আজকাল ওয়েবডেস্ক: পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজ়রায়েলের সামরিক অভিযানের জেরে যখন আন্তর্জাতিক রাজনীতি উত্তাল, তখনই এক অদ্ভুত প্রবণতা দেখা যাচ্ছে সমাজমাধ্যমে। যুদ্ধের ভয়াবহতা ও উত্তেজনার মাঝেও উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন-কে ঘিরে ছড়িয়ে পড়েছে অসংখ্য মিম। বাস্তবে এই সংঘর্ষে তাঁর দেশের কোনও সরাসরি ভূমিকা নেই, কিন্তু ইন্টারনেট সংস্কৃতি তাঁকে বানিয়ে ফেলেছে যেন বিশ্বরাজনীতির এক ‘বাইস্ট্যান্ডার’ বা দূর থেকে সবকিছু দেখছেন এমন এক কৌতূহলী দর্শক।

ঘটনার সূত্রপাত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজ়রায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানকে ঘিরে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামের বৃহৎ বিমান হামলায় ইরানের সামরিক, পারমাণবিক এবং শাসনব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে একাধিক আঘাত হানা হয়। সেই অভিযানে নিহত হন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনেই। এরপরই সংঘাত আরও তীব্র আকার নেয়।

ইরান পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইজ়রায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলির দিকে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরশাহী, কুয়েত, কাতার, বাহরিন এবং সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থানে লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়েছে বলে জানা গেছে। সংঘর্ষে ইতিমধ্যেই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ইরানের রেড ক্রিসেন্টের তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ৫৫৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। মার্কিন সেনাবাহিনীও জানিয়েছে, এই সংঘাতে তাদের চার জন সেনা নিহত হয়েছেন।

এই সংঘর্ষের পটভূমিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইজ়রায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, এই অভিযানের লক্ষ্য হল ইরানকে স্থায়ীভাবে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির ক্ষমতা অর্জন থেকে বিরত রাখা এবং তাদের আক্রমণাত্মক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস করা।

কিন্তু বাস্তবের এই ভয়াবহ যুদ্ধ পরিস্থিতির মাঝেই সামাজিক মাধ্যমে এক ভিন্ন ছবি তৈরি হয়েছে। নেটমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে অসংখ্য মিম, যেখানে কিম জং উনকে দেখানো হচ্ছে যেন তিনি এই বিশ্বরাজনৈতিক সংঘর্ষের বাইরে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছেন। কোথাও তাঁকে দূরবীন হাতে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে দেখা যাচ্ছে, কোথাও আবার কম্পিউটার স্ক্রিনের সামনে বসে যেন যুদ্ধের খবর দেখছেন। অনেক মিমে লেখা—“Are you monitoring the situation, son?”—যেন তিনি দূর থেকে বিশ্ব পরিস্থিতি নজরে রাখছেন।

বিভিন্ন সমাজমাধ্যমে উপচে পড়ছে কিমকে নিয়ে এই সব কৌতুকপূর্ণ কনটেন্ট। কোথাও ব্যবহার করা হয়েছে তাঁর আসল ছবি বা ভিডিও, আবার কোথাও কার্টুন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ছবি কিংবা বিশেষভাবে সম্পাদিত ভিডিও। অনেক ছবিতে দেখা যাচ্ছে তিনি বক্তৃতা করছেন, কোথাও কাঁদছেন, কোথাও আবার মনখারাপ করে বসে আছেন।

সেই সব পোস্টে লেখা হচ্ছে মজার সব ক্যাপশন—“যখন তোমার কাছে যুদ্ধের সব আধুনিক খেলনা আছে কিন্তু কেউ তোমাকে খেলতে নেয় না।” আবার কোথাও লেখা—“ট্রাম্পের নামে একটা ফেক আইডি বানাও আর সেখান থেকে আমায় গালি দাও।” আরেকটি ভাইরাল ক্যাপশনে বলা হয়েছে—“যখন পুরো পৃথিবী বোমা বোমা খেলছে কিন্তু কেউ তোমায় ডাকছে না।” এমনকি কোথাও লেখা—“আমায় প্লিজ কেউ আমন্ত্রণ করো।”

এই সব মিমে মূলত ইরান ও আমেরিকা-ইজ়রায়েলের সংঘর্ষ পরিস্থিতিকেই কেন্দ্র করে ব্যঙ্গ করা হচ্ছে। যুদ্ধের ভয়াবহতার মধ্যে নেটাগরিকেরা যেন এক অদ্ভুত হাস্যরসের জায়গা খুঁজে পেয়েছেন।

তবে শুধু হাস্যরসেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ নেই। অনেক ক্ষেত্রে ভুয়ো তথ্যও ছড়িয়ে পড়ছে কিম জং উনের নামে। কোথাও দাবি করা হচ্ছে যে তিনি নাকি ইরানকে সরাসরি সামরিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যদিও এমন কোনও তথ্যের সত্যতা এখনও নিশ্চিত হয়নি। ফলে এই মিম সংস্কৃতির মধ্যেই ভুল তথ্য ছড়ানোর ঝুঁকিও বাড়ছে বলে সতর্ক করছেন বিশ্লেষকেরা।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কিম জং উনের ভাবমূর্তি বরাবরই বিতর্কিত। আন্তর্জাতিক নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার তৈরি, ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার প্রদর্শন এবং দেশের অভ্যন্তরে কঠোর ও অদ্ভুত নিয়মের জন্য তিনি দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বের অনেকের কাছে ‘একনায়ক’ বা ‘অত্যাচারী’ শাসক হিসেবে পরিচিত।

কিন্তু বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সেই ‘ভয়ঙ্কর’ ও ‘রহস্যময়’ নেতা হঠাৎই হয়ে উঠেছেন সামাজিক মাধ্যমে হাসির খোরাক। বাস্তবের সংঘর্ষে যেখানে মৃত্যু, ধ্বংস আর অনিশ্চয়তার ছায়া ঘনিয়ে উঠছে, সেখানে নেটাগরিকেরা সেই পরিস্থিতিকেই ব্যঙ্গ ও কৌতুকের মাধ্যমে নতুন এক ডিজিটাল সংস্কৃতিতে রূপ দিচ্ছেন।

ফলে আন্তর্জাতিক রাজনীতির এই অস্থির মুহূর্তে দেখা যাচ্ছে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য—যেখানে বাস্তবে যুদ্ধের উত্তাপ বাড়ছে, আর একই সঙ্গে ইন্টারনেটের পর্দায় এক ‘ভয়ঙ্কর’ শাসককে ঘিরে তৈরি হচ্ছে হাসির ঝড়।
[2:20 pm, 7/3/2026] florentino ariza: