লম্বা উইকেন্ড? ব্যস! কলকাতা কিংবা দক্ষিণবঙ্গের বাঙালি ছোটে সো-জা দীঘা, মন্দারমণি, তাজপুর। আরও একটু বেশিদিন ছুটি? ডেস্টিনেশন পুরী, গোয়া কিংবা আন্দামানের সাগরতট। কিন্তু পরপর দুই দুর্ঘটনা যে দেখিয়ে দিল নিরাপত্তার গাফিলতি কিংবা বেহিসেবী অসাবধানতাকে মোটেই ক্ষমা করে না সমুদ্র!
সদ্য তালসারিতে শুটিং করতে গিয়ে সমুদ্রে তলিয়ে জনপ্রিয় অভিনেতা-লেখক রাহুল অরুণোদয় ভট্টাচার্যের মর্মান্তিক মৃত্যু নাড়া দিয়ে গিয়েছে টলিউড ইন্ডাস্ট্রি থেকে অনুরাগী মহল, আমজনতা সকলকেই। কার তরফে নিরাপত্তার গাফিলতি ছিল, কী করে এমন ঘটল, তা নিয়ে চলছে তুমুল চাপানউতোর। তার রেশ কাটতে না কাটতেই তাজপুরে জোয়ারের সময়ে সমুদ্রে নেমে তলিয়ে গিয়েছেন সোদপুর ঘোলার বাসিন্দা চিকিৎসক দম্পতি। শোরগোল ফেলেছে এই দুর্ঘটনাও। এবং দুই ক্ষেত্রই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে সমুদ্রে নামার ক্ষেত্রে ঝুঁকির দিকগুলো মাথায় রাখা এবং সাবধান থাকা ঠিক কতখানি জরুরি।

ভারতে প্রায় সাড়ে ৭ হাজার কিলোমিটার জুড়ে রয়েছে উপকূলরেখা। এ রাজ্যে দিঘা, মন্দারমণি, তাজপুর, তালসারি, শঙ্করপুর এবং আরও কিছু অফবিট ভার্জিন বিচ সপ্তাহান্তের ছুটির জনপ্রিয় ঠিকানা। সমুদ্রপাড়ে ছুটি কাটাতে হলে কোন কোন ঝুঁকির কথা মাথায় রাখবেন?

•    বঙ্গোপসাগরের উপকূল রেখা বরাবর বিভিন্ন জায়গায় সমুদ্র নানা সময়েই উত্তাল হয়ে ওঠে। বিশেষত, কালবৈশাখীর মরসুমে, বর্ষাকালে এবং নিম্নচাপের সময়ে। 
•    সমুদ্রে, বিশেষত যে সমস্ত ক্ষেত্রে বা এলাকায় তার ঢেউ উত্তাল হয়ে ওঠার দুর্নাম রয়েছে, সেখানে চোরা স্রোত বয়ে যায় যখন তখন। 
•    সমুদ্রের নীচে, নানা জায়গায় চোরাবালির গর্ত থাকে যাতে পা পড়লেই বিপদ।
•    কম জলে অনেকক্ষেত্রে সমুদ্রের তলায় ধারালো পাথর বা বোল্ডারের টুকরো থাকে, হাত-পা কেটে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। 
•    অনেক ক্ষেত্রে কম জলের নীচে সমুদ্র তটের হেরফেরে বা চড়ার কারণে কাদা বা বালির ঘূর্ণি তৈরি হয়। সেখানে জলের স্রোতে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

•    মন্দারমণি, তাজপুর, তালসারির মতো সৈকতে ভাটার সময়ে সমুদ্রে বেশ কিছুটা দূর পর্যন্ত জল একেবারেই কমে যায়। আবার জোয়ার এলেই আচমকা গোড়ালি ডোবা জল, ঢেউ এবং স্রোতের টান একধাক্কায় অনেকখানি বেড়ে গিয়ে ডুবিয়ে দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করে। 

সাগরপাড়ে ছুটিতে যাওয়া তো আনন্দের ভাসা জন্যই। বিচ ভেকেশনে গিয়ে সমুদ্রে না নামলে মজাটাই অর্ধেক মাটি। তবে নিজের সুরক্ষার দিকটা আগেভাগে মাথায় রাখলে সমুদ্রে নামাও হয়, ছুটির আমেজ উপভোগও করা যায় পুরোদস্তর। সমুদ্রে তবে সাবধান থাকবেন কীভাবে?
•    সাগরপাড়ে ছুটির প্ল্যানের ক্ষেত্রে সবার আগে মাথায় রাখুন আবহাওয়ার দিকটা। বর্ষাকাল বা নিম্নচাপ তো বটেই, কালবৈশাখী কিংবা ঝড়বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকলে সমুদ্রে নামা এড়িয়ে যান। 
•    যে সৈকতে যাচ্ছেন, সেখানে সাগরতটে কিংবা জলের নীচে চোরাবালি বা ঘূর্ণি আছে কিনা, থাকলে কোন কোন জায়গায় আছে, তা আগেভাগে জেনে নিন। হোটেলমালিক বা স্থানীয় বাসিন্দারা এ খবর দিতে পারবেন। ইন্টারনেটেও তথ্য পাবেন। 
•    সমুদ্রের কোন কোন অংশে চোরাস্রোত বয়, বা কোন জায়গাগুলোতে স্রোতের টান বেশি, অবশ্যই জেনে নিন হোটেলমালিক কিংবা এলাকার মানুষের থেকে। মাঝি কিংবা সাগরপাড়ের দোকানিরাও বলতে পারবেন এই তথ্য।
•    জোয়ার-ভাটার সময় আগেই জেনে রাখুন। কোন সময়ে জল কতটা থাকে, জোয়ার এলে কী ভাবে কতখানি জল বেড়ে যায়, সবই স্থানীয় মানুষ, মাঝি, দোকানদার এবং হোটেল মালিকেরা বলতে পারবেন। জোয়ারের সময়ে সমুদ্রে নামবেন না একেবারেই। 
•    জেনে রাখুন, সৈকতের কোন কোন অংশে যাওয়া বা সমুদ্রে নামায় কিংবা সমুদ্রে নামার ক্ষেত্রে কোন কোন সময়সীমায় প্রশাসনের তরফে নিষেধাজ্ঞা জারি রয়েছে। খোঁজ নিন স্থানীয় মানুষের কাছেও। বাড়তি সাহস দেখিয়ে বারণ উড়িয়ে সেসব জায়গায় নামবেন না। 
•    একেবারে জনহীন সৈকতে সমুদ্রে নামবেন না একেবারেই। সেখানে চোরাবালি, ঘূর্ণি কিংবা স্রোতের বাড়তি টান থাকতেই পারে। বিপদে পড়লে বাঁচানোর কেউ থাকবে না। 
•    সাগরপাড়ে নুলিয়ারা থাকেন। থাকে বিপর্যয় মোকাবিলা দফতরের বোট। সমুদ্রে নেমে সামান্যতম বিপদ আঁচ করলেই তাদের সাহায্য নিন। দরকারে সমুদ্রে নেমে একটু বেশি জলে যাওয়ার আগে তাদের জানিয়ে রাখুন।
•    সমুদ্রে নৌকো কিংবা স্পিডবোটে উঠলে অবশ্যই লাইফজ্যাকেট পরতে ভুলবেন না। 
•    কোনওরকম অসুস্থতা থাকলে, মদ্যপান করলে কিংবা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় একেবারেই সমুদ্রে নামবেন না। বিপদ ডেকে আনার মধ্যে কোনও বীরত্ব নেই। 
•    আজকাল অনেক সৈকতেই নানা ধরনের অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসের ব্যবস্থা থাকে। তাতে সামিল হতেও আগ্রহী হন অনেকেই। তবে স্পিডবোটিং হোক বা ওয়াটার স্কুটার, প্যারাসেলিং কিংবা স্কুবা ডাইভিং— সবার আগে জেনে নিন তার সুরক্ষা কতটা নিশ্চিত রয়েছে। এবং অবশ্যই অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলুন গাইডদের নির্দেশ। 

সাবধানের মার নেই! কথাটা বড্ড খাঁটি। ছুটির আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে বেহিসেবী কাজে বিপদ না-ই বা ডেকে আনলেন!