আজকাল ওয়েবডেস্ক: সুইজারল্যান্ডে বিতর্কিত ‘সুইসাইড পড’ ব্যবহার করে আত্মহত্যা করলেন যুক্তরাষ্ট্রের এক ৬৪ বছরের মহিলা। একটি জঙ্গলের নির্জন স্থানে বসানো ছিল ওই ক্যাপসুল আকৃতির যন্ত্রটি। মৃত্যুর আগে যন্ত্রটির স্বয়ংক্রিয় ভয়েস সিস্টেম তাকে শেষবার জিজ্ঞেস করেছিল—“আপনি কি সত্যিই মরতে চান? যদি চান, তবে বোতামটি চাপুন।” তারপরই তিনি বোতামটি চাপেন। ঘটনাটি নতুন করে আন্তর্জাতিক স্তরে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। কারণ, এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে মানুষের মৃত্যু ঘটানোকে ঘিরে আইনি ও নৈতিক প্রশ্ন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
এই যন্ত্রটির নাম Sarco suicide pod। ‘সার্কোফেগাস’ শব্দ থেকে নামটি নেওয়া হয়েছে, যার অর্থ কফিন। এটি মূলত একটি মানবদেহের আকারের ক্যাপসুল, যার ভেতরে ঢুকে একজন ব্যক্তি নিজেই নিজের মৃত্যুর প্রক্রিয়া শুরু করতে পারেন। এই পডটির নকশা তৈরি করেছেন অস্ট্রেলিয়ার চিকিৎসক এবং সহায়তাপ্রাপ্ত মৃত্যুর অধিকার আন্দোলনের অন্যতম মুখ ফিলিপ নিৎসকে। ১৯৯০-এর দশক থেকেই তিনি ইউথেনেশিয়া বা সহায়তাপ্রাপ্ত মৃত্যুর পক্ষে আন্দোলন করে আসছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত সংগঠন Exit International এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত।
কীভাবে কাজ করে এই পড?
সার্কো পডের কাজের পদ্ধতি তুলনামূলকভাবে সহজ কিন্তু অত্যন্ত বিতর্কিত। প্রথমে যে ব্যক্তি এটি ব্যবহার করতে চান তাকে মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা সাইকিয়াট্রিক মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। অনুমোদন পেলে তিনি ক্যাপসুলটির ভিতরে প্রবেশ করেন এবং ঢাকনাটি বন্ধ করেন। তারপর যন্ত্রটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কিছু প্রশ্ন করে—ব্যবহারকারীর পরিচয়, সিদ্ধান্ত সম্পর্কে সচেতনতা ইত্যাদি যাচাই করতে। সবকিছু নিশ্চিত হওয়ার পর ব্যবহারকারী একটি বোতাম চাপলে ভেতরে থাকা তরল নাইট্রোজেন থেকে গ্যাস বের হতে শুরু করে।
এই গ্যাস খুব দ্রুত ক্যাপসুলের ভিতরের অক্সিজেনের মাত্রা কমিয়ে দেয়। সাধারণত বাতাসে অক্সিজেন থাকে প্রায় ২১ শতাংশ। সার্কো পডে বোতাম চাপার পর মাত্র ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে তা কমে প্রায় ০.০৫ শতাংশে নেমে আসে। এর ফলে মানুষ দ্রুত অচেতন হয়ে যায় এবং প্রায় পাঁচ মিনিটের মধ্যে মৃত্যু ঘটে। যন্ত্রটির ভেতরে একটি জরুরি ‘এমারজেন্সি এক্সিট’ বোতামও রাখা থাকে, যাতে শেষ মুহূর্তে চাইলে ব্যবহারকারী প্রক্রিয়া থামাতে পারেন। আরও একটি অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য হলো—মৃত্যুর পর ক্যাপসুলটি যন্ত্রের বেস থেকে আলাদা করে সরাসরি কফিন হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
এই প্রকল্পটি তৈরি করতে প্রায় ১২ বছর সময় লেগেছে এবং গবেষণা ও উন্নয়নে খরচ হয়েছে প্রায় ৬.৫ লক্ষ ইউরো। নেদারল্যান্ডসে এর প্রযুক্তিগত উন্নয়ন করা হয়। যদিও পডটি তৈরি করতে বিপুল খরচ হয়েছে, ব্যবহারকারীর জন্য খরচ খুবই কম। নাইট্রোজেন গ্যাসের জন্য মাত্র ১৮ সুইস ফ্রাঁ দিতে হয়।
এই ঘটনার পর আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে সুইজারল্যান্ডের ইউথেনেশিয়া আইন। দেশটিতে সরাসরি সক্রিয় ইউথেনেশিয়া বা কাউকে হত্যা করে মৃত্যু ঘটানো বেআইনি। তবে সহায়তাপ্রাপ্ত আত্মহত্যা বহু দশক ধরেই নির্দিষ্ট শর্তে অনুমোদিত। আইনের মূল শর্ত হলো—যে ব্যক্তি সহায়তা করছেন, তার যেন ওই মৃত্যুর সঙ্গে কোনও ব্যক্তিগত স্বার্থ না থাকে। তবুও নতুন এই পড প্রযুক্তি সেই আইনি কাঠামোর সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ঘটনার দিনই সুইজারল্যান্ডের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী Elisabeth Baume-Schneider সংসদে বলেন, সার্কো পড এখনও আইনি স্বীকৃতি পায়নি। ফলে এর ব্যবহার নিয়ে সরকার নতুন করে আলোচনা শুরু করতে পারে।
সহায়তাপ্রাপ্ত মৃত্যুর অনুমতি থাকার কারণে দীর্ঘদিন ধরেই সুইজারল্যান্ডকে অনেকেই “ডেথ ট্যুরিজম”-এর কেন্দ্র বলে থাকেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মানুষ সেখানে গিয়ে নিজেদের জীবনের ইতি টানার আইনি সুযোগ খোঁজেন। সার্কো পডের মতো নতুন প্রযুক্তি সেই প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেক বিশেষজ্ঞ।
সমর্থকদের মতে, এই প্রযুক্তি মানুষের নিজের জীবনের উপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেয়। কিন্তু সমালোচকদের দাবি, এটি আত্মহত্যাকে প্রযুক্তিগতভাবে সহজ করে দিয়ে সমাজে বিপজ্জনক বার্তা দিতে পারে। ফলে একদিকে ব্যক্তিস্বাধীনতা, অন্যদিকে নৈতিকতা ও আইনের সীমারেখা—এই দুইয়ের টানাপোড়েনেই এখন বিশ্বজুড়ে ইউথেনেশিয়া বিতর্ক আবারও নতুন করে সামনে এসেছে।
