আজকাল ওয়েবডেস্ক: দশকের পর দশক ধরে উত্তর ওয়েস্ট ব্যাঙ্কের নাবলুস শহরের জেনাবিয়া এলিমেন্টারি স্কুল ছিল শিশুদের জন্য এক সাধারণ কিন্তু প্রাণবন্ত শিক্ষাঙ্গন।  সপ্তাহে পাঁচ দিন ক্লাস ভরে থাকত পড়াশোনা, আবৃত্তি আর আলোচনার শব্দে। এখন সেই ক্লাসগুলো বেশিরভাগই ফাঁকা।

Al Jazeera-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েল বহু বছর ধরে প্যালেস্টিনিয়ান অথরিটির (পিএ) হয়ে সংগৃহীত কর রাজস্ব আটকে রাখায় তারা  আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে। তার সরাসরি প্রভাব পড়েছে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থায়। জেনাবিয়া স্কুলসহ ওয়েস্ট ব্যাঙ্কের বহু সরকারি বিদ্যালয়ে এখন সপ্তাহে তিন দিনের বেশি ক্লাস হয় না।

শিক্ষকদের বেতন প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কাটা হয়েছে, তাও মাসের পর মাস বকেয়া থাকে। ফলে অনেকে ধর্মঘটে গেছেন, কেউ বা অন্য পেশায় চলে গেছেন। বিজ্ঞান ও সহপাঠ্য বিষয় প্রায় বন্ধ। সংক্ষিপ্ত পাঠ্যসূচিতে এখন মূলত গণিত, আরবি ও ইংরেজি পড়ানো হয়। পাঠ্যবইয়ের জায়গায় হাতে গোনা ফটোকপি করা পাতার বান্ডিল।

স্কুলের প্রধান আয়েশা আল-খাতিব বলেন, “আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করি। কিন্তু সময় নেই, উপকরণ নেই, ধারাবাহিকতা নেই—এভাবে কীভাবে ঠিকমতো পড়াব, আর কীভাবে বাচ্চাদের রাস্তায় যাওয়া থেকে আটকাব?”

এই আর্থিক সংকটের পেছনে রয়েছে ইসরায়েলের ডানপন্থী নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত—প্যালেস্টিনিয়ান অথরিটির জন্য সংগৃহীত বিপুল রাজস্ব আটকে রাখা। ইসরায়েলের অভিযোগ, বন্দি প্যালেস্টিনিয়ানদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার নীতির কারণেই এই পদক্ষেপ; যদিও পিএ দাবি করেছে, সেই নীতিতে সংস্কার আনা হয়েছে। এই কাটছাঁটের অভিঘাত জনসেবার সব ক্ষেত্রেই পড়েছে, তবে সবচেয়ে বেশি আঘাত লেগেছে শিক্ষায়।

এর ফল স্পষ্ট। দশ বছরের জাইদ হাসেনেহ, যার স্বপ্ন যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসাবিদ্যা পড়া, এখন দীর্ঘ সময় বাড়িতে বসে গুগল ট্রান্সলেটের সাহায্যে নিজে নিজে ইংরেজি শেখে। তার মা ইমান—স্বামীর ইসরায়েলি কাজের অনুমতি বাতিল হওয়ার পর পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী— কারখানায় ক্লান্তিকর শিফট শেষে ছেলেকে পড়াতে বসেন। তিনি বলেন, “সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল পড়াশোনা।” কিন্তু অনিয়মিত ক্লাস ও জোড়াতালি দেওয়া বইয়ে শেখা যে কঠিন হয়ে উঠছে, তা তিনি স্বীকার করেন।

&t=781s

অন্যদিকে, অনেক শিশু পড়াশোনা থেকে সরে যাচ্ছে। যমজ ভাই মুহাম্মদ ও আহমেদ, যারা একসময় এই ছোট স্কুলের নিরাপদ পরিবেশে বুলিং থেকে রক্ষা পেয়েছিল, এখন দিন কাটায় মোবাইল ফোনে। পনেরো বছরের তালাল আদাবিক পুরোপুরি স্কুল ছেড়েছে। নাবলুসের রাস্তায় মিষ্টি বিক্রি করে দিনে কয়েক ডজন শেকেল রোজগার করে সে—ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন করলে কাঁধ ঝাঁকায়।

শিক্ষা দপ্তরের অনুমান, গত দু’বছরে ওয়েস্ট ব্যাঙ্কে ৫ থেকে ১০ শতাংশ শিক্ষার্থী স্কুল ছেড়েছে। শিক্ষকসংখ্যাও কমছে—কেউ কারখানায় কাজ নিচ্ছেন জীবিকা টিকিয়ে রাখতে। এমনকি স্কুলপ্রধানরাও চাপে—আল-খাতিব জানান, এখন তিনি দুই মেয়ের মধ্যে কেবল একজনকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠাতে পারেন।

আর্থিক সংকটের বাইরেও রয়েছে আরও কঠিন বাস্তবতা। সামরিক অভিযান মাঝপথে স্কুল বন্ধ করে দেয়, বসতি স্থাপনকারীদের হামলা ও ভাঙচুর পরিকাঠামো নষ্ট করছে, শিশুদের মধ্যে আতঙ্ক বাড়াচ্ছে। প্যালেস্টিনিয়ান কর্মকর্তাদের মতে, হিংসা, অবরোধ বা উচ্ছেদের হুমকিতে হাজার হাজার শিশুর শিক্ষা ব্যাহত হয়েছে।

শিক্ষাবিদদের আশঙ্কা, এক প্রজন্ম আগে যারা গোটা শিক্ষাবর্ষের সুযোগ পেয়েছিল আর আজকের ভাঙাচোরা সময়সূচির মধ্যে বড় হওয়া শিশুদের মধ্যে ফাঁক ক্রমেই বাড়বে। শিক্ষা আন্দোলনকর্মী রিফাত সাব্বাহ বলেন, “অস্থায়ী সমাধানগুলোই স্থায়ী হয়ে যাচ্ছে। এভাবে চললে ব্যবস্থার আগের মান ও সমতা আর ফিরবে না।”

ইমানের মতো অভিভাবকদের কাছে এই সংকট নীতিগত বিতর্ক নয়, সম্ভাবনার প্রশ্ন। “আমাদের বাচ্চাদের বাঁচার একটা সুযোগ প্রাপ্য,” তিনি বলেন। তাঁর আশা—একদিন আবার ক্লাসরুমগুলো ভরে উঠবে নিয়মিত পড়াশোনায়, কৌতূহলে আর স্বপ্নে, অনিশ্চয়তা আর ক্ষতির ছায়া সরে গিয়ে ফিরে আসবে ধারাবাহিকতা ও আশা।