পরমা দাশগুপ্ত

পাঁচ বছরের ছোট্ট মেয়ে। বাইরে কোথাও গেলেই ফিরে এসে ঘষে ঘষে হাত ধোয় অন্তত বার ছয়েক। বারণ করলেও শোনে না কিছুতেই। 
বছর দশের ছেলেটা পরীক্ষা এলেই বড্ড বেশি ভয় পায়। ঘন ঘন ছোটে ঠাকুরঘরে। তিন বেলা ফুল দিয়ে পুজো না করলে নাকি পরীক্ষা ভাল হবে না। 
আপাতদৃষ্টিতে এর কোনওটার মধ্যেই খারাপ কিছু নেই। অনেকেই বলবেন, হাত ধোয়া তো স্বাস্থ্যকর অভ্যাস। কিংবা পুজো বা ঠাকুরদেবতায় বিশ্বাস রাখাই বা খারাপ কীসে?
কিন্তু সেটাই যদি বাড়াবাড়ির পর্যায়ে চলে যায়? 
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তখন সে সব আর সাধারণ অভ্যাস থাকে না। বরং তা অবসেসিভ কমপালসিভ ডিসঅর্ডার বা সংক্ষেপে ওসিডি-র পর্যায়ে পড়ে। কেউ কেউ বলতেই পারেন, এ জিনিস আবার বাচ্চাদের হয় নাকি? বিশেষজ্ঞদের মতে, শতকরা হিসেবে অনেক কম হলেও ছোটরাও আক্রান্ত হতে পারে ওসিডি-তে। 
কিন্তু কেন?
পেরেন্টিং কনসালট্যান্ট পায়েল ঘোষ বলছেন, “ছোটদের ওসিডি-র নেপথ্যে রয়েছে ইনসিকিওরিটির সমস্যা। সেটা বাড়ির পরিবেশের জন্য হতে পারে কিংবা কোনও কিছু থেকে তৈরি হওয়া ভয়ের জেরে। বড়দের মতো তাদের তো আর জীবনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতার সংস্পর্শে আসার সুযোগ ঘটে না। তাই আমি পরীক্ষায় ভাল করতে পারব কিনা, আমার মা-বাবা সুস্থ থাকবে কিনা কিংবা আমি নিরাপদে থাকতে পারব কিনা—এই ধরনের সাধারণ চিন্তা বা উদ্বেগ বেড়ে গেলে তাদের ঠেলে দিতে পারে ওসিডি-র দিকে। আগে ছোটদের মধ্যে এই সমস্যা দেখা যেত না বললেই চলে। কিন্তু কোভিড অতিমারির সময়ে ঘরে-বাইরে আতঙ্কের পরিবেশ, সারাক্ষণ রোগ নিয়ে চর্চা, জীবনযাত্রা পুরোপুরি পাল্টে অচেনা হয়ে যায় কিংবা কাছ থেকে মৃত্যু দেখার মতো অভিজ্ঞতা ছোটদের মনে গভীর ভাবে দাগ কেটে গিয়েছে। সেই অভিজ্ঞতার প্রভাব কিংবা আতঙ্ক মনের অতলে আজও বয়ে বেড়াচ্ছে অনেকেই। মনের মধ্যে জন্ম নিচ্ছে অনিশ্চয়তা। তারই জেরে এই ধরনের অভ্যাসে বাঁধা পড়ছে ছোটরা।“
কী ভাবে এই ধরনের অভ্যাসে জড়িয়ে পড়ে ছোটরা?
পায়েলের কথায়, “হয়তো মনের মধ্যে কোভিড-সচেতনতার অভ্যাস বা আতঙ্ক এখনও গেঁথে আছে। সেই থেকেই ওসিডি-তে আক্রান্ত ছোটদের মনে হয় হয়তো বা বার বার হাত ধুলে নিরাপদ থাকা যাবে অথবা ঠাকুরকে প্রণাম করলে মা-বাবা সুস্থ থাকবে। কিংবা হয়তো বাড়িতে পরীক্ষার রেজাল্ট নিয়ে বকাবকির জেরে একটা ভীতি রয়েছে মনে। তার মধ্যে কেউ হয়তো তাকে বলেছে ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা করলে পরীক্ষা ভাল হবে। এসব মনের মধ্যে বেশিরকম গেঁথে গেলে ওসিডি-র দিকে গড়িয়ে যেতে পারে। আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাড়িতে কারও যদি এই ধরনের অভ্যাস বা ওসিডি-র মতো সমস্যা থাকে এবং সে বাচ্চাটির খুবই কাছের কেউ হয়, সে ক্ষেত্রেও ছোটদের মধ্যে সমস্যা চারিয়ে যেতে পারে। কারণ বাচ্চারা নরম মাটির মতো। তাদের এই ধরনের কাজ বারবার করতে বললে তারা সহজে বিশ্বাস করে। অভ্যাসগুলো বাড়াবাড়ির পর্যায়ে চলে গেলে লোকে যদি হাসাহাসি করে, তবে তারা সেগুলো হয়তো কমিয়ে দেয়। কিন্তু মনের ভিতরে কোথাও থেকেই যায়।”  
অর্থাৎ সাধারণ কিছু অভ্যাসই বাড়াবাড়ির পর্যায়ে পৌঁছলে তা ওসিডি-র আকার নিয়ে ফেলতে পারে অজান্তে। তা হলে কখন অভিভাবকদের সতর্ক হওয়া জরুরি? কী দেখেই বা তাঁরা চিনবেন, বাচ্চা এই সমস্যায় আক্রান্ত? 
পায়েলের মতে, “কোনও কাজ করতেই হবে অর্থাৎ কমপালশন এবং করেই যেতে হবে অর্থাৎ অবশেসন-এর মতো পরিস্থিতি ছোটদের ওসিডি চিনিয়ে দিতে পারে। হয়তো কোনও বাচ্চা বার বার হাত ধুচ্ছে এবং ধুয়েই যাচ্ছে। কিংবা হয়তো বিছানার ওঠার আগে পা ঘষে ঘষে মুছেই চলেছে। অথবা শোওয়ার সময়ে বিছানার চাদর কুঁচকে গেলে বারবার উঠে তা ঠিক করছে। বা হয়তো পরীক্ষা দিতে যাওয়ার আগে প্রতিদিন গুনে গুনে দশবার ঠাকুরঘরে মাথা ঠুকে প্রণাম করছে। এর প্রত্যেকটাই কিন্তু ওসিডি-র উপসর্গ। তাই এগুলোর কোনওটা দেখতে পেলে অভিভাবকদের সাবধান হওয়া জরুরি। নিজেরা বুঝিয়ে দেখতে পারেন এবং প্রয়োজনে অবশ্যই বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিতে হবে।”
কীভাবে বাচ্চাকে বার করে আনা যাবে ওসিডি-র কবল থেকে?
পায়েল বলছেন, “কিছু অভ্যাস নিয়ে বাচ্চা বাড়াবাড়ি করছে, এমনটা নজরে এলে ওকে ডেকে বোঝান। তবে লঘু ভাবে বললে কাজ হবে না। সাময়িক ভাবে আপনার সন্তান তা বন্ধ করলেও তার মনের মধ্যে বিষয়টা থেকেই যাবে। তাই দৃঢ় ভাবে ওকে বারণ করুন। স্পষ্ট করে বোঝান, একবার ভাল করে সাবান দিয়ে হাত ধুলেই যথেষ্ট কিংবা বিছানার চাদর টানটান না থাকলেও তাতে শুলে কোনও ক্ষতি নেই। পরীক্ষার আগে একবার প্রার্থনা করলেও কাজ হবে, এটাও ওকে স্পষ্ট করে বোঝাতে হবে। মাথায় রাখুন, যে কোনও আলোচনাই সোজাসুজি, স্পষ্ট এবং বিজ্ঞানসম্মত হতে হবে। বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়ে দৃঢ় ভাবে বোঝালে তাতে কাজ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এবং অবশ্যই খেয়াল রাখুন, বাড়িতে যেন ছোটদের সঙ্গে খোলাখুলি সচ্ছন্দ এবং বৈজ্ঞানিক আলোচনার একটা পরিবেশ বজায় থাকে। এছাড়া প্রয়োজনে বাড়ির যে বড়দের থেকে বাচ্চারা এ ধরনের অভ্যাস শিখছে বলে অনুমান করছেন, তাঁদেরও বুঝিয়ে বলুন। বিশেষত তাঁদের কারও ওসিডি আছে বলে জানা থাকলে চেষ্টা করুন তাঁদের এই ধরনের অভ্যাস বা কাজকর্ম থেকে বাচ্চারা যেন দূরে থাকে।”
যে কোনও কিছুরই বাড়াবাড়ি ঠিক নয়। সে ভাল অভ্যাস হোক বা বদভ্যাস। ছোটদের অভ্যাসে তাই একটু হলেও নজর রাখুন। অজান্তে যেন ওসিডি থাবা বসাতে না পারে!