আজকাল ওয়েবডেস্ক: বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে মহিলা সাংসদদের পোশাক। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে কয়েকজন মহিলা সাংসদের বোরখা ও নিকাব পরা নিয়ে যে বিতর্কের সূচনা হয়েছিল, তাতে এবার নিজস্ব মতামত জানিয়ে আলোচনার ঝড় তুলেছেন নির্বাসিত ও বিতর্কিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন। এই পুরো ঘটনার সূত্রপাত ঘটেছিল বাজেট অধিবেশনের দিন। সংসদে উপস্থিত নিকাব পরিহিত নারী সাংসদদের দিকে ইঙ্গিত করে কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী মন্তব্য করেছিলেন, 'আমাদের বোনেরা এসেছেন এমপি হয়ে। সবাই মেধাবী। কিন্তু বুঝলাম না তো আপনারা কারা? ভেতরে কে?' তাঁর এই বক্তব্য থেকেই সংসদের ভেতরে ও বাইরে তুমুল শোরগোল পড়ে যায়।
এই বিতর্কের মাঝেই নিজের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টে সংসদের একটি ছবি শেয়ার করে কড়া ভাষায় নিজের মতামত জানিয়েছেন 'লজ্জা' উপন্যাসের স্রষ্টা তসলিমা নাসরিন। তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, সংসদ কোনওভাবেই মুখ লুকিয়ে রাখার জায়গা নয়। তাঁর মতে, জনপ্রতিনিধিরা জনগণের সামনে দৃশ্যমান থাকবেন, এটাই স্বাভাবিক। মুখ লুকিয়ে মানুষের প্রতিনিধিত্ব করার মধ্যে একটা বড় ধরনের বৈপরীত্য রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। কারণ, একজন মানুষের মুখই তাঁর পরিচয়, ব্যক্তিত্ব ও উপস্থিতির প্রধান প্রতীক।
নিজের ক্ষোভ উগরে দিয়ে তসলিমা লিখেছেন, যে মতাদর্শ মহিলা মুখকে আড়াল করতে চায়, আসলে তা নারীর ব্যক্তিত্বকেই মুছে ফেলতে চায়। বোরখা পরা মহিলা সাংসদদের ওই ছবি তাঁর কাছে নারী স্বাধীনতার কোনও প্রতীক নয়, বরং তা নারীদের অদৃশ্য ও পরিচয়হীন করে তোলার এক করুণ চিত্র। তিনি আক্ষেপ করে বলেছেন, এখানে কোনও শিক্ষিত নারী, নির্বাচিত প্রতিনিধি বা সক্রিয় নাগরিককে দেখা যাচ্ছে না; বরং এমন এক নারীবিদ্বেষী মানসিকতার প্রভাব দেখা যাচ্ছে, যেখানে নারীর মুখটাকেই একটা বড় সমস্যা হিসেবে ধরে নেওয়া হয়।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে লড়াই করে নারীরা আজ ঘরের বাইরে বেরোনোর, শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার অধিকার অর্জন করেছেন। কিন্তু রাজনীতি ও দেশ গড়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় এসেও যদি একজন নারীকে নিজের মুখ পর্দার আড়ালে লুকিয়ে রাখতে হয়, তবে তসলিমার প্রশ্ন— নারী কি সত্যিই আজ মুক্ত? নাকি তারা আজও অদৃশ্য শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে আছেন? সংসদে যেখানে মানুষের মেধা, যুক্তি ও নেতৃত্বের বিকাশ ঘটার কথা, সেখানে এমন অবয়বহীনতা একেবারেই কাম্য নয় বলেই তিনি মনে করেন। সব মিলিয়ে সাংসদ মনিরুল হক চৌধুরীর মন্তব্য এবং তার প্রেক্ষিতে তসলিমা নাসরিনের এই চাঁছাছোলা বক্তব্য, দুইয়ে মিলে চারদিকে এখন বেশ বড়সড় একটি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।















