আজকাল ওয়েবডেস্ক: নতুন বছরের দিনেই ইউক্রেন যুদ্ধের রক্তক্ষয়ী বাস্তবতা ফের সামনে এল। রাশিয়া ও ইউক্রেন একে অপরের বিরুদ্ধে ভয়াবহ হামলার অভিযোগ তুলে তীব্র বাকযুদ্ধে জড়াল, আর সেই সংঘর্ষের সবচেয়ে বড় শিকার হল সাধারণ মানুষ। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উৎসবের দিনেও যুদ্ধের তীব্রতা থামেনি বরং তা আরও বিস্তৃত আকার নিয়েছে।
রাশিয়ার দাবি, ইউক্রেন দক্ষিণ খেরসন অঞ্চলে নববর্ষ উদ্যাপনের ওপর ড্রোন হামলা চালিয়ে অন্তত ২৪ জনকে হত্যা করেছে। রাশিয়া-নিযুক্ত খেরসন প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উপকূলবর্তী খোরলি গ্রামের একটি হোটেল ও ক্যাফেতে ড্রোন আঘাত হানে, যেখানে স্থানীয় বাসিন্দারা নববর্ষ উদ্যাপন করতে জড়ো হয়েছিলেন। নিহতদের মধ্যে একটি শিশুও রয়েছে এবং প্রায় ৫০ জন আহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। মস্কো-নিযুক্ত গভর্নর ভ্লাদিমির সালদো এই হামলাকে “ইচ্ছাকৃত” বলে আখ্যা দিয়ে অভিযোগ করেন, ইউক্রেন পরিকল্পিতভাবে বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করেছে। তাঁর দাবি, আগুন ধরে যাওয়ার পর কয়েকজন মানুষ বাড়ির ভেতরেই পুড়ে মারা যান।
সালদোর প্রকাশিত ছবিতে পোড়া বাড়ি ও মাটিতে রক্তের দাগ দেখা গেলেও, সেগুলির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। ঘটনার পরপরই রাশিয়ার বিদেশ মন্ত্রক একে “সন্ত্রাসবাদী হামলা” ও “যুদ্ধাপরাধ” বলে ঘোষণা করে। বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা অভিযোগ করেন, ইউক্রেনের 'পশ্চিমি মিত্ররাই' এই হামলার “চূড়ান্ত দায়” বহন করছে। রাশিয়ার সংসদের দুই কক্ষের স্পিকার-সহ শীর্ষ রাজনৈতিক নেতারাও তীব্র ভাষায় এই হামলার নিন্দা জানান।
ইউক্রেন অবশ্য এই অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেছে। ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীর এক মুখপাত্র রাশিয়ার সংবাদ সংস্থা ইন্টারফ্যাক্সকে বলেন, কিয়েভ শুধুমাত্র “বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে” আঘাত করে যার মধ্যে জ্বালানি, শক্তি ও প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত স্থাপনা রয়েছে এবং বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করা ইউক্রেনের নীতির অংশ নয়। আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউক্রেনীয় বাহিনী জানিয়েছে, তারা রাশিয়ার ক্রাসনোদার অঞ্চলের ইলস্কি তেল শোধনাগার এবং তাতারস্তানের আলমেতিয়েভস্ক তেল স্থাপনায় রাতভর হামলা চালিয়েছে। এই লক্ষ্যবস্তুগুলি ইউক্রেন-নিয়ন্ত্রিত এলাকা থেকে প্রায় ৯৬৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। হামলার প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি তখনও মূল্যায়ন সাপেক্ষ ছিল।
এদিকে, কিয়েভ সম্পূর্ণ ভিন্ন ছবি তুলে ধরে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানান, নববর্ষের রাতে রাশিয়া ইউক্রেনজুড়ে ২০০-রও বেশি ড্রোন হামলা চালিয়েছে। তাঁর অভিযোগ, ইচ্ছাকৃতভাবে সাতটি অঞ্চলের জ্বালানি পরিকাঠামোকে লক্ষ্য করা হয়েছে। ইউক্রেনের বিমানবাহিনী জানায়, ছোড়া ২০৫টি ড্রোনের মধ্যে ১৭৬টি তারা নিষ্ক্রিয় করতে সক্ষম হলেও অন্তত ১৫টি স্থানে ২৪টি আঘাত হানে, এবং হামলা সকাল পর্যন্ত চলতে থাকে।
ইউক্রেনের উপপ্রধানমন্ত্রী ওলেক্সি কুলেবা বলেন, তিনটি অঞ্চলে রেলওয়ে পরিকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা হামলার তীব্রতা স্পষ্ট করে। জেলেনস্কি সতর্ক করে বলেন, উৎসবের দিনেও রাশিয়ার এই আক্রমণ প্রমাণ করে যে ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা আরও শক্তিশালী করা অত্যন্ত জরুরি। তিনি মিত্র দেশগুলিকে দ্রুত প্রতিশ্রুত প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহের আহ্বান জানান।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রক অবশ্য দাবি করেছে, তাদের হামলা ছিল ইউক্রেনের সামরিক লক্ষ্য ও যুদ্ধ প্রচেষ্টাকে সহায়তাকারী জ্বালানি স্থাপনার বিরুদ্ধে।
এই পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এমন এক সময়ে এল, যখন কূটনৈতিক টানাপোড়েন চরমে। সপ্তাহের শুরুতেই মস্কো অভিযোগ তোলে যে ইউক্রেন প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের একটি সরকারি বাসভবনে দীর্ঘ-পাল্লার ড্রোন হামলার চেষ্টা করেছে। কিয়েভ এই অভিযোগকে সম্পূর্ণ মনগড়া বলে উড়িয়ে দেয় এবং দাবি করে, সম্ভাব্য শান্তি আলোচনাকে ব্যাহত করতেই এই ধরনের কথা ছড়ানো হচ্ছে।
তবে যুদ্ধের তীব্রতার মধ্যেও কূটনৈতিক তৎপরতার ইঙ্গিত মিলছে। নববর্ষের ভাষণে জেলেনস্কি বলেন, একটি শান্তিচুক্তি “৯০ শতাংশ প্রস্তুত”, যদিও তিনি সতর্ক করেন যে ভূখণ্ড সংক্রান্ত অমীমাংসিত প্রশ্নই ইউক্রেন ও ইউরোপের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ জানান, পশ্চিমি দেশ ও ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের মধ্যে ইউরোপীয় শান্তি প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে “গঠনমূলক” আলোচনা হয়েছে এবং আগামী দিনে আরও উচ্চপর্যায়ের বৈঠক নির্ধারিত রয়েছে।
তবু নতুন বছরের সূর্য ওঠার সঙ্গেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যুদ্ধের অবসান এখনও দূরের পথ। দু’পক্ষই একে অপরকে নৃশংসতার জন্য দায়ী করে নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে, আর এই সংঘাতের মাঝখানে পড়ে প্রতিদিনই প্রাণ হারাচ্ছেন বা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন নিরীহ সাধারণ মানুষ।
