আজকাল ওয়েবডেস্ক: তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লার দিকে যতদূর চোখ যায় শুধু মানুষের ঢল। হাতে ইরানের জাতীয় পতাকা নিয়ে অবিরাম হেঁটে চলেছেন হাজার হাজার শোকগ্রস্ত মানুষ, যেখানে ইরানের সদ্যপ্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনেইর মরদেহ শায়িত রাখা হয়েছে। পুরো রাজধানী জুড়ে এখন শিয়া সম্প্রদায়ের প্রথাগত শোকগাথা আর মাতমের সুর প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। লাখ লাখ মানুষের এই ভিড় সামলাতে শহরের প্রতিটি মোড়ে মোড়ে স্বেচ্ছাসেবকরা কাজ করছেন। জাতীয় পতাকা, কালো শোকবার্তা আর ধর্মীয় প্রতীকে ছেয়ে গেছে তেহরানের চওড়া রাস্তাগুলো। ১৯৮৯ সাল থেকে ইরানের শাসনভার পরিচালনাকারী এই নেতার বিদায় অনুষ্ঠান পুরো তেহরানকে এক গভীর শোক, আবেগ আর রাজনৈতিক প্রতীকের নগরীতে পরিণত করেছে।
তবে এই শোকের আবহের মধ্যেই আরেকটি দৃশ্য সবার নজর কাড়ছে। শহরের বিভিন্ন প্রান্তে শোভা পাচ্ছে মিনাব অঞ্চলের একটি বালিকা বিদ্যালয়ে হওয়া বিমান হামলায় নিহত ১৫০টিরও বেশি শিশুর ছবি সংবলিত পোস্টার। সর্বোচ্চ নেতাকে বিদায় জানানোর এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের মধ্যেও এই নিষ্পাপ মুখগুলো মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, সাম্প্রতিক যুদ্ধের ক্ষত ইরানিদের মনে কতটা গভীর। তেহরানের আনুষ্ঠানিকতা শেষে সোমবার খামেনেইর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে কোম শহরে। সেখান থেকে ইরাকের পবিত্র নগরী নাজাফ ও কারবালা হয়ে আগামী ৯ জুলাই তাঁর নিজের শহর মাশহাদে তাঁকে সমাহিত করা হবে।
এই বিশাল জনসমুদ্রে শামিল হতে দূর যুক্তরাজ্য থেকে উড়ে এসেছেন মজিয়া নামের এক ইরানি মহিলা। তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লার দিকে যাওয়ার পথে তিনি জানান, দেশের এই কঠিন সময়ে মাতৃভূমির পাশে দাঁড়াতেই তাঁর এই আগমন। মার্কিন প্রশাসনকে ইঙ্গিত করে তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, কেউ এসে ৪,০০০ বছরের পুরনো একটি সভ্যতাকে ধ্বংস করে দিতে পারে না। যারা এটা করার চেষ্টা করছে, তারা আসলে নিজেদের দেশেরই ক্ষতি করছে। যুদ্ধ ইরানকে আরও শক্তিশালী এবং ঐক্যবদ্ধ করেছে উল্লেখ করে তিনি জানান, বাইরের চাপ তাদের জাতীয় সংকল্পকে আরও দৃঢ় করেছে মাত্র। পশ্চিমের চাপিয়ে দেওয়া শাসন ব্যবস্থার সমালোচনা করে তিনি ইরাক, সিরিয়া বা আফগানিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতির দিকে আঙুল তোলেন। একই সঙ্গে তিনি সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের ভাববার অনুরোধ জানান যে, তাদের দেওয়া করের টাকায় কীভাবে মধ্যপ্রাচ্যে একের পর এক যুদ্ধ চলছে এবং শিশুদের প্রাণ যাচ্ছে।
এদিকে গ্র্যান্ড মোসাল্লার ভেতরে সারাদিন ধরেই চলছে জানাজার নামাজ ও বিশেষ প্রার্থনা। সেখানে কফিনের পাশে রাখা খামেনেইর এক ছোট নাতির ছবি দেখে উপস্থিত হাজারো মানুষ নিজেদের চোখের জল ধরে রাখতে পারছেন না। সব মিলিয়ে আজকের তেহরান যেন এক অদ্ভুত মেলবন্ধন—যেখানে একদিকে রয়েছে প্রিয় নেতাকে হারানোর গভীর শোক, অন্যদিকে যুদ্ধের তাজা ক্ষত, আর সব কিছু ছাপিয়ে দেশের মানুষের এক অভূতপূর্ব জাতীয় ঐক্য।















