আজকাল ওয়েবডেস্ক: শনিবার ভোরে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাস এবং আশেপাশের অঞ্চলে একাধিক সামরিক ঘাঁটি, বেসামরিক এলাকা এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। ভেনেজুয়েলার সরকার এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলেছে, এই হামলা যুক্তরাষ্ট্রের পরিচালিত “গুরুতর সামরিক আগ্রাসন” এবং এটি ভেনেজুয়েলার “ভূমি ও জনগণের সার্বভৌমত্বর” বিরুদ্ধে সংঘটিত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্রুথ সোশিয়ালে দাবি করেছেন, প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং ফার্স্ট লেডি সিলিয়া ফ্লোরেসকে দেশ থেকে অপসারণ করা হয়েছে। ট্রাম্প আরও জানিয়েছেন, হামলার বিস্তারিত বিবরণ জানানো হবে মার-এ-লাগোতে অনুষ্ঠিত প্রেস কনফারেন্সে। এই পোস্টের পরই ভেনেজুয়েলার সরকার এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন, কারণ মাদুরোর অবস্থান ও নিরাপত্তা এখনো অনিশ্চিত।
ভেনেজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রোদ্রিগেজ টেলেসুরকে বলেন, “মাদুরো ও ফার্স্ট লেডির অবস্থান সম্পর্কে আমরা কিছু জানি না। যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের কাছে আমরা অবিলম্বে তাদের জীবিত থাকার প্রমাণ দেখানোর দাবি করছি। আমরা দেশ রক্ষায় প্রস্তুত। আমাদের স্বাধীনতা কখনও কোনও বিদেশী আগ্রাসনের হাতে বিক্রি হবে না।” তিনি আরও বলেন, “প্রেসিডেন্ট মাদুরো আগেই সতর্ক করেছিলেন যে তেল ও প্রাকৃতিক সম্পদের লোভে পরিচালিত আক্রমণ আসতে পারে। আমাদের সামরিক বাহিনী, পুলিশ এবং জনগণ ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ রক্ষায় সব পরিকল্পনা কার্যকর করছে।”
ভেনেজুয়েলার প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ভ্লাদিমির পাদ্রিনো লোপেজ জানান, হামলায় “যুক্তরাষ্ট্রের হেলিকপ্টার ও বিমান থেকে ক্ষেপণাস্ত্র এবং বিস্ফোরক চালানো হয়েছে। বেসামরিক এলাকা ও নাগরিকদের উপরও আঘাত হয়েছে।” হামলার লক্ষ্যস্থলগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: টিনা ফোর্ট, লা কার্লোটা বিমান ঘাঁটি, লা গুইরা নেভাল কমান্ড এবং হিগুয়েরোতে বিমানবন্দর। এ ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা এখনো গণনা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের মূল উদ্দেশ্য ভেনেজুয়েলার বিপুল তেল ও প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করা। দেশটির বামপন্থী সরকার হুগো চাভেজ ও নিকোলাস মাদুরোর নেতৃত্বে মার্কিন কোম্পানি এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক আগ্রাসন প্রতিরোধ করছে। ট্রাম্প প্রশাসন বারবার হামলা ও অবরোধকে “আমাদের তেল, জমি এবং অন্যান্য সম্পদ ফেরত আনার” প্রয়াস হিসেবে হাজির করেছে।
এটি কোনও সাধারণ সামরিক অভিযান নয়। বিশ্লেষকরা এটিকে ভেনেজুয়েলার বামপন্থী বলিভারীয় প্রক্রিয়ার ওপর সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন হিসেবে দেখছেন। ১৯৯৯ সালের সংবিধান, সামাজিক মিশন (মিসিয়ন) এবং কমিউনাল কাঠামো ভেনেজুয়েলার জনগণকে ক্ষমতার অংশীদার করেছে। এই সামাজিক এবং অর্থনৈতিক সাফল্যগুলিকে ফের প্রতিষ্ঠা বা ধ্বংস করতে ট্রাম্প প্রশাসন একপাক্ষিকভাবে নৌ অবরোধ, বিমান হামলা এবং তেলের জাহাজ দখলের মতো পদক্ষেপ নিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে: ডিসেম্বরে ভেনেজুয়েলার তেল ট্যাঙ্কার দখল, ক্যারিবিয়ান ও প্রশান্ত মহাসাগরে নৌ হামলা, এবং ট্রাম্পের ঘোষিত “ফোরসিবলি রিটার্ন অফ অ্যাসেটস”। এই পদক্ষেপগুলোকে ভেনেজুয়েলার সরকার “সাম্রাজ্যবাদী লুটপাট” হিসেবে নিন্দা করেছে।
ভেনেজুয়েলার সরকারের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসন শুধু দেশটির নয়, পুরো অঞ্চলের শান্তি এবং স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। ভাইস প্রেসিডেন্ট রোদ্রিগেজ বলেন, “আমরা বলিভার, মিরান্ডা এবং আমাদের মুক্তিকামী নেতাদের চেতনার সঙ্গে এক হয়ে দেশ রক্ষা করব। ভেনেজুয়েলার জনগণ ঐক্যবদ্ধ।”
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াও এসেছে। কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল দিয়াজ-কানেল বলেন, “এই আগ্রাসন শুধু ভেনেজুয়েলার নয়, পুরো অঞ্চলের শান্তি বিপন্ন করছে।” কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো বলেন, “যেকোনও একপাক্ষিক সামরিক অভিযান যুদ্ধে পরিণত হতে পারে এবং বেসামরিক মানুষদের ক্ষতি করতে পারে। শান্তি ও আন্তর্জাতিক আইনের সম্মান নিশ্চিত করা উচিত।”
ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) এই আগ্রাসনকে “আন্তর্জাতিক আইন ও জাতীয় সার্বভৌমত্বের স্পষ্ট লঙ্ঘন” হিসেবে নিন্দা করেছে। তুরস্ক, প্যালেস্টাইন ও হন্ডুরাসের বামপন্থী দলগুলোও যুক্তরাষ্ট্রকে কঠোর সমালোচনা করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও বিরোধ লক্ষ্য করা গেছে। কংগ্রেসম্যান হোয়াকিন কাস্ত্রো বলেন, “নৌ অবরোধ এবং বিমান হামলা অনুমোদনহীন যুদ্ধ ঘোষণা। জনগণ এটি চায় না।”
মাদুরো সম্প্রতি বার্তা দিয়েছেন, “যুদ্ধ নয়, শান্তি হোক। কিন্তু আমাদের দেশের স্বাধীনতা কোনওভাবেই বিক্রি হবে না। আমরা আমাদের ঐতিহাসিক সম্পদ এবং জনগণের অধিকার রক্ষায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।”
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ঘটনা ভেনেজুয়েলার আর্থ-সামরিক সংহতি, জাতীয় সম্পদ এবং বামপন্থী সামাজিক প্রক্রিয়ার ওপর মার্কিন আগ্রাসনের স্পষ্ট উদাহরণ। ১৯৯৯ সালের সংবিধান, সামাজিক মিশন, কমিউনাস, এবং তেল সম্পদের সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ এখন মাদুরো সরকার ও জনগণ একত্রিত হয়ে রক্ষা করছে।
কারাকাসের হামলা ও যুক্তরাষ্ট্রের একপাক্ষিক পদক্ষেপগুলি ভেনেজুয়েলার স্বাধীনতা এবং লাতিন আমেরিকার সামগ্রিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং স্থানীয় জনগণ এখনো ট্রাম্প প্রশাসনের পদক্ষেপের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ও প্রতিবাদ চালিয়ে যাচ্ছে।
