আজকে ওয়েবডেস্ক: যৌনতা এমন একটি বিষয়, যা নিয়ে সমাজে কৌতূহল যেমন প্রবল, তেমনই রয়েছে অস্বস্তি ও ভুল বোঝাবুঝি। স্পষ্ট, দায়িত্বশীল ও প্রাসঙ্গিক আলোচনা না হলে এই বিষয়টি সহজেই বিকৃত ধারণা তৈরি করতে পারে, এমনটাই মনে করছেন বহু সমালোচক। সম্প্রতি সাংবাদিক শুভঙ্কর মিশ্রের পডকাস্ট আনপ্লাগড শুভঙ্কর-এ কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও যৌন শিক্ষাবিদ সীমা আনন্দের একটি মন্তব্য ঘিরে সেই বিতর্কই নতুন করে সামনে এসেছে।
পডকাস্টের আলোচনায় যৌনতা সংক্রান্ত নানা সামাজিক ধারণা ও মিথ নিয়ে কথা বলেন সীমা আনন্দ। কথোপকথনের এক পর্যায়ে শুভঙ্কর মিশ্র প্রশ্ন করেন, কেন অনেক সময় কম বয়সী ছেলেরা বয়স্ক নারীদের প্রতি আকৃষ্ট হয়। এরপর তিনি সীমা আনন্দের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা জানতে চান, আদৌ কখনও কি তাঁর সঙ্গে এমন কোনো ঘটনা ঘটেছে কি না।
এই প্রশ্নের উত্তরে সীমা আনন্দ জানান, গত বছর তাঁর সঙ্গে এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল, যেখানে একজন ছেলে তাঁর প্রতি আকর্ষণ প্রকাশ করেছিল। তিনি বলেন, তখন ওই ছেলেটির বয়স ছিল ১৫ বছর এবং তাঁর নিজের বয়স ছিল ৬৩। এই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় শুভঙ্কর মিশ্র মন্তব্য করেন, “আপনার থেকে চার গুণ ছোট ছেলে আপনাকে হিট করার চেষ্টা করেছিল,” যার সঙ্গে সীমা আনন্দ যোগ করেন, “আর সবচেয়ে কুৎসিত ভাষায়।”
এই অংশটি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়তেই আলোচনা দ্রুত অন্য দিকে মোড় নেয়। অনেক দর্শকের কাছে ‘১৫ বছর’ বয়সের উল্লেখ পুরো কথোপকথনের চরিত্রই বদলে দেয়। সমালোচকদের একাংশের মতে, কোনও নাবালকের প্রসঙ্গ এলেই বিষয়টি আর সাধারণ সামাজিক পর্যবেক্ষণ বা কৌতূহলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, তখন তা দায়িত্ব, সীমারেখা ও সুরক্ষার প্রশ্নে রূপ নেয়।
https://www.youtube.com/shorts/eeN4DpaV7u0
একজন ব্যবহারকারী মন্তব্য করেন, “এই গল্প বিনোদন নয়, বরং উদ্বেগের কারণ হওয়া উচিত। শুভঙ্কর মিশ্রের মতো বড় প্ল্যাটফর্মে সীমা আনন্দের উচিত ছিল নাবালক সংক্রান্ত বিষয় এত হালকা ভঙ্গিতে না তোলা। ১৫ বছরের একটি শিশুর ক্ষেত্রে প্রশ্নটা আকর্ষণ নয়, প্রশ্নটা সীমা ও দায়িত্বের।”
আরেকজন লেখেন, “আকর্ষণের কারণ নিয়ে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে, ''অভিজ্ঞতার প্রতি টান, কর্তৃত্ব বা পরিপক্বতা নিয়ে ভুল ধারণা, কিংবা সোশ্যাল মিডিয়া থেকে পাওয়া বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট। কিন্তু নাবালক জড়িত থাকলে বিষয়টা আর আকর্ষণের নয়, এটা দায়িত্ব ও সীমানার প্রশ্ন। একে রোমান্টিসাইজ করা ঠিক নয়।”
অন্য এক মন্তব্যে বলা হয়, “এই বিতর্ক শুধু একটি বক্তব্য নিয়ে নয়, এটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সংবেদনশীল বিষয় উপস্থাপনের দায়িত্ব নিয়ে সতর্কবার্তা। খোলামেলা আলোচনা জরুরি, কিন্তু প্রসঙ্গের স্পষ্টতা, ভাষার সংযম এবং সামাজিক প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা আরও বেশি জরুরি যাতে ভুল বার্তা না ছড়ায়।”
কিছু মন্তব্য আরও কঠোর ভাষায় বিষয়টিকে নৈতিকতার প্রশ্নে নিয়ে যায়। একজন লেখেন, “সব কিছুর গায়ে ‘কনসেন্ট’ স্টিকার লাগালেই তা জ্ঞান হয়ে যায় না। যা এখানে শিক্ষা হিসেবে বিক্রি করা হচ্ছে, তা আসলে ক্ষমতায়নের নামে নৈতিক অবক্ষয়।”
এই বিতর্কের প্রেক্ষিতে আবারও সামনে এসেছে, ডিজিটাল মিডিয়ায় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বক্তব্য কতটা সতর্ক ও দায়িত্বশীল হওয়া উচিত, বিশেষ করে যখন আলোচনায় নাবালকদের প্রসঙ্গ উঠে আসে।
উল্লেখ্য, সীমা আনন্দ লন্ডন-ভিত্তিক একজন মিথোলজিস্ট ও পেশাদার গল্পকার। তিনি দ্য আর্টস অফ সিডাক্শন গ্রন্থের লেখক এবং ভারতীয় মৌখিক সাহিত্য নিয়ে তাঁর কাজের জন্য পরিচিত। ‘স্পিকিং মাইন্ডস’ ওয়েবসাইট অনুযায়ী, তাঁর কাজ ইউনেস্কোর ‘এনডেঞ্জার্ড ওরাল ট্র্যাডিশনস’ প্রকল্পের সঙ্গেও যুক্ত। মহাভারত, রামায়ণ, তন্ত্র দর্শন, কামসূত্র এবং ভগবদ্গীতার ব্যাখ্যা নিয়ে তাঁর পাঠ ও আলোচনা জনপ্রিয়।
ইনস্টাগ্রামে তাঁর অনুসারীর সংখ্যা এক মিলিয়নের বেশি। সেখানে তিনি নারী ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে যৌনতা, আনন্দ এবং যৌন মিথ ভাঙা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করে থাকেন। তবে সাম্প্রতিক এই বিতর্ক দেখিয়ে দিয়েছে, খোলামেলা আলোচনার সঙ্গে সঙ্গে দায়িত্ব, সংবেদনশীলতা ও সামাজিক প্রভাবের প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
