আজকাল ওয়েবডেস্ক: শুক্রবার কলকাতা হাইকোর্টের এজলাসে যা ঘটে গেল, তাতে রাজ্য রাজনীতির অন্দরে নতুন করে একটা বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়ে গেল। তৃণমূলের অন্দরের ‘অভিষেক বনাম কল্যাণ’ তরজা কি আসলেই মিটেছে, নাকি মুখে ক্ষোভ প্রশমনের কথা বললেও শ্রীরামপুরের সাংসদ কল্যাণ ব্যানার্জি নিজের পুরনো অবস্থানেই অনড় রয়েছেন? গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালের ২১ জুলাইয়ের সমাবেশকে কেন্দ্র করে আদালত অবমাননার একটি মামলার শুনানি ছিল শুক্রবার। হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে ধর্মতলার রাস্তা আটকে সভা করার অভিযোগে মমতা ব্যানার্জি এবং অভিষেক ব্যানার্জির বিরুদ্ধে এই মামলা দায়ের হয়েছিল।
বিচারপতি অরিজিৎ ব্যানার্জির ডিভিশন বেঞ্চে যখন মামলাটি ওঠে, তখন আইনজীবী কল্যাণ ব্যানার্জি স্পষ্ট জানান যে তিনি কেবল মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির পক্ষেই সওয়াল করতে চান। স্বাভাবিকভাবেই বিচারপতি তখন প্রশ্ন তোলেন, তাহলে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জির হয়ে আদালতে কে দাঁড়াবেন? এই প্রশ্ন শুনে কল্যাণবাবু কিছুটা ইতস্তত করতেই আদালত জানিয়ে দেয়, অভিষেকের পক্ষে কোনও আইনজীবী না থাকলে তো তাঁর বিরুদ্ধে রুল জারি করতে হবে। অথচ মজার বিষয় হল, এই মামলায় ‘অ্যাডভোকেট অন রেকর্ড’ হিসেবে মমতা ও অভিষেক দুজনের হয়েই ওকালতনামা জমা দিয়েছিলেন কল্যাণ ব্যানার্জি।
আদালতের এই ছবি কিন্তু একটা পুরনো ক্ষোভের কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে। দিন কয়েক আগেই কল্যাণবাবু অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে অভিযোগ করেছিলেন, অভিষেকের হয়ে আদালতে সওয়াল করার ঠিক আগের দিন রাতে আচমকা তাঁকে মেসেজ করে আইনজীবী বদলে ফেলার সিদ্ধান্ত জানানো হয়। জুনিয়রের কাছ থেকে আসা এই আচরণে যারপরনাই অপমানিত বোধ করেছিলেন প্রবীণ এই আইনজীবী। প্রকাশ্যেই দলের সেনাপতির বিরুদ্ধে চরম তোপ দেগে তিনি বলেছিলেন, কিসের এত ঔদ্ধত্য! সময় থাকতেও ও শিক্ষা পেল না। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে তিনি ক্যামাক স্ট্রিটের কোনও সাধারণ কর্মী নন এবং দলের বর্তমান পরিণতির জন্য অভিষেককেই দায়ী করেন। পরিস্থিতি এতটাই চরম রূপ নেয় যে নেত্রী মমতা ব্যানার্জির উদ্দেশে তিনি সাফ বলেন, এবার মমতাদিকে বেছে নিতে হবে—হয় আমি, না হয় অভিষেক!
অবশ্য এই বিতর্কের পারদ যখন সপ্তমে, তখন অভিষেক ব্যানার্জি কিন্তু বেশ পরিণত ও নরম সুরেই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছিলেন যে কল্যাণ ব্যানার্জির সম্পূর্ণ অধিকার রয়েছে তাঁকে নিয়ে কথা বলার বা দুটো কটু কথা শোনানোর, কারণ তিনি ছোট থেকে তাঁকে বড় হতে দেখেছেন। অভিষেকের মুখে নিজেকে ‘পিতৃতুল্য’ হিসেবে শোনার পর কল্যাণের রাগ অনেকটাই জল হয়ে গিয়েছিল বলে মনে হয়েছিল। তিনি নিজেও সংবাদমাধ্যমে বলেছিলেন, অভিষেক তাঁর সন্তানের মতো, ভুল স্বীকার করলে সব মাফ করে দেওয়া যায়।
কিন্তু শুক্রবার হাইকোর্টের এজলাসে কল্যাণের এই ভূমিকা রাজনৈতিক মহলে নতুন জল্পনা উস্কে দিল। আপাতদৃষ্টিতে বরফ গলেছে বলে মনে হলেও, কল্যাণ ব্যানার্জি কি ভেতর থেকে সত্যিই অভিষেককে ক্ষমা করতে পেরেছেন? নাকি জেদের বশে এবার সত্যিই অভিষেকের মামলা থেকে পাকাপাকিভাবে নিজেকে সরিয়ে নিচ্ছেন তিনি? আপাতত এই মামলার জল কতদূর গড়ায় সেটাই দেখার। শুক্রবারের শুনানিতে আদালত নির্দেশ দিয়েছে, আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে দুই পক্ষকেই হলফনামা জমা দিতে হবে। পরবর্তী দুই সপ্তাহে মামলাকারী তার জবাব দেওয়ার পর, আগামী ১৭ আগস্ট এই মামলার পরবর্তী শুনানি হবে। তদ্দিনে তৃণমূলের এই অন্দরমহলের সমীকরণ কোন দিকে বাঁক নেয়, সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।















