আজকাল ওয়েবডেস্ক: পশ্চিমবঙ্গের চিকিৎসা ব্যবস্থায় আবার চমক। এক বিরল রোগের চিকিৎসার সাফল্যের সাক্ষী থাকল কলকাতা। নীলরতন সরকার (এনআরএস) মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের নিউরোসার্জারি, অ্যানাস্থেশিয়া ও কার্ডিওথোরাসিক ভাসকুলার সার্জারি বিভাগের সমন্বিত প্রচেষ্টায় শুক্রবার সম্পন্ন হল দীর্ঘ নয় ঘণ্টার এক অত্যন্ত জটিল অস্ত্রোপচার। এর ফলে নতুন আশার আলো দেখল ১৩ বছরের এক নাবালিকা। যে শিরদাঁড়ার যক্ষ্মাজনিত গুরুতর সমস্যায় কার্যত চলাফেরার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিল।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, ১৩ বছরের নাবালিকা নিউরোসার্জারি বিভাগে ভর্তি হয় টিউবারকুলার কম্প্রেসিভ মায়েলোপ্যাথি নিয়ে। শিরদাঁড়ায় যক্ষ্মার সংক্রমণের কারণে সে ঠিকভাবে হাঁটতে পারছিল না। এমনকি উঠে বসাও ছিল তার কাছে অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। এরপর চিকিৎসকরা বিস্তারিত পরীক্ষা-নিরীক্ষায় জানতে পারেন, বুকের কাছের কশেরুকাগুলির চারপাশে পুঁজ জমে রয়েছে। ডি৬–ডি৭ কশেরুকা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত, স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়ে গিয়েছে।
পরবর্তীতে, পরিস্থিতির গুরুত্ব বিচার করে চিকিৎসকরা সিদ্ধান্ত নেন, প্রচলিত অস্ত্রোপচারের বাইরে গিয়ে একটি জটিল পদ্ধতি অবলম্বন করা হবে। রোগিণীর বাঁ দিকের পাঁজর কেটে ফুসফুস সাময়িকভাবে সরিয়ে জমে থাকা পুঁজ বার করা হবে। পাশাপাশি, শিরদাঁড়াকে আবার স্থিতিশীল করার জন্য টাইটেনিয়ামের স্ক্রু ও রড দিয়ে ফিক্সেশন করতে সুবিধা হবে। যাকে চিকিৎসকদের ভাষায় ‘one long ventilation’ বলা হয়।
এই অস্ত্রোপচারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ ছিল অ্যানাস্থেশিয়া ব্যবস্থাপনা। অ্যানাস্থেশিয়া বিভাগ সিদ্ধান্ত নেয়, সাধারণ এন্ডোট্র্যাকিয়াল টিউবের পরিবর্তে Double Lumen Endotracheal Tube ব্যবহার করা হবে। এর মাধ্যমে প্রয়োজন অনুযায়ী বাঁ দিকের ফুসফুসটি সাময়িকভাবে চুপসে রেখে অস্ত্রোপচার করা সম্ভব হয়। এই আধুনিক ও জটিল পদ্ধতিকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় বলা হয় ‘One Lung Ventilation’।
মাত্র ১৩ বছরের একটি নাবালিকাকে এই অবস্থায় দীর্ঘ সময় স্থিতিশীল রাখা ছিল অত্যন্ত সংবেদনশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। পাশাপাশি, অস্ত্রোপচারের সময় ও পরবর্তী পর্যায়ে ব্যথা নিয়ন্ত্রণের জন্য দেওয়া হয় Thoracic Epidural Analgesia। যা কষ্ট উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সাহায্য করে। চিকিৎসকদের কথায়, প্রায় ন’ঘণ্টা ধরে চলা এই অস্ত্রোপচার সম্পূর্ণ নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়। অস্ত্রোপচারের পর কিশোরীটি বর্তমানে হেমোডাইনামিক্যালি সম্পূর্ণ স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে। ধীরে ধীরে সুস্থতার পথে এগোচ্ছে।
এই সাফল্যের নেপথ্যে ছিল এক অনবদ্য আন্তঃবিভাগীয় সমন্বয়। নিউরোসার্জারি, অ্যানাস্থেশিয়া এবং কার্ডিওথোরাসিক ভাসকুলার সার্জারি বিভাগের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সম্মিলিত দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাই সম্ভব করে তুলেছে এই বিরল চিকিৎসা সাফল্য। এই অভিযানে নেতৃত্ব দেন নিউরোসার্জারি বিভাগের প্রফেসর ড. পার্থ সারথি দত্ত ও তাঁর বিশেষজ্ঞ দল, অ্যানাস্থেশিয়োলজি বিভাগের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ড. অনিন্দ্য মুখার্জী, অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর ড. কেকা পান্ডে এবং তাঁদের অ্যানাস্থেশিয়া দল।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, এই কেসটি আবারও প্রমাণ করল যে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে মাল্টিডিসিপ্লিনারি অ্যাপ্রোচ বা বহুমুখী বিশেষজ্ঞ দলের যৌথ উদ্যোগ ছাড়া এমন জটিল রোগের সফল চিকিৎসা সম্ভব নয়। এনআরএস মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের এই সাফল্য রাজ্যের সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার ক্ষেত্রেও এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
