আজকাল ওয়েবডেস্ক: বাংলাদেশের ময়মনসিংহে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে উন্মত্ত মুসলিম জনতা ২৭ বছর বয়সী হিন্দু যুবক দীপু চন্দ্র দাসকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এখানেই না থেমে দীপুর মৃতদেহ প্রকাশ্যে ঝুলিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। পুলিশ পরে জানায়, দীপুর বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাঁর পরিবারের দাবি, ‘ধর্ম অবমাননা’র জন্য নয়, বরং কর্মক্ষেত্রের শত্রুতার জেরেই দীপুকে হত্যা করা হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত এবং পলাতক প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই ঘটনাকে ‘বর্বরোচিত এবং লজ্জাজনক কাজ’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি আরও বলেছেন, এই ঘটনা অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে ‘আইনশৃঙ্খলা ও নৈতিকতার বিপজ্জনক পতনের’ প্রতিফলন।

সর্বভারতীয় সংবাদ মাধ্যম এনডিটিভিকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে হাসিনা বলেন, “ধর্মের নামে হিংসার কোনও স্থান বাংলাদেশে নেই। তবুও এই ধরনের ঘটনা ঘন ঘন ঘটছে। এটি কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না, বরং এটি সাম্প্রদায়িক হিংসার একটি বৃহত্তর অংশ। যা বিস্তার লাভ করতে দেওয়া হয়েছে।”

প্রাক্তন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বর্তমানে ভারতে রয়েছেন। তিনি বলেছেন, “বাংলাদেশ সংখ্যালঘুদের জন্য ক্রমশ বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। কারণ রাষ্ট্র সব নাগরিককে সমানভাবে সুরক্ষা দেওয়ার সবচেয়ে মৌলিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “ধর্মীয় হিংসার এই ভয়াবহ কর্মকাণ্ডের অপরাধীদের বিচার করা হয়নি এবং নির্যাতিতারা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। অথচ ইউনুস নিজে এই কর্মকাণ্ডের নেপথ্যে থাকা ধর্মীয় উদ্দেশ্যকে অস্বীকার করে চলেছেন। নিরাপত্তার এই অবনতি কেবল সংখ্যালঘুদেরই নয়, বরং বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে হুমকির মুখে ফেলছে।”

বাংলাদেশ কি উগ্র ইসলামপন্থী দেশ হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ? এই প্রশ্নের উত্তরে হাসিনা বলেন, “উগ্র ইসলামি চরমপন্থা আর সমাজের প্রান্তিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই। অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যকলাপ ও নিষ্ক্রিয়তার মাধ্যমে এটি বৈধতা পেয়েছে এবং আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।”

তাঁর অভিযোগ, “ইউনূসের অধীনে সাজাপ্রাপ্ত জঙ্গিদের কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে, চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলিকে রাজনৈতিকভাবে প্রাসঙ্গিক করা হয়েছে, এবং সংখ্যালঘু ও নারীদের বিরুদ্ধে হিংসাকে সাধারণ বিষয় করে তোলা হয়েছে।” তিনি বলেন, “এই উগ্রপন্থার ফলে বিনিয়োগ ব্যাহত হবে। পিছিয়ে পড়বে বাংলাদেশ। সবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে দেশ। ইতিহাস সাক্ষী আছে, একবার উগ্রপন্থা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর গভীরে গেঁথে গেলে, তা নির্মূল করা অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়ে।”

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের পক্ষ থেকে বৃহস্পতিবার প্রকাশিত একটি বিবৃতি অনুসারে, শুধু ডিসেম্বর মাসেই সাম্প্রদায়িক হিংসার অন্তত ৫১টি ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ১০টি হত্যাকাণ্ড, ২৩টি লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা, ১০টি ডাকাতি ও চুরির ঘটনা, মিথ্যা ধর্ম অবমাননার অভিযোগে আটক ও নির্যাতনের চারটি ঘটনা, একটি ধর্ষণের চেষ্টা এবং তিনটি শারীরিক হেনস্থার ঘটনা। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়ি, মন্দির এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলিকে পরিকল্পিতভাবে নিশানা করা হয়েছে।

গত ১২ ডিসেম্বর ছাত্রনেতা শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুর পর থেকে বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর হিংসা বৃদ্ধি পেয়েছে। ৪০ বছর বয়সী দোকানি শরৎমণি চক্রবর্তীকে সোমবার রাতে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আক্রমণ করা হয়। সেই আঘাতের কারণে মারা যান। তাঁকে হত্যার কয়েক ঘণ্টা আগে যশোর জেলায় ৪৫ বছর বয়সী রানা প্রতাপকে গুলি করে হত্যা করা হয়। প্রতাপের দেহের পাশে সাতটি গুলির খোল পাওয়া গিয়েছে।

৩ জানুয়ারি ঝিনাইদহ জেলায় এক হিন্দু নারীকে দু’জন ধর্ষণ করে। এর পর নির্যাতিতাকে একটি গাছের সঙ্গে বেঁধে তাঁর চুল কেটে দেওয়া হয়। পুরো ঘটনাটির ভিডিও সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এর কয়েকদিন আগে ৫০ বছর বয়সী খোকন চন্দ্র দাসকে নৃশংসভাবে আক্রমণ করে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। অন্যান্যদের মধ্যে রয়েছেন ভালুকার একটি পোশাক কারখানায় সহকর্মীর হাতে নিহত ৪০ বছর বয়সী বাজেন্দ্র বিশ্বাস, রাজবাড়ীতে চাঁদাবাজির অভিযোগে গণপিটুনির শিকার ২৯ বছর বয়সী অমৃত মণ্ডল এবং দীপু চন্দ্র দাস।