আজকাল ওয়েবডেস্ক: ইরান যুদ্ধের একমাস। গত ২৮ মার্চ আমেরিকা ও ইজরায়েল যৌথ হামলায় তেহরানে প্রথম ক্ষেপনাস্ত্র নিক্ষেপ করে। এতেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনেই-সহ শীর্ষ একাধিক নেতৃত্ব নিহত হন। এই হামলার আসল উদ্দেশ্য ছিল, ইরানে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটানো। এই হামলার পরিকল্পনা চলছিল গত কয়েক মাস ধরেই। কিন্তু যুদ্ধ শুরুর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই আমেরিকা ও ইজরায়েল বুঝতে পারে যে, তারা এমন এক প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হয়েছে, যারা ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর ধারণার চেয়েও অনেক বেশি সহনশীল ও বিধ্বংসী। টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র, বাঙ্কার-বাস্টার এবং আরও নানা ধরণের মারণাস্ত্রের অবিরাম আঘাতে জর্জরিত হওয়া সত্ত্বেও, ইরান স্বল্পমূল্যের অসংখ্য ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে উপসাগরীয় দেশগুলোকে নাজেহাল করে চলেছে এবং হরমুজ প্রণালী অবরোধ করে বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের ওপর নিজেদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে।
বিশ্ব-বাজারে তেলের দাম ৪০ শতাংশেরও বেশি বেড়ে যাওয়ায় ট্রাম্প শেষমেশ আলোচনার পথে ঝুঁকতে বাধ্য হন। ৬ এপ্রিল পর্যন্ত (মোট ১০ দিন) ইরানের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে হামলা স্থগিত রাখার ঘোষণা করেন তিনি। যুদ্ধে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও ইরান এখনও অদম্য মনোবলে বলীয়ান। তেহরান বারবার জোর দিয়ে বলেছে যে, এই যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটবে একমাত্র তাদের শর্তেই। এই ঘোষার সঙ্গে সাদুর্য রেখে তারা যুদ্ধবিরতির লক্ষ্যে গোপন বা 'ব্যাক-চ্যানেল' আলোচনাও শুরু করেছে। তবে এই আপাত শান্তির আড়ালেই লুকিয়ে আছে ইরানে মার্কিন স্থল অভিযানের এক ভয়াবহ আশঙ্কা। যার প্রস্তুতি হিসেবে হাজার হাজার মেরিন সেনা ও প্যারাট্রুপার ইতিমধ্যেই মধ্য এশিয়ার দিকে এগিয়ে আসছে।
এভাবেই, যুদ্ধের এক মাস পেরিয়ে যাওয়ার পরেও সংঘাতের পরিস্থিতি এখনও অত্যন্ত অনিশ্চিত ও পরিবর্তনশীল অবস্থায় রয়ে গিয়েছে। সংঘাত কীভাবে বর্তমান এই পর্যায়ে এসে পৌঁছল, নীচে তার একটি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা তুলে ধরা হল।
ইরান যুদ্ধ কীভাবে শুরু হল?
সংঘাতের প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই আমেরিকা ও ইজরায়েলের যৌথ বাহিনী ইরানের ১৫০০-এরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। তাদের মূল ধারণাটি ছিল অত্যন্ত সরল। ইরানে যদি দ্রুত ও কঠোর আঘাত হানা যায়, তবে দেশটি আপনাআপনিই ভেঙে পড়বে। এমনকি ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু ইরানি জনগণকে (যারা গত জানুয়ারিতে দেশটির ধর্মভিত্তিক শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছিল) দেশটির শাসনভার নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ার জন্য উস্কে দিয়েছিলেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি নিজের স্বভাবসুলভ দম্ভেভরা ভঙ্গিতে ট্রাম্প বলেছিলেন, "দেশের শাসনভার ফিরে পাওয়ার জন্য এটিই হল ইরানি জনগণের সামনে আসা সর্বশ্রেষ্ঠ সুযোগ।" তবে বাস্তবে এমন কোনও গণঅভ্যুত্থানের বা বিদ্রোহের কোনও লক্ষণই এখন পর্যন্ত দেখা যায়নি।
হামলার প্রথম দফা আঘাতেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লা আলি খামেনেই, আইআরজিসি-এর কমান্ডার এবং দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী নিহত হন। তবে ইরানের মিনাব শহরে অবস্থিত একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনায় ১৭৫ জন মানুষের (যাদের অধিকাংশই ছিল স্কুলছাত্রী) মৃত্যু বিশ্বজুড়ে তীব্র নিন্দা ও সমালোচনার ঝড় তোলে। পরবর্তী এক তদন্তে বেরিয়ে আসে যে, এটি ছিল মার্কিন সামরিক বাহিনীর একটি "লক্ষ্য নির্ধারণজনিত ত্রুটি"।
এর প্রতিশোধ হিসেবে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর (যেখানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো রয়েছে) ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে ব্যাপক হামলা চালায়। যুদ্ধের প্রথম ১০০ ঘণ্টার মধ্যেই ইরান ৫০০-এরও বেশি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ২,০০০-এর অধিক 'শাহেদ' ড্রোন নিক্ষেপ করে। এই ড্রোনগুলোই এখন তেহরানের প্রতিরোধের মূল মেরুদণ্ড হয়ে উঠেছে।
এক মাস পেরিয়ে যাওয়ার পর, ১৬টি দেশ এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে। এই সংঘাতের ব্যাপ্তি সুদূর ভারত মহাসাগর পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল, কারণ, একটি মার্কিন সাবমেরিন অতর্কিতে টর্পেডো হামলা চালিয়ে ইরানের একটি যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেয়। জাহাজটি তখন ভারত থেকে একটি নৌ-মহড়া শেষে দেশে ফিরছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন সাবমেরিনের চালানো এ ধরনের প্রথম হামলায় ইরানের প্রায় ৯০ জন নাবিক নিহত হন। যুদ্ধের দ্বিতীয় সপ্তাহে এই ঘটনাটি বিশ্বজুড়ে সংবাদ শিরোনাম হয়েছিল।
এই যুদ্ধের ফলে লেবাননেও সংঘাতের নতুন একটি ফ্রন্ট বা রণাঙ্গন উন্মুক্ত হয়েছে। গত ২রা মার্চ থেকে ইজরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যকার সংঘর্ষে ১,২০০-এরও বেশি মানুষ নিহত এবং লক্ষ লক্ষ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
আমেরিকা-ভিত্তিক একটি মানবাধিকার সংস্থার মতে, ইরানে এ পর্যন্ত ৩,৩০০-এরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে প্রায় ১,৪০০ জনই অসামরিক নাগরিক।
ইরানের ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা
তবে, এই 'ইসলামি প্রজাতন্ত্র' কিন্তু ভেঙে পড়েনি। এটি প্রমাণ করেছে যে, কোনও একজন একক ব্যক্তির চেয়ে এর অস্তিত্ব অনেক বেশি সুদৃঢ় ও বিশাল। যুদ্ধের দ্বিতীয় সপ্তাহে ইরানের 'অ্যাসেম্বলি অফ এক্সপার্টস' (বিশেষজ্ঞদের পরিষদ) আয়াতুল্লা খামেনেইর ৫৬ বছর বয়সী পুত্র মোজতাবাকে দেশের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নিয়োগ দেয়। তবে মোজতাবাকে, যিনি ২৮শে ফেব্রুয়ারির হামলা থেকে বেঁচে ফিরেছেন বলে ইরান দাবি করেছিল, সেই ঘটনার পর থেকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি।
মোজতবা কেবল একটি দীর্ঘ লিখিত বার্তা "প্রকাশ" করেছেন; সেই বার্তায় তিনি "প্রতিশোধ" নেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন এবং 'হরমুজ প্রণালী' অবরোধ করার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। এই প্রণালী দিয়েই বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে, মোজতবা বর্তমানে কোমায় আচ্ছন্ন রয়েছেন। অন্যদিকে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ দাবি করেছেন যে, হামলার ফলে তাঁর মুখমণ্ডল সম্ভবত মারাত্মকভাবে বিকৃত হয়ে গিয়েছে।
এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে যে, আইআরজিসি এবং অন্যান্য সামরিক ইউনিটগুলো কোনও একক বা কেন্দ্রীয় কমান্ড ছাড়াই তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছে। কূটনৈতিক আঙিনায় ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এবং দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মহম্মদ বাকের গালিবাফই মূলত নেতৃত্ব দিচ্ছেন বলে জানা গিয়েছে।
'তেল যুদ্ধে'র নাটকীয় তীব্রতা বৃদ্ধি
তৃতীয় সপ্তাহে 'তেল যুদ্ধ'-এর তীব্রতা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়; এ সময় গ্যাসক্ষেত্র ও জ্বালানি স্থাপনাগুলোর ওপর নাগাড়ে হামলা চালানো হয়। এই প্রথমবার জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত কোনও ঘাঁটিতে হামলা চলে।
ইজরায়েল ইরানের 'সাউথ পার্স' গ্যাসক্ষেত্রে ব্যাপক হামলা চালায়। 'সাউথ পার্স' বিশ্বের বৃহত্তম গ্যাসক্ষেত্র এবং বৈশ্বিক এলএনজি সরবরাহের মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত। এই গ্যাসক্ষেত্রটি ইরানের অভ্যন্তরীণ গ্যাসের ৮০ শতাংশ চাহিদাও পূরণ করে থাকে। এর জবাবে ইরান আঞ্চলিক জ্বালানি ঘাঁটিগুলোতে পাল্টা হামলা চালায়। যার মধ্যে কাতারের 'রাস লাফান' এলএনজি প্ল্যান্ট এবং সৌদি আরবের তেল জায়ান্ট 'আরামকো'-র 'সামরেফ' শোধনাগার অন্যতম।
এই ঘটনা ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যকার মতপার্থক্যকে প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে। ট্রাম্প স্বীকার করেন যে, এ বিষয়ে আমেরিকার কাছে কোনও আগাম তথ্য ছিল না। পাশাপাশি তিনি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীকে ইরানের তেল ও গ্যাস পরিকাঠামোকে নিশানা না করার ব্যাপারে প্রকাশ্যে সতর্ক করে দেন। সত্যি বলতে, গত দুই সপ্তাহে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে খুব কমই কথাবার্তা হয়েছে। এই পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনার সৃষ্টি হয়েছে যে, ইরানের পাল্টা হামলায় নেতানিয়াহু হয়তো নিহত হয়েছেন।















