পৃথিবীতে এমন অনেক বিষয় রয়েছে যা আমাদের বিস্মিত করে। তেমনই একটি উদাহরণ হল লোনার হ্রদ। মহারাষ্ট্রের বুলধানা জেলায় অবস্থিত এই হ্রদ ভারতের তথা গোটা বিশ্বের অন্যতম এক আশ্চর্য প্রাকৃতিক বিস্ময়। এই হ্রদের সবচেয়ে বড় রহস্য এবং আকর্ষণ হল এর জলের রং বদল। বছরের একটা নির্দিষ্ট সময়ে এই হ্রদের জল আচমকাই গাঢ় গোলাপি হয়ে যায়, আবার ঋতু বদলাতেই সেই জল পুরোপুরি সবুজ রং ফিরে আসে। প্রকৃতির এই অদ্ভুত ম্যাজিকের পেছনে কী বৈজ্ঞানিক কারণ লুকিয়ে রয়েছে, আসুন জেনে নেওয়া যাক। 

হ্রদটি তৈরি হয়েছিল কীভাবে? আজ থেকে প্রায় ৫০ হাজার বছর আগে মহাকাশ থেকে একটি বিশাল ও ভারী উল্কাপিণ্ড প্রচণ্ড গতিতে এসে পৃথিবীর বুকে আছড়ে পড়েছিল। সেই ধাক্কায় মাটির গভীরে এক বিশাল গর্তের সৃষ্টি হয়, যা কালক্রমে এই লোনার হ্রদে পরিণত হয়। 

বিজ্ঞানীদের কাছে এটি একটি ‘ইমপ্যাক্ট ক্রেটার’। এই হ্রদের জলের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যা হল এর জল একইসঙ্গে নোনতা এবং ক্ষারযুক্ত। পৃথিবীর খুব কম হ্রদেই এমন জলের কম্বিনেশন দেখা যায়।

কেন জল গোলাপি হয়ে যায়? সাধারণত গরমের দিনে এই হ্রদের জল গোলাপি রঙে বদলে যায়। এর পেছনে কাজ করে জলবায়ুর পরিবর্তন এবং কিছু অণুজীবের রাসায়নিক বিক্রিয়া। যা হল- 

জলের পরিমাণ কমে যাওয়া: গরমকালে প্রচণ্ড রোদে হ্রদের জল বাষ্প হয়ে উড়তে শুরু করে। ফলে হ্রদে জলের পরিমাণ কমে যায় এবং জলের নোনতা ভাব (লবণাক্ততা) ও ক্ষারত্ব বহুগুণ বেড়ে যায়।

বিশেষ ব্যাকটেরিয়ার জন্ম: জলের এই চরম নোনতা অবস্থায় এবং তীব্র গরমে এক ধরণের বিশেষ ব্যাকটেরিয়া ও শৈবাল খুব দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে। এদের বিজ্ঞানসম্মত নাম হল ‘হ্যালোআর্কিয়া’ এবং ‘ডুনালিয়েলা স্যালিনা’। 

রং বদলের আসল কারণ: এই ব্যাকটেরিয়া ও শৈবালগুলো তীব্র সূর্যালোক এবং অতিরিক্ত নুন থেকে নিজেদের বাঁচাতে নিজেদের শরীরের ভেতরে এক ধরণের লাল বা গোলাপি রঙের উপাদান (রঞ্জক পদার্থ বা ক্যারোটিনয়েড) তৈরি করে। যেহেতু হ্রদে কোটি কোটি এমন ব্যাকটেরিয়া তৈরি হয়, তাই তাদের সেই লাল-গোলাপি রঙের প্রভাবে পুরো হ্রদের জলটাই রাতারাতি টকটকে গোলাপি দেখাতে শুরু করে।

আবার কীভাবে সবুজ রঙে ফেরে? যখন গরমকাল শেষ হয়ে বর্ষা নামে, তখন পরিস্থিতি আবার বদলে যায়। আকাশে মেঘ জমায় রোদের তেজ কমে যায় এবং হ্রদের জলের তাপমাত্রাও কমে। বৃষ্টির নতুন জল হ্রদে এসে মেশার ফলে জলের অতিরিক্ত নোনতা ভাব বা লবণাক্ততা এক ধাক্কায় অনেকটা কমে যায়। পরিবেশ স্বাভাবিক হতেই ওই নুন-প্রিয় গোলাপি ব্যাকটেরিয়াগুলো মারা যায় বা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। তখন হ্রদে আবার সাধারণ সবুজ শৈবালের সংখ্যা বাড়তে থাকে এবং হ্রদের জল তার চেনা সবুজ রঙে ফিরে আসে।

মহাকাশের পাথরের আঘাতে তৈরি হওয়া এই হ্রদটি বছরের পর বছর ধরে বিজ্ঞানীদের গবেষণার এক বড় উৎস। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে লোনার হ্রদের এই সবুজ থেকে গোলাপি আর গোলাপি থেকে সবুজ হওয়ার খেলা দেখতে দেশ-বিদেশের হাজার হাজার পর্যটক ও প্রকৃতিপ্রেমী প্রতি বছর মহারাষ্ট্রে ভিড় জমান।