যুদ্ধের আঁচ এসে পৌঁছে গিয়েছে এই কলকাতাতেও। গ্যাসের আকালে পুড়তে শুরু করেছে বাঙালির হেঁশেল। গ্যাস ফুরোলেই মাথায় হাত। কবে যে সিলিন্ডার মিলবে, তার আশ্বাস ঠিকমতো দিয়ে উঠতে পারছে না ডিস্ট্রিবিউটর সংস্থাও। স্পেশাল রান্নাবান্না না হয় বাদই রাখলেন ক’দিন। কিন্তু রোজকার খাওয়াদাওয়া তো আর শিকেয় তোলা যায় না।
মুশকিল আসান ইনডাকশন কুকসেট কিংবা মাইক্রোওয়েভের মতো বৈদ্যুতিক মাধ্যম। এতদিন যা মূলত ছিল শখের রান্না বা একার সংসারের হাতিয়ার, এখন রোজকার রান্নার জন্য তাতেই এখন আস্থা রাখতে চাইছে গৃহস্থবাড়ি। কিন্তু কীভাবে এই সব গ্যাজেটে দৈনন্দিন সাধারণ রান্না করতে হয়, তার সঠিক নিয়ম জানা থাকাও জরুরি। রইল তারই হালহদিশ।
ভাত - ইন্ডাকশনে ভাত রান্না করতে যতটা চাল, তার দ্বিগুণ পরিমাণে জল নিন ওই গ্যাজেটে ব্যবহারের উপযোগী পাত্রে। হাই সেটিংয়ে (৮-১০) জল ফুটতে দিন। জল ফুটে গেলে ধুয়ে রাখা চাল দিয়ে সেটিং লো (২-৩) করে দিন। ঢাকা দিন টাইট ফিটিং ঢাকনা দিয়ে। সিমারে থাকা অবস্থায় মিনিট পনেরো রান্না করলেই ভাত তৈরি। ইন্ডাকশন বন্ধ করে সাবধানে ঢাকনা সরিয়ে হাতা দিয়ে নেড়ে দেখে নিন ভাত ঠিকমতো হয়েছে কিনা।
ডাল – ইন্ডাকশনে ডাল রান্না করা সবচেয়ে সহজ স্টেনলেস স্টিল বা কাস্ট আয়রনের প্রেশার কুকারে। আধ কাপ ডালে তার আড়াই গুণ জল দিন। প্রেশার কুকারে ডাল, জল, হলুদ, এবং প্রয়োজনে পছন্দসই সবজি বা টোম্যাটো দিয়ে সেদ্ধ হতে দিন মিডিয়াম হাই হিটে (১০০০-১৩০০ ওয়াট)। ৩-৪টে সিটি পড়ার পরে লো হিট (৬০০-৮০০ ওয়াট) করে দিন। এর পরে ইন্ডাকশন বন্ধ করে ঢাকনা খুলে দেখে নিন কেমন সেদ্ধ হল। এই সময়েই ফোড়ন, ঘি, নুন, মিষ্টি (প্রয়োজনে) যোগ করে কম হিটে ২-৩ মিনিট একটু ফুটিয়ে নিন। ডাল তৈরি।
তরকারি - পাঁচমিশেলি তরকারি রাঁধতে পারেন মাইক্রোওয়েভে। পছন্দের কয়েক রকম সবজি (আলু, ফুলকপি, গাজর, বিন হতে পারে) টুকরো টুকরো করে কেটে নিন। মাইক্রোওয়েভের উপযোগী পাত্রে সবজির টুকরোর সঙ্গে মিশিয়ে নিন ১ টেবিল চামচ সর্ষের তেল, আধ চা চামচ লঙ্কাগুঁড়ো, আধ চা চামচ হলুদ গুঁড়ো, আধ চামচ পাঁচফোড়ন, নুন, মিষ্টি (স্বাদ মতো)। এবার তাতে এক কাপের সিকিভাগ জল দিয়ে পাত্রের ঢাকনা এঁটে দিন। হাই হিটে (৯০০-১০০০ ওয়াট) মাইক্রোওয়েভে রান্না করুন ৩ মিনিট। এরপর একবার নেড়েচেড়ে ফের তিন থেকে পাঁচ মিনিট রান্না করুন সবজি নরম না হওয়া পর্যন্ত। মাইক্রোওয়েভ বন্ধ করে এবার ভিতরেই রেখে দিন ২-৩ মিনিট। শেষমেশ পরিবেশনের পালা। বাড়তি সুস্বাদের জন্য আগে তেল ও পাঁচফোড়ন মিশিয়ে আধ থেকে ১ মিনিট গরম করে নিতে পারেন। তারপরে তাতে সবজি, বাকি মশলাপাতি ও জল দিন।
মাছ – বাঙালির তো আর মাছ ছাড়া চলে না! এ সময়টায় ভরসা রাখুন মাইক্রোওয়েভ ওভেনে সহজে তৈরি করা যায়, এমন রেসিপিতেই। যেমন দই মাছ বা ভাপা। ভাপার জন্য সর্ষে, পোস্ত, সামান্য দই, নুন, মিষ্টি (প্রয়োজন মতো), কাঁচা লঙ্কা এবং অল্প একটু জল দিয়ে পেস্ট তৈরি করুন। মাইক্রোওয়েভ ওভেনে ব্যবহারের উপযোগী বাসনে সেই পেস্ট দিয়ে কিছুক্ষণ ম্যারিনেট করে রাখুন পাঁচ-ছয় টুকরো মাছ (রুই, কাতলা, ইলিশ, ভেটকি বা পাবদা)। দই মাছের ক্ষেত্রে ম্যারিনেট করুন দই, আদা-জিরে বাটা, কাঁচালঙ্কা, নুন, মিষ্টি (প্রয়োজন মতো)-র পেস্টে। এরপর ম্যারিনেশন মাখানো মাছের পাত্র ঢাকা দিয়ে হাই হিটে (৯০০-১০০০ ওয়াট)-এ রান্না করতে হবে ৫-৬ মিনিট। দই মাছের ক্ষেত্রে শেষে একটু গরম মশলা ও ঘি দিয়ে সামান্য রান্না করে নিন। রান্না শেষ হলে মাইক্রোওয়েভের ভিতরেই আরও মিনিট পাঁচেক রেখে দিন দই মাছ বা মাছ ভাপা। এর পরে বার করে গরম গরম পরিবেশন করুন।
ডিম – ডিমের ঝোল রান্না করে নিতে পারেন ইন্ডাকশনে। উপযোগী পাত্রে ইন্ডাকশনে কয়েকটা ডিম বসিয়ে প্রথমে ৮ মিনিট সেদ্ধ করে নিন। সেদ্ধ ডিমের খোলা ছাড়িয়ে ডিমের সাদা অংশে হাল্কা করে চিরে নিন। মিডিয়াম হিটে (১০০০ ওয়াট) প্রথমে ১ টেবিল চামচ তেল গরম করে নিন। এরপরে তাতে সেদ্ধ ডিম, এক চিমটে হলুদ ও লঙ্কা গুঁড়ো যোগ করে ১-২ মিনিট ভেজে নিন। সোনালি রং ধরলে ডিমগুলো তুলে নিন। ওই পাত্রেই আরেকটু বেশি তেল দিয়ে তেজপাতা, গোটা জিরে, লবঙ্গ, ঝিরিঝিরি করে কুচোনো পেঁয়াজ দিয়ে নাড়াচাড়া করে নিন সোনালি রং ধরা পর্যন্ত। আদা-রসুন বাটা, চেরা কাঁচালঙ্কা এবং টোম্যাটো বাটা যোগ করে মিনিট পাঁচেক রান্না করুন। এরপরে হলুদ, ধনে, লঙ্কা গুঁড়ো এবং নুন-মিষ্টি এবং এক কাপ জল ভাল করে মিশিয়ে নিয়ে লো হিটে (৬০০ ওয়াট) ৫-১০ মিনিট রান্না করুন। সবশেষে ভেজে রাখা ডিম ও গরম মশলা মিশিয়ে ঢাকা দিন। লো হিটে ২-৩ মিনিট রান্না করলেই ডিমের ঝোল তৈরি। বাড়তি সুস্বাদ পেতে উপর থেকে তাজা ধনেপাতার কুচি ও কসুরি মেথি ছড়িয়ে দিতে পারেন।
রুটি – রুটি করে নিতে পারেন ইন্ডাকশনেও। আটা মেখে, লেচি কেটে, বেলে নিন আগে। তার পরে ইন্ডাকশনের উপযোগী তাওয়া আগে মিডিয়াম হাই হিটে (১০০০-১২০০ ওয়াট) ২-৩ মিনিট গরম করে নিন। তার পরে এক এক করে তাতে বেলে রাখা রুটি দিয়ে দু’পিঠ ভাল করে সেঁকে নিন। পরিষ্কার কাপড় দিয়ে ধারগুলো একটু চেপে চেপে দিলে রুটি ফুলে উঠবে।
রোজকার রান্না আপাতত তাহলে চালিয়ে নিতে পারেন ইন্ডাকশন বা মাইক্রোওয়েভেই। গ্যাসের জোগান ও সরবরাহ ঘিরে এই বিপত্তির পরিস্থিতিতে এইটুকুই হোক স্বস্তির আশ্বাস। কী বলেন?















