আমাদের শরীরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ হলো লিভার বা যকৃৎ। শরীর থেকে ক্ষতিকর টক্সিন বা বর্জ্য পদার্থ বের করা থেকে শুরু করে খাবার হজম করা, সবকিছুতেই লিভারের ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু জীবনযাত্রার অনিয়ম বা অন্যান্য কারণে লিভারের সমস্যা দিন দিন বাড়ছে। এমনকী লিভার সিরোসিস এবং লিভার ক্যানসারও বাসা বাঁধছে কমবয়সিদের শরীরে।


এদিকে মুশকিল হল, লিভারের সমস্যা সহজে বাইরে থেকে বোঝা যায় না। যখন লক্ষণ প্রকাশ পায়, ততক্ষণে রোগ অনেকটাই বেড়ে যায়। কোন কোন লক্ষণ দেখে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন? জেনে নিন-

দিন-রাত প্রচণ্ড ক্লান্তি ও দুর্বলতা: আপনার কি পর্যাপ্ত ঘুমানোর পরেও সারাদিন শরীর ম্যাচম্যাচ করে? একটু কাজ করলেই মনে হয় আর শক্তি নেই? লিভার যখন ঠিকমতো কাজ করতে পারে না, তখন শরীরে পুষ্টির ভারসাম্য বিগড়ে যায়। এছাড়া লিভারের কোষে প্রদাহ  হলে শরীর নিজস্ব শক্তি তৈরিতে বাধা পায়। একইসঙ্গে রক্তের বিষাক্ত উপাদানগুলো পরিষ্কার না হওয়ায় তা মস্তিষ্কে ও পেশিতে প্রভাব ফেলে, ফলে মানুষ সারাক্ষণ ক্লান্ত ও অবসন্ন বোধ করে।


হজমের সমস্যা, বমি ভাব ও খাবারে অরুচি: হঠাৎ করেই খাবার দেখলে আর খেতে ইচ্ছা করছে না, কিংবা অল্প খেলেই পেট ভারী হয়ে থাকছে?  খাবার হজম করার জন্য লিভার ‘পিত্তরস’ বা বাইল  তৈরি করে। লিভার অসুস্থ হলে এই পিত্তরস তৈরি কমে যায়। ফলে বিশেষ করে তেল-চর্বি জাতীয় খাবার একদম হজম হতে চায় না। খাবার পেটে গিয়ে জমে থাকে, যা থেকে গ্যাস, বুক জ্বালাপোড়া এবং ঘন ঘন বমি বমি ভাব তৈরি হয়। সঙ্গে খিদেও পায় না। 

চোখ ও ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া বা জন্ডিস: আয়নায় তাকালে যদি দেখেন চোখের সাদা অংশটা বা হাতের তালু হলদেটে দেখাচ্ছে, তবে তা লিভারের বড়সড় সতর্কবার্তা। আমাদের শরীরে পুরনো রক্তকণিকা ভাঙার ফলে ‘বিলিরুবিন’ নামের একটি হলদে পিগমেন্ট তৈরি হয়। সুস্থ লিভার এই বিলিরুবিনকে শরীর থেকে বের করে দেয়। কিন্তু লিভার দুর্বল হয়ে পড়লে তা পারে না। ফলে রক্তে বিলিরুবিন জমে চোখ ও ত্বক হলুদ হয়ে যায় এবং প্রস্রাবের রঙও গাঢ় হলুদ হতে শুরু করে।

সামান্য আঘাতেই কালশিটে পড়া বা রক্তপাত: হয়তো কোথাও সামান্য একটু ধাক্কা লেগেছে, তাতেই ত্বকের নিচে রক্ত জমে কালচে বা নীলচে দাগ হয়ে গেল। কিংবা দাঁত মাজতে গেলে মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়ছে। রক্ত জমাট বাঁধার জন্য আমাদের শরীরে কিছু বিশেষ প্রোটিনের প্রয়োজন হয়, যা তৈরি করে লিভার। লিভারের কার্যক্ষমতা কমে গেলে এই প্রোটিনগুলো আর পর্যাপ্ত পরিমাণে তৈরি হতে পারে না। ফলে রক্ত পাতলা হয়ে যায় এবং ছোটখাটো আঘাতেই ত্বকের নিচে রক্তক্ষরণ হয়ে কালশিটে পড়ে

পা, গোড়ালি এবং পেট ফুলে যাওয়া: হঠাৎ খেয়াল করলেন আপনার পায়ের পাতা বা গোড়ালি ফুলে গিয়েছে, জুতো পরতে কষ্ট হচ্ছে। কিংবা কোনও কারণ ছাড়াই পেটটা অতিরিক্ত ফেঁপে বা ফুলে উঠছে। লিভারের ক্ষতি হলে রক্তের ‘অ্যালবুমিন’ নামক একটি জরুরি প্রোটিনের উৎপাদন কমে যায়। এই প্রোটিনের কাজ হল রক্তনালীর তরলকে ধরে রাখা। অ্যালবুমিন কমে গেলে রক্তনালী থেকে জল চুইয়ে আসে এবং আশেপাশের টিস্যুতে জমা হতে থাকে। সাধারণত মহাকর্ষের টানে এই জল পায়ের দিকে বেশি জমা হয়। আর পেটে জল জমলে পেটটি ড্রামের মতো ফুলে ওঠে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় 'অ্যাসাইটিস' বলে।