আজকাল ওয়েবডেস্ক: ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেই নিহত হওয়ার ঘটনাকে ঘিরে গোটা বিশ্ব এখনও স্তম্ভিত। শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ বিমান হামলায় তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে তেহরান নিশ্চিত করা হয়েছে।

এই হামলার পর থেকেই পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। তেলবাজারে অস্থিরতা, কূটনৈতিক টানাপোড়েন এবং সামরিক প্রস্তুতি—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক মহলে এবং সামাজিক মাধ্যমে একের পর এক জল্পনা ছড়াতে শুরু করেছে—কীভাবে ইসরায়েল খামেনেইর গতিবিধি এত নিখুঁতভাবে ট্র্যাক করতে সক্ষম হলো?

নানা তত্ত্ব ঘুরপাক খেলেও, এখন পর্যন্ত কয়েকটি সম্ভাবনা বেশি আলোচনায় এসেছে। তবে এদের অনেকগুলির ক্ষেত্রেই শক্ত প্রমাণ সামনে আসেনি।সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর যে তত্ত্বটি ভাইরাল হয়েছে তা হল—ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ নাকি চিকিৎসক ও দন্তচিকিৎসকের ছদ্মবেশে ইরানে ঢুকে পড়েছিল। সামাজিক মাধ্যমে দাবি করা হয়েছে, নিয়মিত দাঁতের চিকিৎসার সময় খামেনেই এবং শীর্ষ সামরিক ও ধর্মীয় কর্মকর্তাদের দাঁতে নাকি ট্র্যাকিং চিপ বসানো হয়েছিল।

একটি পোস্টে দাবি করা হয়, “গত কয়েক বছরে মোসাদ এজেন্টরা ডাক্তার ও দন্তচিকিৎসক সেজে ইরানে অনুপ্রবেশ করে। গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও অভিজাত ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দিয়ে দাঁতের ফিলিংয়ের আড়ালে ট্র্যাকিং ডিভাইস বসানো হয়।” আরও একধাপ এগিয়ে কেউ কেউ বলেছেন, গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজিস্টরা নাকি চিকিৎসার সময় মাইক্রোচিপ বসিয়েছিলেন।

&t=21s

তবে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা এই তত্ত্বকে অত্যন্ত অযৌক্তিক বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁদের মতে, এত দীর্ঘ সময় ধরে এমন ডিভাইস অদৃশ্যভাবে কার্যকর রাখা প্রায় অসম্ভব। উপরন্তু, এ ধরনের দাবির পক্ষে কোনও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এখনও সামনে আসেনি। আরেকটি আলোচিত তত্ত্ব হল, ইরানের শক্তিশালী সামরিক সংগঠন Islamic Revolutionary Guard Corps (আইআরজিসি)-এর ভেতরেই নাকি বড় ধরনের অনুপ্রবেশ ঘটেছিল।

সামাজিক মাধ্যমে দাবি করা হয়েছে, কুদস ফোর্সের প্রধান ইসমাইল ক্কানি নাকি গোপনে মোসাদ এমনকি মার্কিন সিআইএ-র তথ্যদাতা ছিলেন। অনেকে যুক্তি হিসেবে দেখিয়েছেন, হামলার ঠিক আগে ক্বানি খামেনেইর কাছাকাছি ছিলেন এবং তিনি বেঁচে যান। কিছু অপ্রমাণিত প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে যে ক্বানিকে নাকি জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তবে এই খবরেরও সরকারি নিশ্চিতকরণ মেলেনি। ফলে বিষয়টি এখনও জল্পনার পর্যায়েই রয়ে গেছে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, মোসাদ দীর্ঘদিন ধরে তেহরানের ট্রাফিক ক্যামেরা হ্যাক করে আসছিল। এই ক্যামেরাগুলি মূলত ইরানের নিজস্ব নজরদারি ব্যবস্থার অংশ, যা সরকার নাগরিক ও বিক্ষোভকারীদের ওপর নজর রাখতে ব্যবহার করে।

সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেহরানের ক্যামেরার ফুটেজ নাকি বিকৃত করে তেল আভিভ ও দক্ষিণ ইসরায়েলের সার্ভারে পাঠানো হতো। পরে জটিল অ্যালগরিদমের সাহায্যে ‘প্যাটার্ন অফ লাইফ’ বিশ্লেষণ করা হয়—অর্থাৎ কোনও শীর্ষ কর্মকর্তা কোথায় থাকেন, কখন কোথায় যান, কারা তাঁকে পাহারা দেয়—এসব তথ্য সুসংগঠিতভাবে বিশ্লেষণ করা হতো। যদি এই দাবি সত্য হয়, তাহলে এটি ইরানের নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য বড় ধাক্কা।

হামলার পর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসে। জনপ্রিয় প্রার্থনার সময়সূচি নির্ধারণকারী অ্যাপ BadeSaba হ্যাক করা হয়েছে বলে জানা যায়। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া স্ক্রিনশটে দেখা যায়, অ্যাপটিতে “সহায়তা এসে গেছে” বা “এবার হিসাব চুকানোর সময়”—এমন বার্তা ভেসে উঠেছে। ব্যবহারকারীদের সেনাবাহিনী থেকে সরে এসে জনতার পক্ষে দাঁড়ানোর আহ্বানও জানানো হয়।

বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, শুধু BadeSaba নয়, ইরানের একাধিক সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইট—যেমন Islamic Republic News Agency (IRNA), Iranian Students News Agency (ISNA), Tabnak এবং Asr-e Iran—হ্যাক করা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই হ্যাকিংয়ের উদ্দেশ্য ছিল মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়ানো।

খামেনেইর মৃত্যু এবং তার পরবর্তী সাইবার ও সামরিক অভিযানের খবর পশ্চিম এশিয়াকে এক নতুন অস্থিরতার মুখে দাঁড় করিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দাবি করেছে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে অগ্রসর হচ্ছিল, তাই এই হামলা “অপরিহার্য” ছিল। যদিও তেহরান বরাবরই এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

এই ঘটনার পর থেকে প্রশ্ন উঠছে—ইরানের নিরাপত্তা কাঠামো কি ভেতর থেকেই ভেঙে পড়েছে? নাকি আধুনিক প্রযুক্তি ও সাইবার যুদ্ধই বদলে দিচ্ছে গোয়েন্দা অভিযানের রূপ? এ মুহূর্তে অনেক প্রশ্নের উত্তর অজানা। তবে একথা স্পষ্ট—এই হত্যাকাণ্ড শুধু একজন নেতার মৃত্যু নয়, বরং পশ্চিম এশিয়ার ভূরাজনীতিতে এক বিস্ফোরক মোড়। পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায়, তার দিকে এখন তাকিয়ে আছে গোটা বিশ্ব।