লাদাখের পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুকের অনশন ঘিরে উঠে এসেছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। টানা অনেকক্ষণ বা অনেক দিন না খেয়ে থাকলে শরীরের ভিতরে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটে? অনেকেই ভাবেন, শুধু ওজন কমে যায়। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘ সময় খাবার না খেলে শরীরের প্রায় সব অঙ্গই প্রভাবিত হয়।
শুরুতে শরীর নিজের জমিয়ে রাখা শক্তি ব্যবহার করে। কিন্তু সেই শক্তি শেষ হয়ে গেলে একে একে ফ্যাট, তারপর পেশি ভাঙতে শুরু করে। পরিস্থিতি আরও গুরুতর হলে হৃদযন্ত্র, কিডনি, লিভার এবং মস্তিষ্কও ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। তাহলে সময় ধরে জেনে নেওয়া যাক না খেয়ে থাকার পর কখন কোন পরিবর্তন ঘটে শরীরে?
প্রথম ৬ থেকে ১২ ঘণ্টা: খাবার খাওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর শরীর রক্তে থাকা গ্লুকোজ ব্যবহার করে। এরপর যকৃত ও পেশিতে জমে থাকা গ্লাইকোজেন ভেঙে শক্তি তৈরি করে। এই সময় অনেকের খিদে পায়, মাথা হালকা লাগে, বিরক্তি আসে বা দুর্বল লাগে। তবে সাধারণত শরীর তখনও স্বাভাবিকভাবেই কাজ চালিয়ে নিতে পারে।
১২ থেকে ২৪ ঘণ্টা: গ্লাইকোজেনের মজুত কমে গেলে শরীর বিকল্প শক্তির উৎস খুঁজতে শুরু করে। তখন শরীরে জমে থাকা চর্বি ভাঙা শুরু হয় এবং কিটোন নামে এক ধরনের জ্বালানি তৈরি হয়। এই সময় ক্লান্তি, মাথা ঘোরা, মনোযোগ কমে যাওয়া এবং কাজ করার শক্তি কমে যেতে পারে।
কয়েক দিন না খেলে কী হয়? অনশন দীর্ঘ হলে শুধু ফ্যাট নয়, শরীর পেশিও ভাঙতে শুরু করে। ফলে দ্রুত ওজন কমে, পেশির জোর কমে যায় এবং শরীর খুব দুর্বল হয়ে পড়ে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমতে থাকে। ছোটখাটো সংক্রমণও তখন বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে। অনেকের রক্তচাপ কমে যায়, মাথা ঘোরে, দাঁড়ালে অজ্ঞান হওয়ার মতো অবস্থাও হতে পারে।
হৃদযন্ত্র, কিডনি ও মস্তিষ্কের উপর প্রভাব: শরীরে পর্যাপ্ত খাবার, জল এবং খনিজ না থাকলে হৃদযন্ত্র ঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। হৃদস্পন্দন অনিয়মিত হতে পারে। কিডনির কাজেও সমস্যা দেখা দেয়, কারণ শরীরে জলের ঘাটতি তৈরি হয়। মস্তিষ্কে পর্যাপ্ত শক্তি না পৌঁছলে চিন্তাভাবনা, স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগে প্রভাব পড়ে। অনেক সময় বিভ্রান্তি বা অস্বাভাবিক আচরণও দেখা দিতে পারে।
দীর্ঘদিন না খেয়ে থাকলে শরীরে সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ খনিজের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। এতে হৃদযন্ত্র হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়া, খিঁচুনি, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা একাধিক অঙ্গ বিকল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। তাই দীর্ঘ অনশনে থাকা ব্যক্তিদের নিয়মিত চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণে রাখা অত্যন্ত জরুরি।
অনশন ভাঙার সময়ও দরকার সতর্কতা। অনেকেই মনে করেন, দীর্ঘদিন না খেয়ে থাকার পর পেট ভরে খেলেই সমস্যা মিটে যাবে। কিন্তু বাস্তবে তা নয়। একসঙ্গে বেশি খাবার খেলে রিফিডিং সিনড্রোম নামে বিপজ্জনক জটিলতা হতে পারে। তাই দীর্ঘ অনশনের পরে ধীরে ধীরে, চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে খাবার শুরু করা উচিত।
চিকিৎসকদের মতে, কয়েক ঘণ্টার ধর্মীয় উপবাস বা ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং আর দিনের পর দিন অনশন এক জিনিস নয়। দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে। তাই কোনও কারণেই দীর্ঘ অনশন করলে অবশ্যই চিকিৎসকের নজরদারিতে থাকা প্রয়োজন।
















