আজকাল ওয়েবডেস্ক: নিউইয়র্ক সিটির নবনির্বাচিত মেয়র জোহরান মামদানি কারাবন্দি মানবাধিকার কর্মী উমর খালিদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে একটি ব্যক্তিগত চিঠি লেখার পাশাপাশি, মার্কিন কংগ্রেসের আটজন সদস্য ভারত সরকারকে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী খালিদের ন্যায্য ও সময়োপযোগী বিচারের নিশ্চয়তা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এই ঘটনায় উমর খালিদের দীর্ঘদিনের আটক এবং ভারতের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
উমর খালিদ, যিনি দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (জেএনইউ) প্রাক্তন ছাত্র ও পরিচিত মানবাধিকার কর্মী, ২০২০ সালের দিল্লি সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনায় কথিত ষড়যন্ত্রের অভিযোগে প্রায় ছয় বছর ধরে তিহার জেলে বন্দি রয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর সন্ত্রাসবিরোধী আইন ইউএপিএ (Unlawful Activities Prevention Act) প্রয়োগ করা হয়েছে। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এখনও তাঁর বিচার শুরু হয়নি এবং তাঁর জামিনের আবেদন বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন।
নিউইয়র্কের নতুন মেয়র জোহরান মামদানি সম্প্রতি উমর খালিদের উদ্দেশ্যে লেখা একটি চিঠিতে তাঁর প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন। এই চিঠিটি খালিদের বন্ধুদের মাধ্যমে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করা হয়। চিঠিতে মামদানি উল্লেখ করেন যে তিনি খালিদের বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করেছেন এবং তাঁদের সঙ্গে কথোপকথন তাঁর মনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। মামদানি লেখেন, “আমি প্রায়ই আপনার তিক্ততা নিয়ে বলা কথাগুলোর কথা ভাবি, কীভাবে তা যেন নিজের ভিতর ভিতর আমাদের গ্রাস না করে। আপনার বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করে ভালো লেগেছে। আমরা সবাই আপনার কথা ভাবছি।”
এই চিঠিকে খালিদের সমর্থনে আন্তর্জাতিক সংহতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এদিকে, মার্কিন কংগ্রেসের আটজন সদস্য ভারতের মার্কিন রাষ্ট্রদূত বিনয় কোয়াত্রাকে একটি যৌথ চিঠি পাঠিয়ে উমর খালিদের দীর্ঘদিনের আটক নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এই কংগ্রেস সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন ডেমোক্র্যাট নেতা জিম ম্যাকগভর্ন যিনি হাউস রুলস কমিটির র্যাঙ্কিং মেম্বার এবং টম ল্যান্টোস মানবাধিকার কমিশনের সহ-চেয়ার। তাঁর সঙ্গে চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন কংগ্রেসম্যান জেমি রাস্কিন, সেনেটর ক্রিস ভ্যান হলেন, সেনেটর পিটার ওয়েলচ, কংগ্রেসওম্যান প্রমিলা জয়পাল, কংগ্রেসওম্যান রাশিদা তালিব, কংগ্রেসম্যান জান শাকাওস্কি এবং কংগ্রেসম্যান লয়েড ডগেট।
ডিসেম্বর ২০২৫-এ এই মার্কিন আইন প্রণেতারা উমর খালিদের বাবা-মায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এরপর এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে জিম ম্যাকগভর্ন লেখেন, “এই মাসের শুরুতে আমি উমর খালিদের বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করেছি। উমরকে ভারতে পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিনা বিচারে জেলে রাখা হয়েছে। প্রতিনিধি রাস্কিন এবং আমি আমাদের সহকর্মীদের নিয়ে ভারতের কাছে অনুরোধ জানাচ্ছি, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী তাঁকে জামিন ও ন্যায্য, সময়োপযোগী বিচার দেওয়া হোক।”
ভারতের রাষ্ট্রদূতকে পাঠানো চিঠিতে মার্কিন আইনপ্রণেতারা উল্লেখ করেন, উমর খালিদকে পাঁচ বছর ধরে জামিন ছাড়াই ইউএপিএ আইনে আটক রাখা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের মতে আইনের সামনে সমতা, ন্যায়বিচারের আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। চিঠিতে বলা হয়, “ভারতকে অবশ্যই ব্যক্তির অধিকার রক্ষা করতে হবে যাতে যুক্তিসঙ্গত সময়ের মধ্যে বিচার সম্পন্ন হয় অথবা অভিযুক্তকে মুক্তি দেওয়া হয় এবং দোষ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত নির্দোষ হিসেবে গণ্য করা হয়।”
চিঠিতে আরও অনুরোধ জানানো হয়, উমর খালিদ ও তাঁর সঙ্গে অভিযুক্ত অন্য যাঁরা এখনও আটক রয়েছেন, তাঁদের বিচারপ্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে চলছে কি না, সে বিষয়ে ভারত সরকার কী পদক্ষেপ নিয়েছে তা জানাতে।
মার্কিন আইনপ্রণেতারা তাঁদের চিঠিতে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘদিনের কৌশলগত অংশীদারিত্ব রয়েছে, যার ভিত্তি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সাংবিধানিক শাসনব্যবস্থা এবং জনগণের মধ্যে দৃঢ় সম্পর্ক। বিশ্বের দুটি বৃহত্তম গণতন্ত্র হিসেবে উভয় দেশেরই স্বাধীনতা, আইনের শাসন, মানবাধিকার ও বহুত্ববাদ রক্ষা করার অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে। এই “আত্মার মধ্যেই” তাঁরা উমর খালিদের আটক নিয়ে তাঁদের উদ্বেগ প্রকাশ করছেন বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
চিঠিতে দাবি করা হয়, বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন, আইনি বিশেষজ্ঞ এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম উমর খালিদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, ইউএপিএ-র মতো কঠোর আইনে দীর্ঘদিন বিনা বিচারে আটক রাখা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের পরিপন্থী হতে পারে।
তাঁরা আরও জানান, বিষয়টি বর্তমানে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন এ কথা তাঁরা জানেন এবং খালিদ তাঁর বোনের বিয়েতে যোগ দেওয়ার জন্য অস্থায়ী জামিন পেয়েছিলেন, এই খবরকে তাঁরা স্বাগত জানাচ্ছেন। তবে একই সঙ্গে তাঁরা অনুরোধ করেন, আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত উমর খালিদকে জামিনে মুক্ত রাখা হোক।
উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক সময়ে দিল্লির একটি আদালত উমর খালিদকে ১৬ থেকে ২৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত তাঁর বোনের বিয়েতে যোগ দেওয়ার জন্য অস্থায়ী জামিন দিয়েছিল। সেই সময়সীমা শেষ হওয়ার পর তিনি পুনরায় তিহার জেলে ফিরে যান।
উমর খালিদ বর্তমানে দিল্লি হিংসা মামলায় অভিযুক্ত একাধিক সমাজকর্মী ও অধিকারকর্মীর মধ্যে অন্যতম। তাঁর দীর্ঘদিনের আটক এবং বিচারহীন অবস্থান নিয়ে দেশ-বিদেশে যে বিতর্ক চলছে, জোহরান মামদানির চিঠি ও মার্কিন কংগ্রেস সদস্যদের যৌথ উদ্যোগ সেই বিতর্ককে আরও জোরালো করল বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
