ্যাকশন বা ভিউয়ারশিপ তৈরি হয়েছিল, যা বিশ্বজুড়ে অন্যতম সর্বোচ্চ। এত বড় বাজার থাকা সত্ত্বেও ২০২৬ বিশ্বকাপের জন্য ভারতের কোনও বেসরকারি বা সরকারি মিডিয়া হাউস এখনো ফিফার সাথে চূড়ান্ত চুক্তি করতে পারেনি।
মূল সমস্যাটি আটকে রয়েছে ফিফা এবং ভারতীয় ব্রডকাস্টারদের মধ্যে একটি বড়সড় বাণিজ্যিক দড়িটানাটানির জায়গায়। আদালতের নথিতে উঠে এসেছে যে, ফিফা প্রথমে ২০২৬ এবং ২০৩০ বিশ্বকাপের জন্য ভারতীয় বাজারের সম্প্রচার স্বত্বের মূল্য ধরেছিল প্রায় ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ৮৩০ কোটি টাকা)। কিন্তু ভারতীয় চ্যানেলগুলোর কাছ থেকে আশানুরূপ সাড়া না পেয়ে পরে সেই দাম কমিয়ে ৩৫ মিলিয়ন ডলারে নামানো হয়। শোনা যাচ্ছে, ভারতীয় ডিজিটাল বাজারের অন্যতম বড় শক্তি 'জিওস্টার' এই স্বত্বের জন্য ২০ মিলিয়ন ডলারের একটি বিড বা প্রস্তাব দিয়েছিল, যা ফিফা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে।
কিন্তু কেন ভারতীয় ব্রডকাস্টাররা বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা নিয়ে এতখানি অনাগ্রহ দেখাচ্ছে? এর পেছনে মূলত কিছু বড় অর্থনৈতিক ও কৌশলগত কারণ রয়েছে। প্রথমত, এবারের বিশ্বকাপ উত্তর আমেরিকায় হওয়ায় ম্যাচগুলো ভারতীয় সময় অনুযায়ী মাঝরাত কিংবা ভোররাতে সম্প্রচারিত হবে। এই সময়ে সাধারণত টেলিভিশনের সামনে দর্শকের সংখ্যা অনেক কম থাকে, যার ফলে বিজ্ঞাপনের থেকে মোটা টাকা আয় করা ব্রডকাস্টারদের জন্য কঠিন। দ্বিতীয়ত, ভারতের ক্রীড়া সম্প্রচার সংস্থাগুলো ইতিমধ্যেই আইপিএল এবং আইসিসির বিভিন্ন বড় ক্রিকেট টুর্নামেন্টের স্বত্ব কিনতে গিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে রেখেছে। ফলে ক্রিকেটের বাইরে অন্য কোনও খেলায় এই মুহূর্তে বিপুল পরিমাণ অর্থ ঢালতে তারা বেশ সতর্ক।
মামলাকারীর পক্ষে প্রবীণ আইনজীবী বৈভব গগ্গার যুক্তি দিয়েছিলেন যে, ২০০৭ সালের স্পোর্টস ব্রডকাস্টিং সিগন্যাল অ্যাক্ট অনুযায়ী ফিফা বিশ্বকাপকে 'জাতীয় গুরুত্বসম্পন্ন ক্রীড়া ইভেন্ট' হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। তাই ভারতীয় নাগরিকদের এই খেলা দেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা এক প্রকার অন্যায়।
অবশ্য এই চরম অনিশ্চয়তার মধ্যেও ভারতীয় ফুটবল মহলে একটা ক্ষীণ আশার আলো দেখছেন অনেকে। সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশন পরিস্থিতি যে বেশ উদ্বেগজনক তা স্বীকার করেছে। এআইএফএফ-এর ডেপুটি জেনারেল সেক্রেটারি এম সত্যনারায়ণ সম্প্রতি জানিয়েছেন যে, ফেডারেশন সরাসরি কোনও বাণিজ্যিক দর কষাকষিতে হস্তক্ষেপ করতে পারে না ঠিকই, তবে ভারতের ফুটবলের বাজার এতটা বিশাল যে ফিফা বা কোনও বড় ব্রডকাস্টার দীর্ঘ সময় ধরে একে সম্পূর্ণ অবহেলা করতে পারবে না।
ফুটবলপ্রেমীরা আশা করছেন, শেষ মুহূর্তে হয়তো ফিফা এবং ভারতের কোনো বড় মিডিয়া হাউসের মধ্যে একটি সমঝোতা সূত্র বেরিয়ে আসবে। কিন্তু ঘড়ির কাঁটা যেভাবে ১২ই জুনের দিকে এগোচ্ছে, তাতে প্রচার, কারিগরি প্রস্তুতি এবং ম্যাচ শিডিউলিংয়ের সময় ক্রমেই কমে আসছে। শেষ পর্যন্ত ভারতের ফুটবল পাগল জনতা টিভির পর্দায় মেসি-এমবাপেদের ড্রিবলিং দেখতে পাবেন, নাকি চরম হতাশা নিয়ে মাঠের বাইরেই বসে থাকতে হবে, সেটাই এখন দেখার।















