গোপাল সাহা: রাজ্যে 'বিশেষ নিবিড় সংশোধন' (SIR) প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পরেই রাজ্য জুড়েই নজরে এসেছে আতঙ্কে চিত্র, যেন মৃত্যুর বদ্ধভূমি। শহর কলকাতা সহ বেশ কিছু জেলাগুলিতে কান্নার রোল আর পরিবারের আর্তনাদ নির্বাচন কমিশনকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। বিবেকহীন নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে রাজ্যে শাসকদল। আর তারপরেই এই বিষয়ে বিশেষ নিবিড় সংশোধন-এর কারণে মৃত্যুর অভিযোগকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক শাসকবিরোধী তরজার সুর চরেছে সপ্তমে। পাশাপাশি উত্তপ্ত হয়ে বিক্ষোভে উত্তাল হয়েছে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক দপ্তরের চত্বর। যদিও এই প্রসঙ্গে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক দপ্তর বিষয়টিকে কোনওরকম আমল না দিয়ে, এসআইআর প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হচ্ছে বলে দাবি করেছে। 

একইসঙ্গে বিএলও আধিকারিকদের মৃত্যু নিয়েও 'হ্যালোসিনেশন' মন্তব্য পর্যন্ত উঠে এসছে মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক দপ্তর থেকে। তথাপি বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া চলেছে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ মতোই। পাশাপাশি নতুন করে নিয়োগ পর্যন্ত হয়েছে ইলেক্টোরাল রোল অবজারভার সুব্রত গুপ্ত সহ আরও ১২ জন আধিকারিকদের। ছাঁকনির ভূমিকায়, পূর্ণমাত্রায় স্বচ্ছতা আনতে। যদিও এই প্রক্রিয়া শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেই, অন্য বাকি রাজ্যগুলিতে 'ইলেক্টোরাল রোল  অবজারভার' এখনও পর্যন্ত নিয়োগ করা হয়নি বলেই জানা যাচ্ছে।

বলা বাহুল্য, রাজ্যের ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় একাধিক অসঙ্গতি ধরা পড়ায় জেলা নির্বাচন আধিকারিক (DEO) ও ERO-দের প্রতি সরাসরি কড়া বার্তা দিলেন রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ আগরওয়াল (IAS)। স্পষ্ট নির্দেশ— “কোনও অবস্থাতেই মৃত ভোটারের নাম ডিজিটালে আপলোড করা যাবে না।”

ভিডিও কনফারেন্সে রাজ্যের সমস্ত জেলাকে সতর্ক করে তিনি জানান, 'মৃত ভোটারদের নাম তালিকা থেকে তুলতে দেরি কেন হচ্ছে, তারও জবাবদিহি চাই।' ভোটার তালিকার প্রতিটি তথ্য হুবহু সঠিকভাবে তোলা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। কোনও গাফিলতি বরদাস্ত করা হবে না বলেই সাফ জানিয়ে দিয়েছেন মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক।

সারাদিন ধরে ম্যারাথন বৈঠক— সামনে এল গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান

আজ সকাল থেকে শুরু হয়ে পর্যায়ক্রমে একাধিক বৈঠক চলে নতুন করে ইলেক্টোরাল রোল-এ নিয়োজিত রাজ্যে আধিকারিকদের নিয়ে। উপস্থিত ছিলেন ইলেক্টোরাল রোল অবজারভার সুব্রত গুপ্ত সহ আরও ১২ জন IAS আধিকারিক। এদিনের এই বৈঠকে মূলত আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল, কীভাবে নতুন ভাবে ECI দ্বারা নিয়োজিত ইলেক্টোরাল রোল অবজারভার আধিকারিকরা তাঁদের নিজের জেলায় কাজ করবেন এবং কীভাবে জেলা পরিদর্শন ও ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ করবেন।
এই বৈঠক শেষে পরবর্তীতে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে যোগ দেন প্রতিটি জেলার DEO ও ERO- আধিকারিকরা। যেখানে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গে নতুন করে সদ্য নিয়োগ হওয়া সুব্রত গুপ্ত সহ ১২ জন ইলেক্টোরাল রোল অবজারভার আধিকারিকরা। 

বৈঠকে উঠে আসে এসআইআর (Special Intensive Revision) প্রক্রিয়ার নানা সমস্যা এবং পিছিয়ে থাকা বিভিন্ন জেলার চিত্র। বিশেষত, মৃত ভোটারদের নাম ডিজিটালে আপলোড না করার কঠোর নির্দেশ আবারও পুনরাবৃত্তি করা হয়।

চমকে দেওয়া পরিসংখ্যান, মৃত ভোটারই ১৮ লক্ষ ৭০ হাজার! এছাড়াও ডুপ্লিকেট বা জাল ভোটার কোনওভাবেই যাতে নাম নথিভুক্ত না হয়। তার জন্য করা নজরদারি রাখতে হবে দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক ডিইও এবং 'ই আরও' আধিকারিকদের। অন্যথায় কঠিন ব্যবস্থা নেওয়া হবে তাঁদের বিরুদ্ধে। 
এছাড়াও, BLO আধিকারিকদের ৪ ডিসেম্বরের পর যাঁরা সঠিকভাবে কাজ করবেন, তাঁদেরকে শংসাপত্র প্রদান করতে হবে। যার মূল কারণ তাদের সংশ্লিষ্ট সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে কোনওরকম সমস্যা না হয় আগামীতে।

সন্ধ্যা ছ'টা পর্যন্ত রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক দপ্তরের দেওয়া রিপোর্ট অনুযায়ী—

* মৃত ভোটার: ১৮,৭০,০০০

* খুঁজে পাওয়া যায়নি: ৩,৮০,০০০

* স্থানান্তরিত: ১১,৮২,০০০

* ডুপ্লিকেট(ডবল নাম) : ৭৭,৫৫৬

* মোট নাম না ওঠা (চিহ্নিত): ৩৫,২৩,৮০০

* বর্তমানে ডিজিটাল আপলোড হয়েছে ৬ কোটি ৭৮ লক্ষ নাম।

রাজ্যের মোট ভোটার সংখ্যা ৭ কোটি ৬৬ লক্ষ, যার মধ্যে ৮৮.৫০% ইতিমধ্যেই ডিজিটাল তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যাদের এনুমারেশান ফর্ম পূরণ হয়েছে সেই ভিত্তিতে।
বিশেষ উদ্বেগের বিষয়— উত্তর ও দক্ষিণ কলকাতায় মৃত ভোটারের সংখ্যা ৬ শতাংশেরও বেশি বলেই জানা গেছে সিইও দপ্তর সূত্রে। 

উল্লেখযোগ্য ভাবে বলা যেতে পারে, যে সমস্ত এলাকাগুলিতে বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক উঠেছিল এবং আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল সেই সমস্ত এলাকাগুলি মূলত মুর্শিদাবাদ, নদিয়া, বহরমপুর, মালদহ এলাকাগুলিতে সিংহভাগ এনুমারেশন ফর্ম বিতরণ ও ডিজিটাল নথিভূক্তকরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে পড়েছে বনগাঁ এবং কলকাতা চত্বর। যা নিয়ে কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল বিজেপির। কারণ দু'টি এলাকাতেই বিজেপির ভোটার সিংহভাগ। উল্লেখযোগ্যভাবে মতুয়া ভোটার সিংহভাগ যেমন বিজেপির ঝুলিতে, পাশাপাশি গোটা কলকাতাতেও ভোটারের সিংহভাগ বিজেপির। যা পূর্বের নির্বাচনের চিত্রটা দেখলেই স্পষ্ট করে দেয়।

নির্বাচনী দপ্তরের নিরাপত্তা নিয়ে বাড়তি সতর্কতা, তিনস্তরের পুলিশি ঘেরাটোপ

সিইও দপ্তরের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক জানান, "সুরক্ষার দায়িত্ব রাজ্যের। প্রয়োজনে রাজ্য চাইলে কেন্দ্রীয় বাহিনী পাঠানো হবে। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে জাতীয় নির্বাচন কমিশন।"
এরইমধ্যে কলকাতা পুলিশ নির্বাচনী ভবনের নিরাপত্তা আরও জোরদার করেছে।

বর্তমানে রয়েছে ত্রিস্তরীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা—

* নির্বাচনী ভবনের চারপাশে ব্যারিকেড ও কড়া নজরদারি

* নির্দিষ্ট সময়ের আগে মিডিয়া প্রবেশ নিষিদ্ধ

* সমগ্র এলাকা জুড়ে ক্লকওয়াইস পুলিশি মোতায়েন

* ‘BLO আন্দোলন’ স্থানের চারদিকে বিশেষ বেষ্টনী

এলাকাটি ১৪৪ ধারার নিকটবর্তী হওয়ায় এবং সম্প্রতি ‘BLO’ কর্মীদের ৩০ ঘণ্টার আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে সুরক্ষা আরও শক্ত করা হয়েছে। এমনকী সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদেরও সন্ধ্যে পাঁচটার পূর্বে প্রবেশ নিষেধ করে দেওয়া হয়েছে।
যদিও নজরে এসেছে— নির্বাচনী দপ্তরের সুরক্ষায় কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপস্থিতি নেই। 
নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা সংশোধনে রাজ্য জুড়ে যে বিশাল অসঙ্গতি উঠে এসেছে, তা নিয়ে রাজ্য প্রশাসনের কড়া অবস্থান স্পষ্ট। মৃত ভোটারের নাম আপলোড, ডুপ্লিকেট তথ্য অথবা খুঁজে না পাওয়া ভোটার— সবকিছুতেই অতিরিক্ত সতর্কতা চাইছে কমিশন।
রাজ্যের ভোটার তালিকা স্বচ্ছ ও নিখুঁত করতে আজকের এই ম্যারাথন বৈঠক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে প্রশাসনিক মহল।