গোপাল সাহা

ছোট ছোট হাতে পায়ে খেলাধুলোর মধ্যে দিয়ে শৈশব শুরু। বাকিদের মতো মৌশ্রীর জীবনের শুরুটা ছিল স্বাভাবিক। এক দুরারোগ্য অসুখ শৈশবেই কেড়ে নিয়েছে চোখের আলো। মাত্র ৬ বছর বয়স থেকে তাঁর দৃষ্টি আবছা হতে শুরু করে। এরপর সম্পূর্ণ দৃষ্টি হারিয়ে যা মাত্র ১৮ বছর বয়সে। তবুও হার মানেনি মনোবল। অদম্য ইচ্ছাশক্তি, কঠোর পরিশ্রম আর লড়াইয়েরকে সঙ্গী করেই সমাজে নিজের জায়গা পাকা করেছেন অধ্যাপিকা ডঃ মৌশ্রী বশিষ্ঠ। আজ তিনি শুধু একজন সফল আইন কলেজের অধ্যাপিকাই নন, হাজারও মানুষের কাছে এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা।

১৯৮২ সালের জুন মাসে হাওড়া জেলার সালকিয়া এলাকায় জন্ম মৌশ্রীর। সুস্থ, স্বাভাবিক শৈশব হঠাৎই বদলে যায় মাত্র ৬ বছর বয়সে। চোখের এক গভীর অসুখ ধরা পড়ে, ধীরে ধীরে ঝাপসা হতে থাকে চারপাশের পৃথিবী। বহু চিকিৎসা, দেশ-বিদেশে হাজারও চেষ্টাতেও কোনও সদুত্তর মেলেনি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টিশক্তিও ক্রমশ ক্ষয় হতে থাকে। অবশেষে ২০-এর কোঠায় পৌঁছনোর আগেই সম্পূর্ণ দৃষ্টিহীন হয়ে পড়েন তিনি। তবে এখানেই থেমে যাননি মৌশ্রী। 

হাওড়ার একটি বাংলা মাধ্যম স্কুল থেকেই পড়াশোনা শুরু। কোনও দৃষ্টিহীন বিদ্যালয়ে নয়। পড়াশোনা তাঁর সাধারণ স্কুলেই, আর পাঁচ জন ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে। ১৯৯৭ সালে মাধ্যমিক, ১৯৯৯ সালে উচ্চমাধ্যমিক। দৃষ্টিশক্তি তখন প্রায় ৮০-৯০ শতাংশ নষ্ট। পরীক্ষার ফলে তার প্রভাব পড়েনি। এরপরেই পুরোপুরি দৃষ্টি চলে যায় মৌশ্রীর। স্কুল-কলেজে বিশেষ কোনও সহযোগিতা পাননি। বাবার গোঁড়া মানসিকতার কারণে দীর্ঘদিন কোনও প্রতিবন্ধী সার্টিফিকেটও ছিল না। ফলে পরীক্ষার সময় একাধিক সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছে তাঁকে। পরীক্ষার সময় একজন সহকারী প্রশ্ন পড়ে শোনাতেন, মৌশ্রী উত্তর লিখতেন পরীক্ষার খাতায়। পড়াশোনার জন্য নিজেই তৈরি করেছিলেন নিজের পদ্ধতি— সাদা খাতায় স্কেল দিয়ে রুল টেনে লেখা, রেকর্ড করে পড়া শুনে মুখস্থ করা। 

মৌশ্রীর কথায়, “বেদ যেমন ‘শ্রুতি’, আমার জীবন যা অঙ্গাঙ্গি ভাবে জড়িত— শুনেই পড়াশোনা করেছি সবটা।”

সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে ২০০৩ সালে হাওড়ার বিজয় কৃষ্ণ গার্লস কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে স্নাতক হন। এরপর বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর। এই সময়ে কলেজের এক অধ্যাপক ও আজকাল পত্রিকার বরিষ্ঠ সাংবাদিক তাঁর পাশে দাঁড়ান। মৌশ্রী অকপটে স্বীকার করেন, “তিনি না থাকলে হয়তো আজকের এই পথটা আরও অনেক কঠিন হত।”

২০০৭ সালে কিছু দিন কাজ করেন রেডিও জকি হিসেবে, অনুষ্ঠান করেন আকাশবাণী কলকাতায়। সমাজের সঙ্গে সংযোগ কখনও ছিন্ন করেননি। বিতর্ক সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, রেডিও, টিভি, গানবাজনা- সব জায়গায় ছিল তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি। ২০০৯ সালে আইন নিয়ে স্নাতকোত্তর, পরে পুনরায় সমাজসেবা নিয়েও স্নাতকোত্তর (এমএ) ডিগ্রি। উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় ও একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যুগ্ম স্নাতকোত্তর করেন। অবশেষে ২০১৭ সালে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল ‘পশ্চিমবঙ্গে গৃহপরিচারিকাদের সম্মানের অধিকার’ (Right to dignity of the woman with special reference to democratic workers in West Bengal; a critical studies)। তিনি বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের প্রথম দৃষ্টিহীন মহিলা পিএইচডি হোল্ডার।

কর্মজীবন শুরু ২০১০ সালে থেকেই শুরু। প্রথমে কিংসটোন ল’ কলেজে সহকারি অধ্যাপিকা (ওয়েস্ট বেঙ্গল স্টেট ইউনিভার্সিটি), পরে কলকাতা পুলিশ ল’ ইনস্টিটিউট-এ অধ্যাপিকা ছিলেন বেশ কয়েক বছর। এরপর সাউথ ক্যালকাটা ল’ কলেজে অধ্যাপিকা হিসেবে যুক্ত হন। ২০১৯ সালের আগস্ট থেকে সেখানেই কর্মরত রয়েছেন মৌশ্রী।

দৃষ্টিহীন হয়ে বহু প্রতিকূলতার মাঝে তাঁর জীবনের সাফল্য বহু মানুষকে উৎসাহিত করে। ২০১৪ সালে তিনি রাষ্ট্রপতি পুরষ্কার। ২০১৫, ২০১৬ পরপর একাধিক রাজ্য ও জাতীয় স্তরের সম্মান পান। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতেও পুরস্কৃত হয়েছেন তিনি। দৃষ্টিহীন হয়েও তাঁর লড়াই কোন অংশে যেমন কম ছিল না। 

মৌশ্রীর জীবন প্রমাণ করে— দৃষ্টি হারালেই জীবন থেমে যায় না। বরং দৃঢ় সংকল্প, নিষ্ঠা আর নিরন্তর পরিশ্রম থাকলে অন্ধকার ভেদ করেই আলোর পথ তৈরি করা যায়। অধ্যাপিকা ডঃ মৌশ্রী বশিষ্ঠ সেই পথের দিশারি।