আর্জেন্টিনাইংল্যান্ড

(এনজো, লাওতারো) (গর্ডন)

আজকাল ওয়েবডেস্ক: সব গল্পের শেষ একরকম হয় না। কিন্তু এবারের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার গল্পগুলো যেন একই রকম। সেই পিছিয়ে পড়া, হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা, তারপর হঠাৎ করেই ফিরে আসার এক অবিশ্বাস্য মহাকাব্য লিখে দিচ্ছেন মেসিরা। 

যখন সবাই ধরে নিচ্ছে, এবার হয়তো আর বাঁচার পথ নেই, যখন সময়ের কাঁটা শেষ আশাটুকুও কেড়ে নিতে চাইছে, ঠিক তখনই কাহানি মে টুইস্ট। লিওনেল স্কালোনির দল প্রমাণ করছে, তাদের গল্পের শেষ লাইন লেখা হয় একেবারে শেষ মুহূর্তে।

বারবার মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসছে আর্জেন্টিনা। অসম্ভবকে সম্ভব করে জীবনের জয়গান গাইছে। লড়াই, লড়াই আর লড়াই। তার সঙ্গে রয়েছে নিজেদের উপরে অগাধ আস্থা আর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত জয়ের খিদে ধরে রাখা। 

ইংল্যান্ডও ভেবেছিল, এবার হয়তো থামবে আর্জেন্টিনার রূপকথা। অ্যান্থনি গর্ডনের গোলে যখন এগিয়ে গেলেন ইংরেজরা, তখন মনে হচ্ছিল সময় ধীরে ধীরে ফুরিয়ে যাচ্ছে মেসিদের জন্য। কিন্তু আর্জেন্টিনা যে অন্য গল্প লিখতে এসেছে আমেরিকায়। একদিন যে মাটি থেকে কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে যেতে হয়েছিল দিয়েগো মারাদোনাকে, সেই মাটিতেই আলভারেজ-মার্টিনেজরা বিজয়কেতন উড়িয়ে ফাইনালের পাসপোর্ট জোগাড় করে ফেলল। জয়ের আনন্দে সমর্থকরা উন্মাদের মতো গেয়ে চলেছেন, 'ভামোস ভামোস আর্জেন্টিনা।'

রুদ্ধশ্বাস সেমিফাইনালের স্কোরবোর্ড বলছে, ইংল্যান্ড ১ আর্জেন্টিনা  ২। জিতল আর্জেন্টিনা। বলা ভুল হল। আসলে জিতলেন লিওনেল মেসি।

বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার পথচলা দেখতে দেখতে মনে হচ্ছে এ যেন একজন মানুষের স্বপ্নকে বয়ে বেড়াচ্ছেন একদল যোদ্ধা।খর্বকায় এক ম্যাজিশিয়ানকে সামনে রেখে বাকিরা নিজেদের উজাড় করে দিচ্ছেন। নীল জার্সির প্রতিটি যোদ্ধা জানেন, তাঁদের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন এমন একজন মানুষ, যাঁর জন্য শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত লড়াই করা যায়। তাঁর জন্যই কাপ নিয়ে যেতে হবে বুয়েনোস আইরেসে।  

প্রতিটি ম্যাচে দেখা যাচ্ছে সেই অদৃশ্য বন্ধন। আলভারেজদের দৌড়, ডিফেন্ডারদের আত্মত্যাগ, মিডফিল্ডারদের অবিরাম ছুটে চলা। সবকিছুর পিছনে একটাই নাম, লিওনেল মেসি। তাঁরা কেবল একটি ম্যাচ জিততে মাঠে নামছেন না, তাঁরা নামছেন একজন কিংবদন্তির অসমাপ্ত গল্পকে পূর্ণতা দিতে। 

মেসি হয়তো আগের মতো প্রতিটি মুহূর্তে ঝড় তোলেন না, কিন্তু তাঁর উপস্থিতিই আর্জেন্টিনার হৃদয়ে এক অদৃশ্য আগুন জ্বালিয়ে দেয়। তিনি মাঠে থাকলেই সতীর্থদের চোখে জ্বলে ওঠে অন্য এক বিশ্বাস। শ্বাসপ্রশ্বাসে খেলা করে একটাই মন্ত্র, 'এই মানুষটার স্বপ্ন ভাঙতে দেওয়া যাবে না কিছুতেই।'

পিছিয়ে পড়লে বাড়তি অ্যাড্রিনালিন ঝরে তাঁদের। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে যখন ১-০ গোলে পিছিয়ে পড়েছিল আর্জেন্টিনা, তখনও বিশ্বাস হারায়নি তাঁরা। খুঁজছিল এমন এক মুহূর্ত, যা বদলে দিতে পারে খেলার গতিপথ। নীল ঝড় আছড়ে পড়ছিল ইংরেজদের উপর। কিন্তু কাঙ্খিত গোল যে আসছিল না! আর্জেন্টাইন সমর্থকরাও প্রমাদ গুনছেন তখন। তবে কি স্বপ্ন ভেঙে যাবে এবার? 

ঠিক সেই সময়ে এনজো ফার্নান্দেজের পা থেকে বেরিয়ে এল কামানের গোলা। যা শুধু ইংল্যান্ডকে দুমড়ে মুচড়ে দিয়ে জালে জড়াল না, জাগিয়ে তুলল আর্জেন্টিনার স্বপ্নকে। তারপর সেই চেনা দৃশ্য। মেসির পায়ের জাদু। নিখুঁত ক্রস ভাসিয়ে দিলেন বক্সে। তার মধ্যে ছিল বিপদের গন্ধ। পরিবর্ত হিসেবে নামা লাওতারো মার্তিনেজ বিষ ঢেলে দিলেন। পিছিয়ে থাকা ম্যাচ এক ঝটকায় নিজেদের ড্রেসিং রুমে নিয়ে গেল আর্জেন্টিনা। চ্যাম্পিয়ন দলের এটাই তো বিশেষত্ব। কেপ ভার্দে, মিশর, সুইজারল্যান্ডের পরে এদিন ইংল্যান্ডও পারল না বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের দৌড় থামাতে। 

এই বারুদে ঠাসা সেমিফাইনাল নিছক একটা ফুটবল ম্যাচ ছিল না। মাঠের ২২ জন যোদ্ধার সঙ্গে টাচলাইনের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা দুই মায়েস্ত্রোর কৌশলের লড়াইটাও ছিল দেখার মতো।  

শুরু থেকেই ম্যাচে ছড়িয়েছিল উত্তেজনা, সংঘর্ষ আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা। কেউ কাউকে এক ইঞ্চি জমি ছাড়তে রাজি নয়। গোল করার চেয়ে লড়াইয়ের ভাষাই প্রথমার্ধে বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। ১৯টা ফাউল হল প্রথমার্ধে। তার মধ্যে আর্জেন্টিনার ফাউল ১২টা। ইংল্যান্ড সেখানে ফাউল করেছে ৭টা। সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখা হল, 'এটা ফুটবল না ডব্লিউ ডব্লিউই!'

ম্যাচের প্রথমার্ধে গোলে একটি শটও কেউ রাখতে পারেনি। ১৯৬৬ সালের পর থেকে বিশ্বকাপের ইতিহাসে এটিই প্রথম এমন অদ্ভুত ঘটনা। 

কিন্তু বিরতির পর বদলে গেল গল্পের সুর। আর্জেন্টিনা ফিরে এল নতুন উদ্যমে। তাদের আক্রমণ আরও ধারালো হল। একের পর এক সুযোগ তৈরি হল। কিন্তু ঠোঁট আর পেয়ালার মধ্যে ব্যবধান থেকেই গেল। কখনও জর্ডন পিকফোর্ড, কখনও ভাগ্যের সাহায্য না পাওয়ায় গোলের দেখা পাচ্ছিল না আর্জেন্টিনা। 

উলটে ৫৫ মিনিটে ইংল্যান্ড প্রথম আঘাত হানে। মরগান রজার্সের নিখুঁত ক্রস থেকে মার্কারের দৃষ্টি এড়িয়ে অ্যান্থনি গর্ডন দারুণ ফিনিশ করে যান। আর্জেন্টিনার রক্ষণে তখন হাঙরের হাঁ। গর্ডনকে ফাঁকায় কীভাবে ছেড়ে দিলেন মোলিনা!

অনেকেই বলছিলেন, গোলের মুখ আর খুলতে পারবে না আর্জেন্টিান। কিন্তু মেসিরা যে হার মানতে চান না। তাঁরা যে অন্য ধাতু দিয়ে গড়া। গোল পেয়ে যাওয়ার পরে ইংল্যান্ডও হয়ে গেল রক্ষণাত্মক। অন্যদিকে গোল শোধের জন্য মরিয়া হয়ে উঠল আর্জেন্টিনা। স্পেনস দুর্দান্ত ট্যাকলে থামালেন সিমিওনেকে। ৬৪ মিনিটে লিয়ান্দ্রো পারেদেসের পরিবর্তে স্কালোনি মাঠে পাঠালেন নিকো গঞ্জালেজকে। ৬৯ মিনিটে প্রায় গোল করে ফেলেছিলেন তিনি। সে যাত্রায় পিকফোর্ড বাঁচিয়ে দেন নিকো গঞ্জালেজের হেড। 

হাইড্রেশন ব্রেকের পরে তিন-তিনটি পরিবর্তন আনে আর্জেন্টিনা। লিসান্দ্রো মার্টিনেজ, নাহুয়েল মোলিনা ও জুলিয়ানো সিমিওনের বদলে মাঠে নামেন নিকোলাস ওতামেন্দি, রডরিগো দি পল ও গনজালো মন্তিয়েল। এই পরিবর্তন নতুন প্রাণ সঞ্চার করল আর্জেন্টিনার। 

৭৬ মিনিটে ম্যাক আলিস্টারের হেড পোস্টে লেগে ফিরে এল। ইংল্যান্ড ভেঙে পড়ার ইঙ্গিত দিতে শুরু করে দিয়েছে ততক্ষণে। ৮৫ মিনিটে এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। এনজো ফার্নান্দেজের শট জড়িয়ে গেল ইংল্যান্ডের জালে। অতিরিক্ত সময়ে মেসির সেন্টার থেকে লাওতারো মার্টিনেজ ২-১ করলেন। সাত মিনিটে দুটো গোল করে আর্জেন্টিনা বুঝিয়ে দিল এভাবেও ফিরে আসা সম্ভব। 

ফাইনালে আর্জেন্টিনার সামনে এবার স্পেন। এক নতুন চ্যালেঞ্জ, এক নতুন পরীক্ষা। ফাইনালের মঞ্চে মুখোমুখি হবে দুই প্রজন্মের দুই প্রতীক। 

একদিকে ৩৯ বছরের বৃদ্ধ সিংহ লিওনেল মেসি। অন্যদিকে ১৯ বছরের তরুণ তুর্কি লামিন ইয়ামাল। একজন মহাকাব্যের শেষ অধ্যায় হয়তো লিখতে চলেছেন। আরেক জন ইতিহাস তৈরি করতে চান। ফাইনালের ওই লড়াই হয়তো লিখে দেবে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে স্মরণীয় এক অধ্যায়।