বড়পর্দায় রণবীর সিং-এর ‘ধুরন্ধর’ অবতার দেখে অনেকেরই মনে হতে পারে, স্পাই হওয়া মানেই হয়তো টানটান অ্যাকশন আর হাই-টেক গ্যাজেট। কিন্তু বাস্তবের গোয়েন্দা দুনিয়া অনেকটা দাবার বোর্ডের মতো, যেখানে গায়ের জোরের চেয়ে মগজাস্ত্রের পাশাপাশি মনস্তাত্ত্বিক লড়াই আসল অস্ত্র। আর অবশ্যই ধৈর্য। ভারতের সবচেয়ে রহস্যময় সংস্থা 'র' (RAW) আসলে কীভাবে তাদের অপরেটিভদের বেছে নেয়? সম্প্রতি প্রাক্তন গোয়েন্দা লাকি বিস্তের কিছু বিস্ফোরক তথ্যে সামনে এল সেই অজানা দুনিয়া।
আপনার ‘র’ কে (RAW) খোঁজার প্রয়োজন নেই, ‘র’ -ই আপনাকে খুঁজে নেবে
সবচেয়ে বড় সত্যিটা হল, ‘র’-তে যোগ দেওয়ার জন্য কোনো বিজ্ঞাপন বা অনলাইন ফর্ম নেই। লাকি বিস্তের ভাষায়, "আমি নিজেও জানতাম না যে আমাকে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।" সাধারণত ভারতীয় সেনাবাহিনী, আধাসামরিক বাহিনী বা ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো (IB)-তে কর্মরতদের মধ্য থেকেই তীক্ষ্ণ মেধার অফিসারদের বেছে নেওয়া হয়। অর্থাৎ, আপনার দক্ষতা আর পারফরম্যান্সই আপনার অজান্তে আপনাকে এই সংস্থার নজরে নিয়ে আসে।
অনেকেই ভাবেন শুধু সেনাবাহিনী থেকেই এখানে আসা যায়। কিন্তু তথ্য বলছে, রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস সার্ভিস RAS(Research and Analysis Service) ক্যাডারের মাধ্যমেও নিয়োগ হয়। সরাসরি ইউপিএসসি (UPSC) পরীক্ষা দিয়ে যারা আইএএস (IAS) বা আইপিএস (IPS) হন, তাদের মধ্য থেকেও মেধাবী এবং বিশেষ দক্ষতা সম্পন্ন অফিসারদের ডেপুটেশনে নেওয়া হয়। এক্ষেত্রে যাদের ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস, মনস্তত্ব বা বিদেশি ভাষায় পারদর্শী, তাঁরা অগ্রাধিকার পান
ইন্টারভিউ না কি গোলকধাঁধা?
ভাবুন তো, আপনাকে জিজ্ঞাসা করা হচ্ছে, “আপনি রুটি না কি ভাত খেতে পছন্দ করেন?”, “প্রচণ্ড রেগে যান?” অথবা “রাস্তায় কেউ আপনার স্ত্রীর হাত ধরলে আপনি তৎক্ষণাৎ কী করবেন?” আপাতদৃষ্টিতে এই প্রশ্নগুলো অদ্ভুত মনে হলেও, এর পেছনে থাকে গভীর মনস্তাত্ত্বিক চাল। ৫00-র বেশি এমন এলোমেলো প্রশ্নের মাধ্যমে আপনার রাগের ওপর নিয়ন্ত্রণ, উপস্থিত বুদ্ধি এবং সবচেয়ে বড় কথা আপনার ‘কনসিস্টেন্সি’ বা চারিত্রিক ধারাবাহিকতা পরীক্ষা করা হয়। আপনি বানিয়ে উত্তর দিচ্ছেন কি না, তা ধরে ফেলার জন্য একই প্রশ্ন কয়েক ঘণ্টা পর ঘুরিয়ে করা হয়। সহজ কথায়, ‘র’-এর সিলেকশন প্রসেসে কোনও প্রথাগত ইন্টারভিউ হয় না। সেখানে ক্যান্ডিডেটকে বসিয়ে রাখা হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। উদ্দেশ্য? শারীরিকভাবে নয়, তাঁকে মানসিকভাবে ক্লান্ত করা। এই ইন্টারভিউতে যদি শুরুতে কেউ বলেন "আমি খুব শান্ত স্বভাবের," আর ২০০ নম্বর প্রশ্নের পর কোনও উস্কানিমূলক পরিস্থিতিতে রেগে যান, তবে সেখানেই তাঁর সফর শেষ।
এজেন্ট হতে পারেন ‘যেকোনও কেউ’
একজন তুখোড় গোয়েন্দার সবচেয়ে বড় গুণ হলো তার ছদ্মবেশ। এটি কেবল দাড়ি-গোঁফ লাগানো নয়, বরং ব্যক্তিত্বের আমূল পরিবর্তন। লাকি বিস্ত জানাচ্ছেন, একজন এজেন্টকে যেমন একজন বিজনেস টাইকুনের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কথা বলতে হয়, তেমনই প্রয়োজনে অটোচালকের বেশে ভিড়ে মিশে যেতে হয়। এই 'অ্যাডাপ্টিভ আইডেন্টিটি' বা গিরগিটির মতো রূপ পরিবর্তনের ক্ষমতাই একজন সাধারণ মানুষের থেকে একজন স্পাইকে আলাদা করে।
সাহস নয়, সততাই শেষ কথা
পেশিবহুল শরীর বা অকুতোভয় সাহস থাকলেই কি ‘র’-তে যোগ দেওয়া যায়? স্পষ্ট উত্তর হল—না। সংস্থার কাছে বীরত্বের চেয়েও দামি হল 'ইন্টিগ্রিটি' বা সততা। লাকি বিস্তের মতে, "সাহস কয়েক মাসে তৈরি করা যায়, কিন্তু চরিত্র নয়।" দেশের গোপন তথ্য যাঁর হাতে থাকবে, তাঁর সততা নিয়ে বিন্দুমাত্র সংশয় থাকলে এই দরজায় তাঁর প্রবেশ নিষেধ।
রুপোলি পর্দার স্পাইরা হয়তো হাততালি কুড়োন, কিন্তু বাস্তবের স্পাইরা কাজ করেন লোকচক্ষুর আড়ালে, সম্পূর্ণ নিঃশব্দে। তাঁদের কোনও গ্ল্যামার নেই, জোটে না কোনও মানুষের হাততালি। তাঁদের হৃদয়ে শুধু আছে দেশের প্রতি নিঃস্বার্থ দায়বদ্ধতা। সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হল, একজন গোয়েন্দা যদি বিদেশের মাটিতে ধরা পড়েন, তবে সরকার সরকারিভাবে তাঁর দায়ভার গ্রহণ করে না। তাঁর কোনো মেডেল নেই, কোনও পাবলিক স্যালুট নেই। এই যে নিজের পরিচয় বিসর্জন দিয়ে দেশের জন্য কাজ করা—এটাই হলো ‘র’-এর আসল পরিচয়।
তাই মনে রাখবেন, আপনি যদি মনে করেন আপনি স্পাই হওয়ার যোগ্য, তবে হয়তো সিস্টেম ইতিমধ্যেই আপনার ওপর নজর রাখতে শুরু করেছে!
