আজকাল ওয়েবডেস্ক: “শরিয়া আইনের আমেরিকায় কোনও জায়গা নেই”- এই মন্তব্য করে গত ২১ ডিসেম্বর তীব্র বিতর্কের সূচনা করেন আলাবামার রিপাবলিকান সিনেটর টমি টিউবারভিল। মন্তব্যটি এমন সময় করা হয় যখন নিউ ইয়র্ক সিটির নবনির্বাচিত মেয়র জোহরান মামদানি কোরান নিয়ে শপথ নেন। এরপরই মার্কিন রাজনীতি ও সোশ্যাল মিডিয়ায় শুরু হয় তুমুল প্রতিক্রিয়া, যেখানে মামদানির ধর্মীয় পরিচয় এবং শপথগ্রহণের পদ্ধতিকে কেন্দ্র করে আক্রমণ শানানো হয়।
জোহরান মামদানি নিউ ইয়র্ক সিটির ইতিহাসে প্রথম মুসলিম মেয়র। আমেরিকার বৃহত্তম শহরের মেয়র হিসেবে এই প্রথম কেউ কোরানে হাত রেখে শপথ নিলেন। এমন এক সময়ে এই ঘটনা ঘটল, যখন যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন, ধর্ম এবং জাতিগত পরিচয় নিয়ে রাজনৈতিক মেরুকরণ তীব্র আকার ধারণ করেছে। ডানপন্থী রাজনীতিক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বরা এই ঘটনাকে “নিউ ইয়র্কের পতন” বলে আখ্যা দেন এবং ইসলামকে যুক্তরাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামোর পরিপন্থী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেন।
সিনেটর টিউবারভিল এক্স-এ পোস্ট করে দাবি করেন, মামদানির “আনুগত্য আমেরিকার প্রতি নয়, ইসলামের প্রতি”। ডানপন্থী সাংবাদিক-ইনফ্লুয়েন্সার অ্যামি মেক লেখেন, “আল্লাহু আকবর, নিউ ইয়র্ক সিটি- আত্মসমর্পণ সম্পূর্ণ।” এমনকি ইউরোপ থেকেও প্রতিক্রিয়া আসে। নেদারল্যান্ডসের কট্টর ডানপন্থী নেতা গিয়ার্ট উইল্ডার্স পোস্ট করেন, “অবৈধ শপথ। যুক্তরাষ্ট্র কোনও ইসলামি রাষ্ট্র নয়।”
আক্রমণ শুধু রিপাবলিকান শিবিরেই সীমাবদ্ধ ছিল না। নিউ ইয়র্কের প্রাক্তন গভর্নর অ্যান্ড্রু কুওমোসহ একাধিক নেতা মামদানির ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এই প্রেক্ষাপটে মামদানি স্পষ্ট করে জানান, তিনি নিজের মুসলিম পরিচয় অস্বীকার করবেন না এবং এই আক্রমণগুলো নিউ ইয়র্কের রাজনীতির গভীরে থাকা ইসলামোফোবিয়ারই প্রতিফলন।
এই বিতর্কের কথা মাথায় রেখেই মামদানির টিম শপথগ্রহণের জন্য একটি বিশেষ কোরান বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের লক্ষ্য ছিল এমন একটি প্রতীক ব্যবহার করা, যা নিউ ইয়র্ক শহরের বহুত্ববাদী ও সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণের ইতিহাসকে তুলে ধরবে। সেই অনুসন্ধানের ফলেই সামনে আসে বিখ্যাত কৃষ্ণাঙ্গ ইতিহাসবিদ ও লেখক আর্তুরো শোমবার্গের সংগ্রহে থাকা একটি কোরান।
নিউ ইয়র্ক পাবলিক লাইব্রেরির মধ্যপ্রাচ্য ও ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের কিউরেটর হিবা আবিদের সহায়তায় মামদানির উপদেষ্টা জারা রহিম এবং তাঁর স্ত্রী রামা দুয়াজি এই কোরানটির সন্ধান পান। আর্তুরো শোমবার্গ নিজে মুসলিম ছিলেন না। তিনি পুয়ের্তো রিকোতে জন্মগ্রহণ করেন, ক্যাথলিক পরিবারে বড় হন এবং পরবর্তীতে এপিসকোপাল চার্চের সদস্য হন। তা সত্ত্বেও, আফ্রিকান ও বিশ্ব ইতিহাসে গভীর আগ্রহের কারণে তিনি কোরান-সহ নানা ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক গ্রন্থ সংগ্রহ করেছিলেন। নিউ ইয়র্ক পাবলিক লাইব্রেরি ১৯২৬ সালে তাঁর প্রায় ৪,০০০ বই ও নিদর্শন অধিগ্রহণ করে।
লাইব্রেরির তথ্য অনুযায়ী, এই কোরানটি কালো ও লাল কালি দিয়ে লেখা, অত্যন্ত সাধারণ নকশার যা ইঙ্গিত করে এটি দৈনন্দিন পাঠের জন্য ব্যবহৃত হত। লিপি ও বাঁধাই বিশ্লেষণ করে ধারণা করা হচ্ছে, এটি উনিশ শতকের অটোমান সিরিয়ায় তৈরি।
মামদানি মোট তিনটি কোরান ব্যবহার করে শপথগ্রহণ করেন। একটি ছিল তাঁর দাদার ব্যক্তিগত কোরান, আরেকটি ছিল এই ঐতিহাসিক শোমবার্গ কোরান। একটি ব্যক্তিগত শপথ অনুষ্ঠান হয় একটি পরিত্যক্ত সাবওয়ে স্টেশনে, যা নিউ ইয়র্কের শ্রমজীবী ও অভিবাসী ইতিহাসের প্রতীক হিসেবেই দেখা হচ্ছে। পরবর্তী জনসমক্ষে শপথগ্রহণের জন্য তিনি তাঁর দাদা-দাদির কোরান ব্যবহারের পরিকল্পনা করেন।
নিউ ইয়র্ক পাবলিক লাইব্রেরির প্রেসিডেন্ট ও সিইও অ্যান্থনি ডব্লিউ মার্ক্স এক বিবৃতিতে জানান, এই মুহূর্তটি শহরের ইতিহাসে তাৎপর্যপূর্ণ এবং লাইব্রেরির কোরান ব্যবহার করে শপথ নেওয়াকে তারা সম্মানের সঙ্গে দেখছেন। জানুয়ারি ৬ থেকে শোমবার্গের এই কোরানটি জনসাধারণের প্রদর্শনের জন্য খুলে দেওয়া হবে।
সব বিতর্ক, কটাক্ষ ও রাজনৈতিক চাপের মধ্যেও শেষ পর্যন্ত মামদানি কোরানেই শপথ নেন। তাঁর শপথগ্রহণ শুধু একজন মুসলিম মেয়রের সূচনা নয়, বরং নিউ ইয়র্ক শহরের বহুত্ববাদী ইতিহাস, অভিবাসী উত্তরাধিকার এবং ধর্মীয় সহাবস্থানের এক শক্তিশালী রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেই তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
