আজকাল ওয়েবডেস্ক: দক্ষিণ আফ্রিকায় স্টোন এজ যুগের শিকারিদের ব্যবহৃত তীরের ফলায় উদ্ভিজ্জ বিষের চিহ্ন পাওয়া গেছে। প্রায় ৬০ হাজার বছর পুরনো এই নিদর্শনই এখন পর্যন্ত বিষ-মাখানো তীর ব্যবহারের সবচেয়ে প্রাচীন প্রত্যক্ষ প্রমাণ বলে দাবি করেছেন গবেষকরা। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান জার্নাল Science Advances-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে।
গবেষণায় বিশ্লেষণ করা হয়েছে কোয়াজুলু-নাটাল প্রদেশের উমহ্লাতুজানা রক শেল্টার থেকে উদ্ধার হওয়া কোয়ার্টজের তৈরি ছোট তীরের ফলা। ১৯৮৫ সালে খননের সময় পাওয়া এই তীরফলাগুলিকে এতদিন সাধারণ শিকার অস্ত্র হিসেবেই ধরা হচ্ছিল। কিন্তু আধুনিক রাসায়নিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১০টি তীরের মধ্যে পাঁচটির গায়ে বিষাক্ত উদ্ভিজ্জ যৌগের স্পষ্ট চিহ্ন রয়েছে।
স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্কিওলজিক্যাল রিসার্চ ল্যাবরেটরির অধ্যাপক ও গবেষণার প্রধান লেখক সভেন ইসাকসন জানান, তীরের ফলায় পাওয়া দুটি অ্যালকালয়েড, বুফান্দ্রিন ও এপিবুফানিসিন, দক্ষিণ আফ্রিকার গিফবল বা Boophone disticha উদ্ভিদ থেকে আসে। এই গাছ স্থানীয়ভাবে ‘পয়জন বাল্ব’ নামে পরিচিত এবং আজও কিছু ঐতিহ্যবাহী শিকারি গোষ্ঠী শিকারের জন্য এর বিষ ব্যবহার করে।
গবেষকদের মতে, এই বিষ তৎক্ষণাৎ প্রাণীকে হত্যা করত না। বরং আহত পশু ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ত। ফলে শিকারিদের দীর্ঘ সময় ধরে পশুকে তাড়া করতে হতো না। ইসাকসনের ভাষায়, “বিষের ব্যবহার শিকারিদের সময় ও পরিশ্রম বাঁচাতে এবং শিকারকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সাহায্য করত।”
এই আবিষ্কার ইঙ্গিত দেয় যে, লেট প্লাইস্টোসিন যুগের শিকারি-সংগ্রাহকরা শুধু অস্ত্র তৈরি করতেন না, বরং কোন গাছ বিষাক্ত, কীভাবে বিষ সংগ্রহ করতে হয় এবং বিষ প্রয়োগের কত সময় পরে তার প্রভাব পড়বে, এসব বিষয়েও স্পষ্ট ধারণা রাখতেন। গবেষকদের মতে, এমন জ্ঞান কারণ-পরিণাম বোঝার ক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ইঙ্গিত দেয়।
গবেষণায় বলা হয়েছে, শিকারিরা হয় গিফবল গাছের বাল্বে তীর ঢুকিয়ে বিষ লাগাতেন, অথবা বাল্ব কেটে তার রস সংগ্রহ করে তীরের ফলায় মাখাতেন। কিছু ক্ষেত্রে সূর্যের আলো বা তাপ ব্যবহার করে বিষ আরও ঘন করা হত বলেও অনুমান করা হচ্ছে। বিষের ধরন অনুযায়ী শিকার করা পশুর মাংস কোন অংশ নিরাপদে খাওয়া যাবে, সেই জ্ঞানও সম্ভবত তখনকার মানুষের ছিল।
বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, এত হাজার বছর মাটির নিচে থাকার পরও এই বিষের রাসায়নিক চিহ্ন টিকে রয়েছে। গবেষকদের মতে, এই অ্যালকালয়েডগুলো সহজে জলে মিশে যায় না এবং রাসায়নিকভাবে বেশ স্থিতিশীল বলেই তা সম্ভব হয়েছে।
তুলনামূলক বিশ্লেষণের জন্য গবেষকরা দক্ষিণ আফ্রিকার প্রায় ২৫০ বছর পুরনো চারটি ঐতিহাসিক তীরও পরীক্ষা করেন। সেখানেও একই ধরনের বিষাক্ত যৌগ পাওয়া গেছে। এর ফলে স্পষ্ট হয় যে, এই বিষ ব্যবহারের ঐতিহ্য হাজার হাজার বছর ধরে অঞ্চলে ছিল।
এই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত নন, এমন প্রত্নতত্ত্ববিদরাও একে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি বলে মনে করছেন। জোহানেসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ববিদ জাস্টিন ব্র্যাডফিল্ড বলেন, এত প্রাচীন মানুষের কৌশলগত চিন্তার সরাসরি প্রমাণ পাওয়া অত্যন্ত বিরল, আর এই গবেষণা সেই অভাব অনেকটাই পূরণ করেছে।
এর আগে শিকার অস্ত্রে বিষ ব্যবহারের সবচেয়ে প্রাচীন প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল প্রায় ৬–৭ হাজার বছর আগের নিদর্শনে। নতুন এই আবিষ্কার সেই সময়সীমাকে বহু গুণ পিছিয়ে নিয়ে গেল। গবেষকদের মতে, এটি প্রমাণ করে যে আধুনিক মানুষের পূর্বপুরুষরা অনেক আগেই জটিল প্রযুক্তি, পরিকল্পনা এবং পরিবেশ সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন করেছিলেন।
সভেন ইসাকসনের কথায়, “এই আবিষ্কার আমাদের জানায়, এত প্রাচীন মানুষ কেবল বেঁচে থাকার লড়াই করছিল না, বরং তারা চিন্তা করত, পরিকল্পনা করত এবং প্রকৃতিকে বুঝে ব্যবহার করত।”
