আজকাল ওয়েবডেস্ক: ব্যক্তি স্বাধীনতা বনাম সামাজিক সম্ভ্রম। এই দ্বন্দ্ব নতুন নয়। দেশ-কাল বদলে গেলেও এই বিতর্ক চলতেই থাকে। তেমনই এক বিতর্ক তৈরি হয়েছে প্রতিবেশী দেশ চীনে। বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু ‘বেজিং বিকিনি’!
চীনেও গরম কাল অত্যন্ত উষ্ণ। আর এহেন গরমে চীনের রাস্তাঘাটে দেখা যায় অত্যন্ত পরিচিত একটি দৃশ্য। প্রকাশ্যেই জামা কিংবা টি-শার্ট পেটের ওপর রোল করে তুলে ঘুরে বেড়াচ্ছেন পুরুষরা। যুবক থেকে প্রৌঢ় বাদ যাচ্ছেন না কেউই। জামা গুটিয়ে ভুঁড়ি বার করে ঘোরার এই অদ্ভুত ট্রেন্ডকেই বলা হয় ‘বেজিং বিকিনি’। ভাবছেন এ আর এমন কী? ভারতেও তো এই দৃশ্য অহরহ দেখা যায়। কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়। এই ট্রেন্ড নিয়ে বেশ ক্ষুব্ধ চীনা প্রশাসন। এমনকী একে ‘অসভ্য আচরণ’ বলে দাগিয়ে দিয়ে একাধিক শহরে জারি হয়েছে নিষেধাজ্ঞা। শুরু হয়েছে জনসচেতনতা অভিযান, করা হচ্ছে জরিমানাও।
আরও পড়ুন: ‘ধরবে নাকি?’ পুরুষাঙ্গ দেখিয়ে কুপ্রস্তাব দেন প্রযোজক! টাকার বিনিময়ে সঙ্গমও করেন কামসূত্রের নায়িকা?
গ্রীষ্মের তাপমাত্রা যখন ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়, তখন শরীর ঠান্ডা রাখতে টিশার্ট গুটিয়ে নাভির উপরে তুলে রেখে হাঁটাহাঁটি করেন অনেকেই। কেবল গ্রামের চৌরাস্তা নয়, শহরের শপিং মল, পার্ক, এমনকি অফিসপাড়া বা হোটেলের সামনেও দেখা যায় এই চিত্র। অনেকের মতে, এটা পুরোনো অভ্যাস। যাকে এক ধরনের ‘লোকায়ত জীবনধারা’ বলা চলে। তবে এখানেই শেষ নয় চীনের একাধিক অঞ্চলে স্থানীয়রা মনে করেন, শরীরের ‘কী’ বা অভ্যন্তরীণ শক্তির চলাচল ঠিক রাখতে পেট খোলা রাখা দরকার গরমে।
আরও পড়ুন: অতিরিক্ত বীর্যপাতে মৃত্যু! শুক্রাণু দান করার নেশায় ডাক্তারি পড়ুয়ার করুণ পরিণতি জানলে চোখে জল আসবে
সরকার হঠাৎ কেন এর বিরোধী?
আগে মনে করা হত, চীনের কমিউনিস্ট সরকার বন্দুকের জোরেই ক্ষমতায় টিকে আছে। কিন্তু সমাজমাধ্যমের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে দেখা যাচ্ছে, এই ধারণা সর্বাত্মক সত্যি নয়। বরং কী খাবেন, কী পড়বেন, এই সব ব্যাপারে তৃণমূল স্তরে চীনের সরকার একেবারেই নাক গলায় না। তাহলে বেজিং বিকিনি নিয়ে এত আপত্তি কেন? চীনের বিভিন্ন সংবাদসংস্থার খবর অনুযায়ী, প্রশাসনের একটি বড় অংশ মনে করে এই ট্রেন্ড বাইরের দুনিয়ার কাছে অসভ্যতা মনে হতে পারে। বিশেষ করে বেজিং, সাংহাই, গুয়াংঝাও প্রভৃতি বড় শহরগুলিকে চীন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কেন্দ্র হিসাবে দেখে। সেখানে এই ট্রেন্ড চোখে লাগে। চীনের জিনান, হান্ডান, তিয়েনচিন ও এমনকি বেজিং শহরেও প্রশাসন এই পোশাকচিত্রকে ‘সিটি ইমেজ’-এর পরিপন্থী বলে মনে করছে। জিনান শহরের প্রশাসন ২০১৯ সালেই জানিয়ে দেয়, প্রকাশ্যে খালি গায়ে ঘোরাঘুরি করা গণ-শৃঙ্খলার লঙ্ঘন বলে ধরা হবে। তিয়েনচিনে তো এই অপরাধে এক ব্যক্তিকে জরিমানাও করা হয়।
তবে বিষয়টি নিয়ে সরকার যে খুব বাড়াবাড়ি করছেন এমন নয়। কোথাও কোথাও পোস্টার লাগিয়ে জনসচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। যেমন হান্ডান শহরে লাগানো এক সরকারি পোস্টারে লেখা হয়, “পেট খোলা রাখা দৃষ্টিকটু। দয়া করে সম্মানজনক পোশাক পরুন।” সামাজিক মাধ্যমে এই উদ্যোগ ঘিরে হাস্যরসও কম হয়নি। কেউ লিখেছেন, “গরমে হাঁপিয়ে উঠেছি। আমার টিশার্টে সরকারের কী আপত্তি?” আবার কেউ বলেছেন, “এই ধরনের পোশাক আচরণ আধুনিক চীনের সঙ্গে মানানসই নয়।”
বিশেষজ্ঞরা অবশ্য বলছেন, শাস্তির চেয়ে জরুরি সামাজিক শিক্ষা। চাইনিজ অ্যাকাডেমি অফ সোশ্যাল সায়েন্সেস-এর অধ্যাপক চেন তাও বলেছেন, “একটা বয়সে পুরনো অভ্যাস বদলানো কঠিন। তাই জরিমানা নয়, মানুষকে সচেতন করাই প্রশাসনের প্রধান কাজ হওয়া উচিত।”
অন্যদিকে প্রশাসনিক কর্তাদের মতে, করোনা-পরবর্তী সময়ে স্বাস্থ্যবিধি, পরিচ্ছন্নতা ও সামাজিক আচরণের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সে দিক থেকে ‘বেজিং বিকিনি’ বড়ই বেমানান। প্রশাসনের মতে, আধুনিক শহরের সৌন্দর্য রক্ষায় ব্যক্তিগত পোশাকচর্চার ওপরও নিয়ন্ত্রণ জরুরি। ফলে প্রশ্ন উঠছে, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা আর সামাজিক সৌজন্যের মধ্যে ভারসাম্য থাকবে কীভাবে? এই গরমে কি বেজিং শহরের পেট-খোলা ‘দাদারা’ আরও কিছুদিন হাঁটাহাঁটি করতে পারবেন, না কি শহরজুড়ে জারি হবে নিষেধাজ্ঞার শিকল? উত্তর দেবে সময়ই।
