আজকাল ওয়েবডেস্ক: ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক সংকট নতুন এক উত্তাল পর্যায়ে পৌঁছেছে। দেশের প্রধান বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো ঘোষণা করেছেন, বিরোধী শিবির ক্ষমতা গ্রহণের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ প্রকাশিত এক দীর্ঘ লিখিত বিবৃতিতে তিনি বলেন, “ভেনেজুয়েলাবাসী, স্বাধীনতার সময় এসে গেছে।” এই ঘোষণাকে ঘিরে রাজধানী কারাকাস থেকে আন্তর্জাতিক মহল পর্যন্ত তীব্র আলোড়ন তৈরি হয়েছে।
মাচাদো তাঁর বিবৃতিতে দাবি করেন, প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এখন আন্তর্জাতিক বিচার ব্যবস্থার মুখোমুখি। ভেনেজুয়েলা ও অন্যান্য দেশের নাগরিকদের বিরুদ্ধে সংঘটিত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে মাদুরো সরকারের অনীহার পর যুক্তরাষ্ট্র ‘আইনের শাসন কার্যকর করার’ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে এগিয়ে এসেছে।
Venezolanos, llegó la hora de la libertad. pic.twitter.com/ehy20V1xm9
— María Corina Machado (@MariaCorinaYA)Tweet by @MariaCorinaYA
প্রসঙ্গত, কয়েক মাস আগেই শান্তিতে নোবেল পাওয়ার পর মারিয়া কোরিনা মাচাদো তাঁর প্রাপ্ত নোবেল শান্তি পুরস্কার নিয়ে বিস্ময়কর এক ঘোষণা করেন। তিনি জানান, এই নোবেল পুরস্কার তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে উৎসর্গ করছেন এবং বিশ্বজুড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। মাচাদোর ভাষায়, এই পুরস্কার ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং “সমস্ত ভেনেজুয়েলাবাসীর সংগ্রামের স্বীকৃতি”। তিনি বলেন, এই স্বীকৃতি তাঁদের লড়াইকে শেষ পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার, অর্থাৎ স্বাধীনতা জয়ের, চেষ্টায় নতুন শক্তি জোগাবে।
বিরোধী নেত্রী আরও বলেন, এখন সময় এসেছে ভেনেজুয়েলায় সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় সার্বভৌমত্ব ফের প্রতিষ্ঠার। ক্ষমতায় এলে রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি, রাষ্ট্রে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং বিদেশে ছড়িয়ে পড়া লক্ষ লক্ষ ভেনেজুয়েলাবাসীকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে দীর্ঘ লড়াইয়ের আত্মবিশ্বাস “আমরা বহু বছর ধরে সংগ্রাম করেছি, সবকিছু উজাড় করে দিয়েছি। যা হওয়ার ছিল, তা এখন ঘটছে।”
মাচাদোর বিবৃতির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক ছিল ভেনেজুয়েলার সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি তাঁর সরাসরি আহ্বান। তিনি জানান, বিরোধী শিবির এডমুন্ডো গঞ্জালেস উরুতিয়াকে দেশের বৈধ প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং সংবিধান অনুযায়ী তাঁর অবিলম্বে দায়িত্ব গ্রহণ করা উচিত। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, সেনাবাহিনীর সব অফিসার ও সৈনিকের উচিত তাঁকে সর্বাধিনায়ক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া।
বিরোধী নেত্রী স্পষ্ট করে বলেন, তাঁরা এখন আর কেবল প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ নেই- বিরোধী শিবির তাদের গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেট কার্যকর করতে এবং ক্ষমতা গ্রহণ করতে প্রস্তুত। দেশের নাগরিকদের সতর্ক, সক্রিয় ও সংগঠিত থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, খুব শিগগিরই আনুষ্ঠানিক চ্যানেলের মাধ্যমে পরবর্তী কর্মসূচি জানানো হবে। বিদেশে থাকা ভেনেজুয়েলাবাসীদের উদ্দেশ্যেও তিনি আহ্বান জানান, যেন তাঁরা নিজ নিজ দেশের সরকার ও নাগরিক সমাজকে সক্রিয়ভাবে যুক্ত করেন।
নোবেল শান্তি পুরস্কার, মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রতি প্রকাশ্য কৃতজ্ঞতা এবং সরাসরি ক্ষমতা দখলের ঘোষণা, সব মিলিয়ে ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন গভীর অনিশ্চয়তার মুখে। লাতিন আমেরিকার রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দেশটি আবারও এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে অভ্যন্তরীণ শক্তির সংঘর্ষের সঙ্গে আন্তর্জাতিক শক্তির ভূমিকা ক্রমশ আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।
এই অবস্থার মধ্যেই জাতিসংঘ ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। জাতিসংঘের মহাসচিবের মুখপাত্র স্তেফান দুজারিক এক বিবৃতিতে জানান, ভেনেজুয়েলায় সাম্প্রতিক উত্তেজনা এবং বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপ গোটা অঞ্চলের জন্য উদ্বেগজনক পরিণতি ডেকে আনতে পারে। জাতিসংঘের মতে, ভেনেজুয়েলার পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, এই ধরনের ঘটনা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় একটি “বিপজ্জনক নজির” তৈরি করছে।
জাতিসংঘ মহাসচিব সব পক্ষকে আন্তর্জাতিক আইন এবং জাতিসংঘ সনদের পূর্ণ সম্মান জানানোর আহ্বান জানিয়েছেন। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক আইনের বিধান যথাযথভাবে মানা হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে মহাসচিব গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। একই সঙ্গে ভেনেজুয়েলার সব রাজনৈতিক পক্ষকে মানবাধিকার ও আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে আলোচনায় বসার আহ্বান জানানো হয়েছে।
