শোভেন ব্যানার্জী
১ ডিসেম্বর,গভীর রাত। উত্তর কলকাতার বড়তলা থানা এলাকায় এক বাড়ির লোকেরা শুনতে পান একটা শিশুর কান্নার আওয়াজ এবং কুকুরের চিৎকার। বাড়িতে কোনও শিশু নেই। আর কুকুরগুলোও বা একসঙ্গে এত চিৎকার কেন করছে? একটু বিরক্ত হয়েই শীতের রাতের গরম বিছানা ছেড়ে দরজা খোলেন গৃহকর্তা। দেখেন দরজার পাশেই ফুটপাতের উপরে কোনায় যেখানে মন্দিরের ছায়াটা একটু পড়ে আলো-আধাঁরি ভাব, সেখানে একটা একরত্তি শিশু পড়ে আছে। গোটা শরীর রক্তে ভেসে যাচ্ছে। কাঁদার শক্তিটুকুও নেই, মাঝে মাঝে ডুকরে কেঁদে উঠছে। মানুষকে জাগাবার দায়িত্ব বোধহয় কুকুরগুলোই নিয়েছিল। মাত্র ৭ মাস বয়সী শিশুকন্যা। অনেকটা দুরে ফুটপাতে মা, বাবার সঙ্গে ঘুমিয়ে ছিল। সেখান থেকে তুলে নিয়ে এসে শিশুটির উপর চলেছে নারকীয় অত্যাচার।
বিচারচলাকালীন হাসপাতালের চিকিৎসক জবানবন্দী দিয়েছিলেন যে, তিনি তাঁর চিকিৎসক জীবনে এমন জঘন্য অপরাধ কখনও দেখেননি। অত্যাচারের ফলে শিশুটির পেরিনিয়াল অঞ্চলটি সম্পূর্ণরুপে ফেটে গেছে। তিনি আরও জানান যে শিশুটি আর স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারবে না। আততায়ী ৩৪ বছরের এক ব্যাক্তি। শিশুটির চারটি বড় অস্ত্রোপচার হয়। আইসিইউতে ভর্তি থাকাকালীনই মামলার রায় প্রকাশিত হয়, এবং অপরাধীর ফাঁসির সাজা হয়।
৫ মার্চ, দুপুর তিনটে। কাজের দিন। হাওড়া স্টেশন ভিড়ে জমজমাট, ট্রেন আসছে-যাচ্ছে। হাজার হাজার মানুষের ব্যস্ততার মধ্যে তিন বছরের মেয়েকে নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন মা। ভারী লাগেজগুলো পায়ের কাছে নামানো ছিল। শিশুটি বায়না করছিল কিছু খাবার জন্য, কিন্তু প্ল্যাটফর্মের খানিকটা দুরের স্টল পর্যন্ত এই ভিড়, এতো লাগেজ নিয়ে যেতে পারছিলেন না মা। শিশুটি বেশি বিরক্ত করতেই মা বেশ জোরে ধমক দেন, 'চুপ করে বসো, না হলে মার খাবে, ট্রেন আসুক, ওতে উঠে তোমায় কিনে দেব।' শিশুটি এতে থামে তো না-ই, বরং জোরে কেঁদে ওঠে। তা দেখে পাশের এক মাঝবয়সী মহিলা বলেন, 'আহা বাচ্চাটার খিদে পেয়েছে, কিছু কিনে দিন, ঐ তো দোকান।' তিনি শিশুটিকে আদরও করতে থাকেন। কিন্তু শিশুটি কোনওমতেই থামে না, তার খাবার চাইই চাই। কান্নার জোর আরও বাড়ে। খুব অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন মা, কি করবেন, ঠিক করে উঠতে পারছিলেন না। বিপদভঞ্জনের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন মহিলা বলেন, 'অতটুকু শিশু না খেয়ে থাকতে পারে! দিন মেয়েকে, আমি দোকানে নিয়ে যাচ্ছি।' এই বলে সামনে যে দোকানটি দেখা যাচ্ছিল, সেদিকে নিয়ে যান। প্রচন্ড ভিড় থাকা সত্বেও মা লক্ষ্য করছিলেন দোকানে দিকে যাওয়ার পথ, কিন্তু এর মধ্যেই প্লাটফর্মে ট্রেন ঢোকে এবং আরও মানুষের ভিড়ে তিনি আর দেখতে পান না। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও না ফেরায় রেল পুলিশের সাহায্য চান। রেল পুলিশ প্লাটফর্ম, স্টেশন এবং স্টেশনের বাইরে সি সি ক্যমেরা ফুটেজ দেখে অভিযুক্ত এবং শিশুটিকে শনাক্ত করে একটি মিনিবাসে। দু'দিনের চেষ্টায় অভিযুক্ত গ্রেপ্তার হয় এবং তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে আরও এক মহিলাকে গ্রেপ্তার করা হয়, যে স্বীকার করে প্রথম মহিলা শিশুটিকে পাচার করার জন্য এনে দেয়। সেই মত তারা শিশুটিকে রাজস্থানের জয়পুর স্টেশনে একজনের হাতে তুলে দিয়ে এসেছে, এবং সম্ভবত মেয়েটিকে সোয়াই মাধোপুরে বিক্রি করা হবে। জি আর পি, রাজস্থান পুলিশের সমবেত প্রয়াসে শিশু টি সাত দিনের মধ্যে উদ্ধার হয় এবং পাচারকারীরা গ্রেপ্তার হয়।

শিশু অপহরণ, শিশু নির্যাতনের কোনও ঘটনাই ব্যতিক্রম নয়। শিশুদের বিরুদ্ধে ঘটে চলা অপরাধের পরিসংখ্যান জানলে স্তম্ভিত হতে হয়। শিশুদের বিরুদ্ধে অপরাধের ঘটনা সারা দেশে প্রতিদিন ১৮৫টিরও বেশি ঘটে চলেছে, প্রতি ঘন্টায় ৮টি। শিশুদের বিরুদ্ধে অপরাধ সারাদেশে নথিভূক্ত হয়েছে - ২০২১ সালে ১,৪০,৮৩৯টি,২০২২ সালে ১,৬২,৪৪৯টি এবং২০২৩ সালে ১,৭৭,৩৩৫টি যা গত বছরের তুলনায় ৯.২% বৃদ্ধি পেয়েছে।
ভারতীয় দণ্ডবিধি, বর্তমানে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা ছাড়াও বিশেষ বিশেষ কিছু আইন নানা ধরনের অপরাধ মোকাবিলায় কার্যকর রয়েছে। বিভিন্ন ধরনের অপরাধ হলেও মূলত দু'টি উল্লেখযোগ্য জঘন্য অপরাধ শিশুদের বিরুদ্ধে হয়ে থাকে তা হল;
১)যৌন নির্যাতন -৬৭,৬৯৪ প্রায় ৩৮%
২)অপহরণ-৭৯৮৮৪ প্রায় ৪৫%।
২০১১ সালে ভারতের শেষ আদমসুমারি অনুযায়ী ১৮ বছরের নীচে শিশু জনসংখ্যা প্রায় ৪৭২ মিলিয়ন। মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩৯%।
ভারতীয় সংবিধানে শিশুদের জন্য কিছু অধিকার কয়েকটি ধারায় সুনিশ্চিত করা হয়েছে। মৌলিক অধিকার অনুচ্ছেদ ১৪ নিশ্চিত করে সাম্যের অধিকার। অনুচ্ছেদ ১৫ বৈষম্যহীনতার অধিকার শুধু নয়, প্রয়োজনে রাষ্ট্রকে নারী ও শিশুদের জন্য বিশেষ সুযোগ সুবিধা তৈরির কথা বলেছে (১৫(৩)ধারা )। জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতার অধিকার নিশ্চিত করে অনুচ্ছেদ ২১। শিশুদের জন্য অবৈতনিক এবং আবশ্যিক শিক্ষার অধিকার (২১ক)ধারা। অনুচ্ছেদ ২৩ শিশুদের পাচার হওয়া এবং বলপূর্বক শিশু শ্রম থেকে সুরক্ষার অধিকার দেয়।
সংবিধান রাষ্ট্র পরিচালনার নির্দেশমূলক নীতির মাধ্যমে দিক নির্দেশ করেছে(অনুচ্ছেদ ৩৯(চ)) শিশুরা যাতে একটা সুস্বাস্থ্যকর পরিবেশে, স্বাধীনভাবে, মর্যাদার সঙ্গে বেড়ে ওঠার সবরকম সুযোগ সুবিধা পায় এবং শৈশব এবং কৈশোর যাতে সবরকমের অপব্যাবহার এবং নৈতিক অবক্ষয় থেকে সুরক্ষিত থাকে। অনুচ্ছেদ ৪৫ বলেছে রাষ্ট্র প্রাকশৈশব যত্ন এবং ৬ বছর বয়স পর্যন্ত সব শিশুর শিক্ষাকে নিশ্চিত করার ব্যাবস্থা করবে।
আন্তর্জাতিক ঘোষণাপত্রের অন্যতম স্বাক্ষরকারী দেশ হিসাবে এবং ভারতীয় সংবিধানের নির্দেশ মেনে ভারতীয় কেন্দ্রীয় সরকার এবং রাজ্য সরকারগুলি শিশু সুরক্ষায় বিভিন্ন আইন ও উদ্যোগ নিয়েছে।
শিশুদের জন্য জাতীয় নীতি ১৯৭৪ অনুসারে শিশুরা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্পদ, এই লক্ষ্য সামনে রেখে সমস্ত শিশুকে একটা শিক্ষা, পুষ্টি, খাদ্য সরবরাহ-সহ বিস্তৃত কর্মসূচির আওতায় আনা। জাতীয় শিক্ষা নীতি ১৯৮৬ অনুসারে সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষার উপর গুরুত্ব। অপারেশন ব্ল্যাক বোর্ড, সর্ব শিক্ষা অভিযান-এর সূচনা। শিশুশ্রম সংক্রান্ত জাতীয় নীতি ১৯৮৭ অনুসারে, ক্রমবর্দ্ধমান শিশু শ্রম নিবারণে আইন প্রণয়ণ, কর্মসূচি র্নির্ধারণ ও প্রকল্প ভিত্তিক কর্ম পরিকল্পনা।
জাতীয় স্বাস্থ্য নীতি ২০০২ অনুসারে স্কুল স্বাস্থ্য সমস্যাগুলিকে অগ্রাধিকার দেবে, স্কুলে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও সমস্ত প্রধান প্রতিরোধ যোগ্য রোগ প্রতিরোধে সর্বজনীন টিকা দান করবে। NFHS-5 বলছে সর্বজনীন টিকা প্রদানের আওতায় এখনো ২৩% শিশুদের (১২-২৩মাস বয়সী) আনা যায়নি। সুসংহত শিশু বিকাশ প্রকল্পের সুবিধা পায়নি ৩২% শিশু। ভারতে প্রয়োজনীয় পুষ্টির অভাবে ৫ বছরের নীচে ৩৬% শিশু বয়স অনুপাতে খর্বকায়, ৩২% কৃশকায় এবং ৬৭% রক্তাল্পতায় আক্রান্ত। ৮০.৯ শতাংশ ৭ বছর ঊর্দ্ধ শিশু স্বাক্ষর (PLFS23-24)। নারী ও শিশু উন্নয়ন মন্ত্রকের তত্ত্বাবধানে স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা জাতীয় শিশু অধিকার সুরক্ষা কমিশন ভারতের সংবিধান এবং জাতিসংঘের শিশু অধিকার কনভেনশনে গৃহীত শিশু অধিকারের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ তা নিশ্চিত করার দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা।
২০২০-২১ অর্থবর্ষে CPS প্রকল্পের অধীনে রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলিকে ৭০,৯৭৭.৫৩ লক্ষ টাকা তহবিল দেওয়া হয়েছিল রাজ্য সভায় জানিয়েছিলেন তৎকালীন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী স্মৃতি ইরানি।
শিশুদের অধিকার রক্ষায় এবং সুরক্ষা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একাধিক আইন প্রণয়ণ করা হয়েছে, যার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য যৌন নিগ্রহ থেকে শিশুদের সুরক্ষা আইন ২০১২।
এই আইনে সারাদেশে নথিভুক্ত হয় ২০১৭ সালে ৩২,৬০৮ টি মামলা, ২০১৮ সালে ৩৯,৮২৭ টি মামলা, ২০১৯ সালে ৪৭,৩৩৫ টি মামলা, ২০২০ সালে ৪৭,২২১ টি মামলা, ২০২১ সালে ৫৩,৮৭৪ টি মামলা, ২০২২ সালে ৬৩,৪১৪ টি মামলা, ২০২৩ সালে ৬৭,৬৯৪ টি মামলা হয়। শেষ প্রাপ্ত তথ্যের নিরিখে ভূক্তভোগীদের বয়স ছিল ৭৬২ জন ছ'বছরের নীচে, ছয় থেকে ১২ বছর ৩২২৯ জন , ১২ থেকে ১৬ বছর ১৫,৪৪৪ জন এবং ১৬ থেকে ১৮ বছর ২১, ৪১১জন শিশু।
সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হল অপরাধীদের মধ্যে ৯৬% ভূক্তভোগীর পরিবার, প্রতিবেশী,বন্ধু, অনলাইন বন্ধু, নিয়োগকর্তা, লিভ ইন পার্টনার বা পরিচিত মানুষ। ৪০,৪৩৪টি পেনিট্রেটিভ সেক্সচুয়াল এ্যসল্ট মামলায় ৩৯,০৭৬ জন অভিযুক্তই ভূক্তভোগীর পরিচিতি ব্যাক্তি ! এখানেই একটু ভেবে দেখুন আরও কত লক্ষ, হাজার তথাকথিত পরিচিত মানুষ রকমারি পারিবারিক সন্মান, সামাজিক কলঙ্ক ইত্যাদি বিধিনিষেধের রক্ষা কবচে ঘৃণ্য অপরাধ করেও তালিকার বাইরে রয়ে গিয়েছে। কোন অভিযোগই নথিভুক্ত হয়নি।
শিশুদের সুরক্ষায় ভারতে কেন্দ্রীয় ও রাজ্যসরকার গুলি বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। শিশু দের যৌন নির্যাতন ও যৌন হয়রানির হাত থেকে রক্ষা করার জন্য কঠিন POCSO আইন ২০১২ প্রণয়ণ করা হয়েছে। এই আইনে ১৮ বছরের কম বয়সী যে কোনও ব্যাক্তিকেই শিশু হিসাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। শিশুদের বিরুদ্ধে এই ধরনের অপরাধ প্রতিরোধ করার লক্ষ্যে মৃত্যুদণ্ড-সহ কঠিন কঠোর শাস্তি দেওয়ার জন্য ২০১৯ সালে আইনটি সংশোধিত হয়। দ্রুত বিচারের জন্য বিশেষ আদালত স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এই আইনে অভিযোগ প্রমাণের দায় বাদী পক্ষ থেকে বিবাদী পক্ষের। দ্রুত সমাধানের জন্য এই লিঙ্গ নিরপেক্ষ আইনে পুলিশি তদন্তের জন্য দুই মাস এবং বিচার সম্পূর্ণ করার জন্য একবছর সময় নিদিষ্ট করা হয়েছে। এই আইন নিশ্চিত করে যে এই ধরনের অপরাধ মোকাবিলায় রুজু হওয়া মামলাগুলি সর্বোচ্চ জরুরি ও সংবেদনশীলতার সঙ্গে পরিচালিত হচ্ছে, যা শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘঠিত অপরাধের প্রতি আইনের শূন্য-সহনশীলতার প্রতিশ্রুতি। লোকসভায় কেন্দ্রীয় মহিলা ও শিশু উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী সাবিত্রী ঠাকুর জানিয়েছেন হাইকোর্ট থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ৩১/০১/২৫ পর্যন্ত সারাভারতে ৩০টি রাজ্য এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলিতে ৪০৪টি বিশেষ POCSO আদালত সহ ৭৫৪-টি ফাস্ট ট্র্যাক বিশেষ কোর্ট কার্যকর রয়েছে যেখানে ৩,০৬,০০০-এরও বেশি মামলার নিস্পত্তি হয়েছে।
অপহরণ শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত হওয়া মোট অপরাধের প্রায় ৪৫%।
অপহরণ ২০২১ সালে ৬৭,২৪৫ টি, ২০২২ সালে ৭৪,২৮৪ এবং ২০২৩ সালে ৭৯,৮৮৪টি হয়েছে। প্রায় ১৮জন প্রতি লক্ষে। ২০২২ সালে অপহ্রত হওয়া শিশুদের মধ্যে ৬২,০৯৯জন কন্যা। ৫১,১০০শিশু কে উদ্ধার করা যায়নি,যার মধ্যে ৭৮.৮% শিশুকন্যা । মূলত শিশুশ্রম, অঙ্গ পাচার, বিবাহ, তোলা আদায়, ভিক্ষা বৃত্তি এবং যৌন ব্যবসা এই অপরাধের কারণ।
শিশুদের বিরুদ্ধে অপরাধ, শিশু নির্যাতনের ঘটনা আমাদের দেশে প্রতিবছর বেড়েই চলেছে। এই ধরনের অপরাধ কেবল শরীর নয়, ভুক্তভোগীর মনেও একটা চিরস্থায়ী চিহ্ন রেখে যায়। এক অদ্ভুত সামাজিক চেতনা বিন্যাসে, অপরাধের দৃশ্যমান ক্ষত সময়ের প্রলেপে মিলিয়ে গেলেও, সামাজিক সন্মান, মর্যাদা, এবং অবমূল্যায়ণ সারাজীবন তাড়া করে বেড়ায়। সারা বিশ্বে সমস্ত জাতির মধ্যেই শিশুদের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সম্পদ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। যে কোনও জাতির ভবিষ্যত নির্ভর করে, তাদের আগামী প্রজন্ম কিভাবে বিকশিত হবে তার উপর।
বর্তমান সময়ে শিশু অধিকারের প্রশ্নটি জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে বারংবার আলোচিত হয়ে চলেছে। অতীত ইতিহাস থেকে সাম্প্রতিক বর্তমান মৃত, আহত, লাঞ্ছিত, অপমানিত, পীড়িত, নির্যাতিত, নিগৃহীত, নিস্পেষিত মনুষত্ব্যের অবমাননাকারি সমস্ত তালিকায় শিশুদের স্থান সবার উপরে। বিপ্লবে, প্রতিবিপ্লবে, ছাত্র বিপ্লবে, যুব বিপ্লবে, দ্রোহে, বিদ্রোহে, যুদ্ধে, দাঙ্গায়, দুর্যোগে,অনাহারে, অনটনে ক্ষতিগ্রস্ত তালিকায় সবার আগে সমাজের এই দুর্বলতম শ্রেণি।
কঠিন বাস্তবতা হল যে আজও শিশুরা মানবাধিকার এবং সামাজিক ন্যায়বিচার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সুবিধা বঞ্চিত সংখ্যালঘু একটা গোষ্ঠী। শারীরিক, মানসিক, অর্থনৈতিক ভাবে অরক্ষিত একটা অরাজনৈতিক সত্ত্বা। এরপরে আরও ভয়ানক অবস্থায় সমাজের প্রান্তসীমায় বাস করে সেই শিশুরা যারা মাতৃপিতৃহীন, একাকী, নিঃস্ব, গৃহহীন, পথশিশু, মানসিক বা শারীরিক ভাবে প্রতিবন্ধী। অপরাধের সহজ শিকারের উর্বর উৎসস্থল।
রাষ্ট্র তার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা জারি রেখেছে এই ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে। কিন্তু একজন সুনাগরিক হিসাবে আমরা প্রত্যেকে ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্যে এক নিরাপদ বাসযোগ্য সুস্থ স্বাভাবিক সমাজ রেখে যেতে পারব তো? ভাবার সময় এসেছে।
